আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

আহা আজি এ রাজনীতির বসন্তে…

 

শিমুলের ডালে লাল আগুন জ্বলে উঠেছে। কৃষ্ণচূড়া রঙ ছড়াতে প্রস্তুত। কোকিলের কণ্ঠে ভোরের প্রথম সুর। বাতাসে দোলে অচেনা এক উত্তেজনা—যেন দীর্ঘ শীত নিদ্রা ভেঙে জেগে উঠছে প্রকৃতি আর একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনা। বসন্ত এলে যেমন শুকনো ডালেও নতুন পাতা ফোটে, তেমনি ইতিহাসের ক্লান্ত অধ্যায় পেরিয়ে কখনও কখনও রাজনীতির বুকেও জন্ম নেয় নতুন আস্থার সবুজ অঙ্কুর।

বাংলার মাটি বহু ঝড়-ঝাপটা দেখেছে—সংঘাত, অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা আর ক্ষমতার নির্মম টানাপোড়েন। আমাদের রাজনীতির পথ প্রায় সর্বদাই ছিল ধুলো-ধূসরিত, কণ্টকময়। কিন্তু চলতি এ বসন্তে দৃশ্যপট যেন একদমই অন্যরকম। আজ আকাশে কেবল নির্বাচনী জয়ের পতাকা উড়ছে না। বরং সৌজন্যের সাদা কবুতরও ডানা মেলেছে। আজ বাতাসে কেবল বিজয়ের শঙ্খধ্বনি নয় বরং ভেসে আসছে সংলাপের মৃদু আহ্বান।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদিন লিখেছিলেন—
“আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে,
এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়…”
প্রকৃতির সেই অফুরন্ত নবজাগরণের সুর যেন রাজনীতির প্রান্তরেও ধ্বনিত হচ্ছে। যদি কবিগুরু আজ এই সময়ের সাক্ষী হতেন, হয়তো তিনি বিস্ময়ে বলতেন—আহা, আজি এ রাজনীতির বসন্তে কত শান্তি, কত সম্ভাবনা, কত নবপ্রভাতের প্রতিশ্রুতি!

কারণ এ বসন্ত কেবল ঋতুচক্রের আবর্ত নয় বরং এটি মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বহুদিন পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখা গেল এমন এক অনন্য দৃশ্য যেখানে বিজয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও প্রতিপক্ষের দ্বারে কড়া নাড়ছে বিজয়ী বীর। সদ্য নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই ছুটে গেলেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাসভবনে। শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন, একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান জানালেন, আশ্বাস দিলেন নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের।

এ দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা—যেখানে প্রতিপক্ষ মানেই দূরত্ব নয়, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। বসন্ত যেমন শুষ্ক মাটিতে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনে, তেমনি এই সৌজন্যতার পদচারণা ফিরিয়ে আনতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতির হারানো কোমলতা।

রাজনীতি যখন কেবল ক্ষমতার অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন সেখানে যুক্ত হয় মানবিকতা, সৌজন্য আর সম্মান—তখনই তা হয়ে ওঠে সভ্যতার পরিচয়।
এ বসন্তে বাংলাদেশের মানুষ সেই সভ্যতারই সাক্ষী হলো।

আহা, আজি এ রাজনীতির বসন্তে—কেবল ফুল নয়, ফুটুক আস্থা; কেবল বাঁশি নয়, বাজুক সংলাপ; কেবল পতাকা নয়, উড়ুক পারস্পরিক শ্রদ্ধার পতপত শব্দ।

আমাদের রাজনীতির এই নবপ্রভাত যদি টিকে থাকে, তবে ইতিহাস একদিন বলবে—এটি কেবল একটি নির্বাচন-পরবর্তী সৌজন্য নয় বরং এটি ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক পুনর্জন্মের ঋতু।

প্রসঙ্গত এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে,রাজনীতিতে তারেক রহমানের সৌজন্যতার এই চর্চা একেবারে নতুন নয়—বরং এটি একটি পারিবারিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বলেই আমি মনে করছি। ২০০১ সালে জোট সরকার গঠনের পর তারেক রহমান গোপালগঞ্জে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাজারে দোয়া প্রার্থনা করেছিলেন। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান-এর প্রতি এই শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল রাজনৈতিক ভিন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ইতিহাসকে সম্মান জানানোর এক দৃষ্টান্ত।

অন্যদিকে, দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, ৯৬ এ শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর মাজারে যাওয়ার বেইলি সেতুতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিলেন।

এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৌজন্যের বিছানায় কাঁটা বিছিয়েছেন পতিত স্বৈরাচার হাসিনা।
যাহোক, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ অনেকের চোখে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চেয়েছে যেখানে নেতারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলবেন, মতবিরোধ থাকবে কিন্তু মনবিরোধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সচেতন এই প্রজন্ম বিশ্বরাজনীতির উদাহরণ দেখে বড় হয়েছে। তারা জানে—রাজনৈতিক পরিপক্কতা মানে শালীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের রায় সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করেছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

বিজয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাস, সমর্থকদের গর্ব, সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার ঢেউ—সব মিলিয়ে চারদিকে এক উজ্জ্বল বসন্তের আবহ। কিন্তু একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রনায়কের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আবেগকে নীতিতে রূপান্তর করা, প্রতিশ্রুতিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় প্রতিষ্ঠা করা।

সৌজন্য সাক্ষাৎ যদি নিয়মিত সংলাপের রূপ নেয়, যদি সংসদ কার্যকর বিতর্কের মঞ্চ হয়, যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হয়—তবে এই বসন্ত সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হচ্ছে।

তবে প্রকৃতির বাস্তবতা হচ্ছে, বসন্ত চিরস্থায়ী নয়—এই সৌজন্য যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পায়, যদি আইনের শাসন নিশ্চিত না হয়, যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়—তবে এ বসন্ত ক্ষণিকের ফুল হয়ে ঝরে পড়বে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

শেষ কথা:
আহা, আজি এ রাজনীতির বসন্তে—ফুটুক ন্যায়বিচারের কুসুম,বাজুক জবাবদিহিতার বাঁশি, উড়ুক সমতার পতাকা।
—এই উচ্ছ্বাস যেন কেবল কবিতার পংক্তি হয়ে না থাকে। এটি যেন রূপ নেয় নীতিতে, আইন প্রণয়নে, প্রশাসনিক সংস্কারে, দুর্নীতিবিরোধী কঠোরতায় এবং সামাজিক ন্যায়বিচারে।
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সৌজন্যতা যদি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করে—যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, দুর্বল নিপীড়িত হবে না, সংখ্যালঘু নিরাপদ থাকবে, বিরোধী দল সম্মান পাবে—তবে ইতিহাস একে স্মরণ রাখবে “রাজনীতির বসন্ত” হিসেবে।
আর তখনই আমরা বলতে পারব—এ বসন্ত ক্ষণিকের নয় বরং
তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘ যাত্রার নতুন ভোর।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin