জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি বরং দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র এবং ক্ষমতার জবাবদিহির প্রশ্নগুলোকে নতুন করে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং এটি ছিল বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, রাজনৈতিক অবদমন, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও নাগরিক অধিকারের দীর্ঘ ক্ষয়ের এক অনিবার্য পরিণতি।
এই প্রেক্ষাপটে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে শেখ হাসিনা অডিওবার্তায় জাতিসংঘের মাধ্যমে ‘২৪-এর ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে হাসিনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন বলেই মনে হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি সত্যিই তার ন্যায়বিচারের আহ্বান, নাকি আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক দায় লঘু করার একটি কৌশল?
একটু পেছনে ফেরা যাক। জুলাই অভ্যুত্থানের বীজ রোপিত হয়েছিল বহু আগেই। একতরফা নির্বাচন, বিরোধী রাজনীতির ওপর দমন-পীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনের অপব্যবহার। কার্যত এসবই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে ক্রমাগত বিষিয়ে তুলছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ, ভোটারবিহীন কেন্দ্রের ছবি এবং ‘ডামি প্রার্থী’ বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।
এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও পেশাজীবীদের সম্মিলিত বিক্ষোভ একটি গণআন্দোলনের রূপ নেয়। এই আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহার পরিস্থিতিকে শান্ত না করে আরও বিস্ফোরণমুখী করে তোলে। সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও ব্যাপক গ্রেপ্তার পরিস্থিতিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সরকার টিকে থাকার আর কোনো পথই খোলা ছিল না।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ছিল সেই টানটান পরিস্থিতিরই চূড়ান্ত পরিণতি।
হাসিনার ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। দেশের রাজনীতির ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আমাদের সামনে আসে দায়, বিচার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রশ্ন।
শেখ হাসিনার পতনের পরপরই তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো—একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন অধ্যায়। যেখানে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একজন প্রধানমন্ত্রীকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সরকারের ভাষায় এসব মামলা ‘আইনের শাসনের’ অংশ হলেও সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং দ্রুততার বিষয় নিয়ে।
এই বিতর্কের মধ্যেই শেখ হাসিনা নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে দিল্লির অডিওবার্তায়।
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে প্রচারিত অডিওবার্তায় শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ এবং বাংলাদেশকে ‘একটি বিশাল কারাগার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানান। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—তিনি তার শাসনামলের কোনো ভুল, সহিংসতা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় স্বীকার করেননি। ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, দুঃখ প্রকাশের ভাষাও অনুপস্থিত ছিল।
বরং তিনি তার চিরচেনা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রধানত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাকে দায়ী করেন। তার পাঁচ দফা দাবির মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো জাতিসংঘের মাধ্যমে ‘২৪-এর ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ তদন্ত’।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন সাধারণত গঠিত হয় যখন কোনো রাষ্ট্র নিজস্ব বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায় বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। শেখ হাসিনার দাবি তাই আপাতদৃষ্টিতে ন্যায়বিচারের আহ্বান বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে আন্তর্জাতিক তদন্তের বিরোধিতা করেছেন। গুম-খুনের অভিযোগে জাতিসংঘের উদ্বেগকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি হঠাৎ করে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হলেন কেন?
আমি মনে করি, এটি হাসিনার কৌশলগত একটি পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক তদন্ত মানেই সময়ক্ষেপণ, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং রাজনৈতিক সমর্থন পুনর্গঠনের সুযোগ। একই সঙ্গে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা।
বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার জাতিসংঘ তদন্ত দাবিকে ‘অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের যুক্তি—বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা যথেষ্ট সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের কোনো প্রয়োজন নেই। তবে আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি একেবারে উপেক্ষিতও হয়নি। বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো ২০২৪ সালের সহিংসতা, প্রাণহানি এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি তুলেছে ইতোমধ্যে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নগুলো বেশ জোরালো ভাবে আমাদের সামনে এসেছে।
শেষ কথা:
জাতিসংঘের তদন্ত দাবি শেখ হাসিনার জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সুযোগ—দুটোই এনে দিতে পারে বলে আমি মনে করি। এটি তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। আবার তার শাসনামলের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো নতুন করে আলোচনায় আনতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও মৌলিক—এই দেশ কি অতীতের দায় স্বীকার করে একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে? নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দায়ও বদলে যাবে?
জুলাই অভ্যুত্থান আমাদেরকে সেই প্রশ্নের সামনেই দাঁড় করিয়েছে। জাতিসংঘের তদন্ত হোক বা অভ্যন্তরীণ বিচার—শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সংস্কার। কেননা সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com