জাতীয় নির্বাচনগুলির আগে ভারত যেমন কাশ্মীরে একটি ঘটনা ঘটায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গোলাগুলি এবং বাংলাদেশে জঙ্গি নাটক ইত্যাদি ঘটিয়ে জনগণের সহানুভূতি নেওয়ার চেষ্টা করে ভোটে জেতার জন্য। গতকালকে ওয়াশিংটনে হিল্টন হোটেলে গোলাগুলির ঘটনা এরকম একটি মহড়া মাত্র। সিক্রেট সার্ভিস এর সাথে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তারা এরকম একটি সুরক্ষিত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নির্বাচন এর আগে ট্রাম্পের উপর যে গুলির ঘটনা ঘটেছে তা না হয় মেনে নেওয়া যায় যেহেতু ঘটনাটি ঘটেছিল একটি নির্বাচনী জনসভায় ঘটেছিল।
এরপর গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা, এরপরই ইরানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া—“ওকে বিশ্বাস করবেন না, সে মিথ্যা বলে।”
এই ঘটনাকে ঘিরে দুই পক্ষের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। আমি টেলিভিশনে ঘটনাটির পর লাইভ প্রেস ব্রিফিং দেখছিলাম। ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হলে হামলাটি ইরানের সঙ্গে জড়িত কি না, তিনি বলেন: “আমি তা মনে করি না, তবে কখনো নিশ্চিত করে বলা যায় না।” তারপর আরো বলছেন, এই হামলা তাকে থামাতে পারবে না—ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও শক্ত থাকবে। অন্যদিকে তেহরান সরাসরি অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ব্যর্থতা ঢাকতে তথ্য বিকৃতি করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কূটনৈতিক পথও যেন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানে সম্ভাব্য আলোচনা ভেঙে গেছে, আর দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে। প্রশ্ন হলো—এটা কি শুধু কথার লড়াই, নাকি বড় সংঘাতের পূর্বাভাস? বা ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কি টিকবে, নাকি নতুন করে সংঘাত শুরু হবে?
বিশ্ব এখন এক অনিশ্চিত সময় পার করছে, যেখানে প্রতিটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঘটনা যাই ঘটুক ইরানের জন্য তা ডু অর ডাই অবস্থা। লিবিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কথা মানার ফল গাদ্দাফির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। ইরান সে পথে হাটবে না বলে বাহ্যত মনে হচ্ছে।উত্তর ভিয়েতনামের ‘হোয়েন’ (Hue) শহরের উত্তরের উপকূলীয় রাস্তাটি (Route 1) “স্ট্রীট উইদাউট জয়” বা জয়ের আশা-ছাড়া রাস্তা নামে পরিচিত ছিল। ভিয়েত কং গেরিলা ও উত্তর ভিয়েতনামি বাহিনী প্রথমে ফ্রান্স এবং একইভাবে মার্কিন বাহিনীকে এই ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে পরাস্ত করে। “স্ট্রীট উইদাউট জয়” হলো ভিয়েতনামি যোদ্ধাদের গেরিলা কৌশল এবং তাদের ভূমির সাথে পরিচিতির একটি প্রতীক, যার সামনে আধুনিক পরাশক্তি (প্রথমে ফ্রান্স, পরে যুক্তরাষ্ট্র) পরাজিত হয়েছিল। ঠিক তেমনি ইরান ও তার প্রক্সিরা হরমোজ প্রণালী ও বাব আল মান্দেব প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির করে মার্কিন এবং তার মিত্রদের নতি স্বীকার করাতে চায়। প্রতিরোধ ছেড়ে দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলিরা ইরানকে পেয়ে বসবে। তাই ছাড় দিয়ে কি লাভ? আমাদের মনে রাখতে হবে—যুদ্ধ কখনোই সমাধান নয়, বরং আরও বড় সংকটের জন্ম দেয়।-লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক,ঢাকা।