আজ বুধবার, ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আজ বুধবার, ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

সুশাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত ও ইতিহাস গড়লেন ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে সেবাগ্রহীতা কিংবা সাধারণ নাগরিকদের অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অম্লমধুর বা তিক্ততায় ভরা। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতির অন্যতম সংবেদনশীল জায়গা—পবিত্র হজের ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘকাল ধরে চলেছে চরম বিশৃঙ্খলা, আর্থিক অনিয়ম ও হয়রানি। একসময় সংবাদপত্রের পাতায় আমরা প্রায় প্রতিবছরই দেখতাম, হজে যাওয়ার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা জমা দিয়েও হাজার হাজার হাজি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, এয়ারপোর্টে কান্নাকাটি করছেন, কিংবা মক্কা-মদিনায় গিয়ে কাঙ্ক্ষিত আবাসন ও খাবার না পেয়ে অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। জমা দেওয়া টাকার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব যেমন মেলেনি, তেমনি সেবা না পেয়েও অতিরিক্ত খরচের বোঝা নীরবে সহ্য করতে হয়েছে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষকে।

কিন্তু ইতিহাসের চাকা কখনো কখনো ঘুরে দাঁড়ায়। সেই অন্ধকারের বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশে তৈরি হলো এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। চলতি বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করা ৪ হাজার ৩৪১ জন হাজির অনুকূলে হজ প্যাকেজের উদ্বৃত্ত মোট ৪ কোটি ৮৭ লাখ ২৩ হাজার ১৪ টাকা ফেরত দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ এই অভূতপূর্ব তথ্য সামনে নিয়ে আসেন। কোনো প্রকার প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই প্রতিটি টাকা-পয়সা নিখুঁতভাবে হিসাব করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হাজিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়ার এই ঘোষণা বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি প্রাতঃস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি কেনাকাটা বা কোনো প্রকল্পের সাশ্রয় হওয়া অর্থ জনগণের পকেটে ফেরত যাওয়া তো দূরের কথা, বরং ‘অতিরিক্ত খরচ’ দেখিয়ে বাজেট বাড়ানোর সংস্কৃতিই আমরা দেখে এসেছি। সেখানে ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ প্রমাণ করে দিলেন যে, সদিচ্ছা ও সততা থাকলে সরকারি তহবিল সুরক্ষা করা এবং জনগণের প্রাপ্য অধিকার তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া পূর্ণমাত্রায় সম্ভব।

হজে বাড়িভাড়া ও সার্ভিস চার্জ বাবদ ব্যয় কম হওয়ার কারণে হজ প্যাকেজের অর্থ থেকে এই বিরাট অঙ্কের টাকা সাশ্রয় হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রেখে ধর্ম মন্ত্রণালয় এই সাশ্রয়কৃত অর্থ ক্যাটাগরিভিত্তিক ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে:

হজ প্যাকেজ-১:এই প্যাকেজের আওতায় হোটেল বুলুরা আল দুররার সাধারণ প্যাকেজের হাজিরা ৩৮,৬৯৭.৩২ টাকা এবং শর্ট প্যাকেজের হাজিরা ৪৬,৮৮৮.৪০ টাকা ফেরত পাচ্ছেন। দুই সিটের আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে ১,৬৪,১৯০.৫৬ টাকা এবং দুই সিটের আপগ্রেডেশনসহ শর্ট প্যাকেজের হাজিরা ১,৮০,৫৭২.৭১ টাকা ফেরত পাচ্ছেন। এছাড়া তিন সিটের আপগ্রেডেশনের হাজিরা ১,১৮,০৭২.৮২ টাকা এবং শর্ট প্যাকেজে ১,৩১,৭৩৫.৫৩ টাকা ফেরত পাচ্ছেন।

হজ প্যাকেজ-২: লুলুয়াত আল ভাওহীদের সাধারণ প্যাকেজে ২,৫০৫.৪৯ টাকা, শর্ট প্যাকেজে ৮,৭৩০.৭০ টাকা, দুই সিটের আপগ্রেডেশনে ৬২,৩৩১.৭৯ টাকা এবং শর্ট প্যাকেজের আপগ্রেডেশনে ৭৮,৭১৩.১৪ টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া তিন সিটের আপগ্রেডেশনে ৩,২৮৭.৩৬ টাকা ও ৮,৪৩১.৩৬ টাকা ফেরত পাচ্ছেন।

অন্যান্য আবাসন: হোটেল রাওদাত আল শুরূক ও মানার আল শুরূকের হাজিরাও তাদের ক্যাটাগরি ও রূপান্তর অনুযায়ী ৩,৯৭৯.৮৮ টাকা থেকে শুরু করে ৪৪,১১৯.৮৭ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাচ্ছেন।

