আজ রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
আজ রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

১৫ কোটি মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে ১৫ লাখ মানুষের বেতন বিলাস !

বাজারে গেলে মানুষ এখন হিসাব করে চাল কেনেন। কমাতে হয় ডাল কেনার পরিমানও। বউয়ের দেয়া তালিকা থেকে ছাঁটাই করতে হয় মাছ-মাংস । অনেক পরিবারে মাছ মাংস এখন বিশেষ দিনের খাবার। জরুরী চিকিৎসা পিছিয়ে যায়। সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে পরিবারে চলে নীরব অশান্তি। এমনই বাস্তবতা আজ বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

ঠিক এই সময়ে সরকার সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করার পথে এগোচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী মূল বেতন ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।

পাশাপাশি উৎসব ভাতা বাড়িয়ে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করার কথাও বলা হচ্ছে। কাগজে এই সিদ্ধান্ত আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সিদ্ধান্তের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কে দেবে।
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন পাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। সেই বাস্তবতায় বেতন পুনর্বিন্যাস অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই সিদ্ধান্ত সময় বাস্তবতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ আছেন, যাদের কোনো নির্দিষ্ট আয় নেই। সামাজিক নিরাপত্তা সীমিত। বেসরকারি খাত, অনানুষ্ঠানিক খাত ও দিনমজুরি নির্ভর এই মানুষগুলোর জীবনে সামান্য মূল্যস্ফীতিও বড় ধাক্কা দেয়। অন্যদিকে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছেন, যাদের চাকরি নিরাপদ। নিয়মিত বেতন আছে। পেনশন আছে। নানা ভাতা আছে।

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র যদি একপাক্ষিকভাবে একটি গোষ্ঠীর আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তার প্রভাব পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রভাব শুধু কাগজে থাকে না। বাজারে গিয়ে মানুষ তা অনুভব করে।
অভিজ্ঞতা বলছে, যখনই সরকারি বেতন বড় আকারে বাড়ানো হয়েছে, তখনই বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০১৫ সালের জাতীয় পে স্কেলের পরেও একই চিত্র দেখা গেছে। সরকারি কর্মচারীদের হাতে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ গেলে ভোগব্যয় বেড়ে যায়। চাহিদা বাড়ে। কিন্তু উৎপাদন সেই হারে বাড়ে না। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে।

এবার প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ আরও বড়। যদি এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সরকারি বেতন ভাতা খাতে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে আসছে। এই অর্থ আসবে কোথা থেকে, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
বাংলাদেশের রাজস্ব আয় সীমিত। কর ব্যবস্থা দুর্বল। দেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষের টিআইএন থাকলেও নিয়মিত কর দেন তার এক তৃতীয়াংশেরও কম। বিপরীতে প্রায় ১৫ কোটি মানুষের কর দেওয়ার সামর্থ্যই নেই। দিন আনে দিন খাওয়া মানুষ কর দেন না, কিন্তু বাজারে দাম বাড়লে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সরকার যদি এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে নতুন কর আরোপ করে, পরোক্ষ কর বাড়ায়, ভর্তুকি কমায় বা ঋণ নেয়, তাহলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। চাল ডাল তেল সবজি বাসাভাড়া শিক্ষা চিকিৎসা সবকিছুর খরচ বাড়বে।

বাংলাদেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এই অবস্থায় যদি নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়, তাহলে অনেক পরিবার আক্ষরিক অর্থেই টিকে থাকার সংগ্রামে পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশগুলোতে সরকারি বেতন সাধারণত ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়। এককালীন ১০০ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধির নজির সেখানে নেই। এসব দেশ বেতন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে রাজস্ব সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখে।

উন্নত দেশগুলোতেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়। সেখানে সরকারি বেতন বাড়ে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি ও রাজস্ব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। বাংলাদেশের মতো বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও সীমিত করভিত্তির দেশে এককালীন এত বড় বেতন বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও প্রশ্ন তোলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বেতন বাড়ালে কি সেবার মান বাড়বে। দুর্নীতি কমবে। অতীত অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক নয়। আগেও বেতন বেড়েছে। কিন্তু ঘুষ কমেনি। সেবা ভোগান্তি কমেনি। কারণ সমস্যার মূল বেতন নয়। মূল সমস্যা জবাবদিহির অভাব, শাস্তির অনুপস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

যদি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কঠোর কর্মমূল্যায়ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে এই অতিরিক্ত ব্যয় কাঙ্ক্ষিত সুফল দেবে না। বরং উচ্চ বেতনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় ঘুষের চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে।

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবে উৎসব ভাতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। মূল বেতনের পাশাপাশি উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হলে এটি এক ধরনের দ্বৈত চাপ তৈরি করবে। বেতন বৃদ্ধি এক বিষয়। উৎসব ভাতা আরেকটি সামাজিক প্রণোদনা। দুটিকে একসঙ্গে বড় আকারে বাড়ানো অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী এই কাঠামোর সরাসরি সুফলভোগী হবেন। অর্থাৎ মোট প্রায় ২৪ লাখ মানুষ। অন্যদিকে দেশের প্রায় ১৫ কোটি মানুষ এই সুবিধার বাইরে থাকবেন। কৃষক, দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকরিজীবী ও বেকার তরুণ তরুণীরা মূল্যস্ফীতির বোঝা বহন করবেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর। কিন্তু যখন সরকারি খাতে বেতন কাঠামো অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তখন বেসরকারি খাতে মেধা সংকট তৈরি হয়। সবাই সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। উদ্যোক্তা তৈরি কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে যে ,রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি শুধু সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান নিশ্চিত করার, নাকি সমগ্র জনগণের।

শেষ কথা:
যে রাষ্ট্র নাগরিকের করের টাকায় চলে। সেই রাষ্ট্র যদি একটি ক্ষুদ্র অংশকে বিশেষ সুবিধা দেয় আর বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঠেলে দেয়। তাহলে সেটি মোটেও কল্যাণরাষ্ট্র নয় বরং সেটি শ্রেণিভিত্তিক রাষ্ট্র।
বেতন সংস্কার অবশ্যই দরকার। তবে তা হতে হবে যৌক্তিক। এখানে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
১৫ লাখ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে ১৫ কোটি মানুষের দুর্ভোগ কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin