রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক সত্য হলো—নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা সামাজিক অগ্রগতি—সবকিছুর ভিত্তিই হচ্ছে নিরাপত্তা। একটি রাষ্ট্র তখনই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে, যখন সে নিজের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্ষম থাকে। নিরাপত্তা দুর্বল হলে উন্নয়নের অর্জনও একসময় অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢেকে যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ দ্রুত এগিয়ে যাওয়া এক অর্থনীতির নাম। গত দুই দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, রপ্তানি এবং মানবসম্পদ বিকাশে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ক্রমেই বাড়ছে।
তবু একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই—সামরিক শক্তির বিচারে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষণভিত্তিক সূচক Global Firepower–এর সাম্প্রতিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় ৩৭তম। এটি একদমই দুর্বল অবস্থান নয়। বরং জনশক্তি, পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বে যথেষ্ট সম্মানিত।
তবে এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠে যে—গত দেড় দশকে যদি বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার বা অপচয় না হতো এবং তার একটি বড় অংশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান কি হতো?
সামরিক কৌশলবিদরা বলেন—অর্থ হলো শক্তির গুণক বা force multiplier। আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় প্রযুক্তি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা—সবকিছুই অর্থনির্ভর।
বাংলাদেশের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪০,৬৯৮ কোটি টাকা, যা আনুমানিক ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশগুলোর তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে ছোট।
ধরা যাক, গত ১৫ বছরে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার বা অপচয় হয়েছে—যে সংখ্যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে। যদি এই অর্থের অর্ধেকও প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার চিত্র অনেকটাই বদলে যেতে পারত।
১৫ বছরে এই অর্থের গড় হিসাব করলে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ১৫–১৬ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ সম্ভব হতো। বর্তমান বাজেটের সঙ্গে সেটি যোগ হলে বাংলাদেশের বার্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যয় দাঁড়াতে পারত প্রায় ১৯–২০ বিলিয়ন ডলারে।
এই পরিমাণ বাজেট হলে বাংলাদেশ সহজেই পাকিস্তান, ইসরাইল এবং তুরস্কের মতো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারত।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বর্তমানে সীমিত সংখ্যক আধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। কিন্তু যদি পাচারকৃত অর্থের একটি অংশ বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে ২০০ বা তার বেশি পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল—যেমন F-35 Lightning II বা সমমানের যুদ্ধবিমান। এ ধরনের প্রযুক্তি আকাশযুদ্ধের ধরণাই পাল্টে দিয়েছে। এই ধরনের বিমান কেবল আকাশযুদ্ধেই নয়, গোয়েন্দা নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষেত্রে দারুন কার্যকরী।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সমুদ্র নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Bay of Bengal এখন ইন্দো–প্যাসিফিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
যথেষ্ট বিনিয়োগ করা গেলে আধুনিক গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, উন্নত সাবমেরিন এবং একটি শক্তিশালী ব্লু-ওয়াটার নেভি গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। এতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা যেমন বাড়ত, তেমনি আঞ্চলিক সামুদ্রিক ভারসাম্যেও বাংলাদেশের প্রভাব বাড়ত।
স্থলবাহিনীর ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। উন্নত মেইন ব্যাটল ট্যাংক—যেমন Leopard 2—এবং আধুনিক সাঁজোয়া যান সংগ্রহের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো যেত।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারত স্মার্ট আর্টিলারি, ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা এবং নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক যুদ্ধ প্রযুক্তি।
আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আকাশ প্রতিরক্ষা। উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—যেমন S‑400 missile system বা MIM‑104 Patriot—স্থাপন করা গেলে দেশের আকাশসীমা সুরক্ষা অনেক শক্তিশালী হতো।
এছাড়া সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামরিক স্যাটেলাইট এবং ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেতে পারত।
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও সহজ নয়।
পশ্চিমে রয়েছে বিশাল রাষ্ট্র ভারত, যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি। অন্যদিকে পূর্ব সীমান্তে রয়েছে মায়ানমার, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত চলছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানো কোনো আক্রমণাত্মক নীতি নয়; বরং এটি আত্মরক্ষার একটি বাস্তব কৌশল।
আমরা প্রত্যেকে নিজের ঘর বানাই নিরাপত্তার জন্য। খোলা আকাশের নিচে বাস করি না। ঘর বানাই, দরজা-জানালা দিই, তালা লাগাই। অনেক সময় নিরাপত্তারক্ষী রাখি, সিসিটিভি বসাই, এমনকি কুকুরও রাখি পাহারার জন্য।
কারণ মানুষ জানে—নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বস্তি আসে না।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। একটি শক্তিশালী সামরিক কাঠামো মানে যুদ্ধ করা নয়; বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যে রাষ্ট্র শক্তিশালী, তাকে আক্রমণ করার আগে সাতবার ভাবতে হয়।
তবে এটাও সত্য যে—শুধু অস্ত্র কিনে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। শক্তিশালী অর্থনীতি, দক্ষ প্রশাসন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত কূটনীতি—সবকিছু মিলেই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি গড়ে ওঠে। সুতরাং
অর্থনীতি দুর্বল রেখে যদি কেবল অস্ত্রের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র ভারসাম্য হারাতে পারে।
তাই প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব এখন দ্রুত বদলাচ্ছে।
ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে আফ্রিকা—বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও শক্তির প্রতিযোগিতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শুধু সামরিক প্রয়োজন নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও মর্যাদার অপরিহার্য ভিত্তি।
ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির নতুন সমীকরণ দেখিয়ে দিচ্ছে—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির গুরুত্ব এখনও কমেনি।
বাংলাদেশের জন্য তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল জরুরি—যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পাশাপাশি এগিয়ে যাবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, তেমনি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও জটিল হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবা সময়ের দাবি। সামরিক শক্তি বাড়ানো মানেই যুদ্ধ করা নয়; বরং এটি শান্তি রক্ষার এক বাস্তব কৌশল।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com