সাধারণ হজ প্যাকেজ-৩:হোটেল নান্দার ওয়ানে অবস্থানকারী প্রত্যেক হাজি ফেরত পাচ্ছেন ৩,৭১৮.০৯ টাকা।

টাকা ফেরত দেওয়ার এই গাণিতিক সূক্ষ্মতা ও ক্যাটাগরিভিত্তিক স্বচ্ছতা প্রমাণ করে, প্রশাসনিক পর্যায়ে সামান্যতম আত্মসাত বা অস্বচ্ছতার ঠাঁই এখানে দেওয়া হয়নি।

এই নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী পদক্ষেপটি কেবল একজন ব্যক্তি বা একজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি পুরো সরকার ব্যবস্থা এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করেছে। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে নানান বিরূপ সমালোচনা হতো, এই একটি মাত্র স্বচ্ছ ও জনবান্ধব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই আক্ষেপ ঘুচে গেছে। এটি কেবল সাশ্রয়কৃত অর্থ ফেরত দেওয়া নয়, এটি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক মহান রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,যখন গোটা দেশ এক নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে, তখন ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদের এই উদ্যোগ নতুন বাংলাদেশের সুশাসনের এক উজ্জ্বল বার্তা বহন করে। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনের মূল কৃতিত্ব ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য আমি অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানাতে চাই সরকারপ্রধান তারেক রহমানকে। সত্যিকার অর্থেই, তারেক রহমান দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি দফতরে এমন একজন প্রজ্ঞাবান, সৎ ও সৎসাহসী মানুষকে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যার ফল আজ এদেশের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করছে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে,শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ কেবল একজন দক্ষ প্রশাসক বা জনপ্রিয় রাজনেতাই নন, উনি একজন উঁচুমাপের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যসম্পন্ন মানুষ। জাতীয় সংসদে উনাকে যখনই মোনাজাত পরিচালনা করতে দেখা যায়, কিংবা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উনি যখন বক্তব্য প্রদান করেন, তখন ওনার গভীর ধর্মীয় জ্ঞান এবং চমৎকার সাবলীল উপস্থাপনা যে কাউকে মুগ্ধ ও অভিভূত করে। ওনার পরিচালিত মোনাজাতের ভেতরের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, রূহানি তাগিদ ও ভাষার প্রাঞ্জলতা শুনলে সহজেই অনুধাবন করা যায়—ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সুচর্চায় উনি কতটা ঋদ্ধ ও পটু।

একজন মানুষ যখন ভেতর থেকে সৎ এবং আল্লাহভীরু হন, তখন তাঁর কাজের ক্ষেত্রেও সেই সততা ও ইনসাফের প্রতিফলন ঘটে। ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদের এই ধর্মীয় নিষ্ঠা ও সততাই আজকের এই ‘উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার’ মতো বিপ্লবী ও বিরল দৃষ্টান্ত গড়ে তুলতে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং নাগরিক হয়রানি যেখানে স্থায়ী রূপ নিয়েছিল, সেখানে এই ফেরতযোগ্য অর্থের চেক হাজিদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছানো যেন এক নতুন প্রভাতের সূর্যোদয়। ইতিপূর্বে যেখানে হজ পালনে গিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ অসাধু সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে সর্বস্ব হারাতেন, সেখানে আজ রাষ্ট্র স্বউদ্যোগে তাদের খরচের অতিরিক্ত টাকা গুনে গুনে বুঝিয়ে দিচ্ছে।

এই ইতিবাচক পরিবর্তনটি প্রমাণ করে—সঠিক ব্যক্তির হাতে সঠিক দায়িত্ব ন্যস্ত হলে এবং সরকারপ্রধানের দিকনির্দেশনা যদি সৎ হয়, তবে যেকোনো খাতকেই দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব। ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ তাঁর এই সততা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও ধর্মীয় প্রজ্ঞার মাধ্যমে শুধু ইতিহাস তৈরি করেননি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসকদের জন্য জনসেবার এক অনুপম ও অনুকরণীয় মানদণ্ড স্থাপন করেছেন । আমরা আশা করি, হজের ক্ষেত্রে অর্জিত এই অনন্য সাফল্য ও স্বচ্ছতার ধারা অন্যান্য সকল সরকারি মন্ত্রণালয় ও দফতরেও ছড়িয়ে পড়বে, যা একটি সত্যিকারের ইনসাফভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে গতি সঞ্চার করবে ইনশাল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।

লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin