আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

জাইমা রহমানের প্রতিভা দেশের সেবায় কাজে লাগান

স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের কঠিন পথচলায়, সংকটের মুহূর্তে কিংবা সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরিরা কখনো সামনে থেকে, কখনো নীরবে কাজ করে গেছেন দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে।

স্বাধীনতার ঘোষক, রণাঙ্গরের বীর সেনানি, কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক একজন জিয়াউর রহমান। তার অতুলনীয় দেশপ্রেম সততা ও মোহনীয় ব্যক্তিত্বের জন্য দেশের অগণিত মানুষ আজও অস্ত্রসিক্ত হন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার মঞ্চ—দুই জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ছিল বাস্তববাদ, জাতীয়তাবাদ এবং উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গির এক অনন্য সমন্বয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন, গ্রামীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করে দেয়।

সেই উত্তরাধিকার বহন করে দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন সদ্যপ্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, প্রতিকূলতা এবং স্থিতিশীল নেতৃত্বের এক মিশ্র অভিজ্ঞতা। ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরে—উভয় সময়েই তিনি দেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখেছেন। তাঁর মধ্যে যে দৃঢ়তা এবং ব্যক্তিত্বের সংযম দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।

এই ধারার পরবর্তী অধ্যায়ে উঠে আসে তারেক রহমানের নাম, যিনি সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে যুক্ত করার প্রয়াসে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। নানা বিতর্ক ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ব্যক্তিত্বের সারল্যতা এবং মিতব্যয়ীতার জন্য তিনি হয়ে উঠছেন আইকনিক রাজনৈতিক নেতা। সত্যিকার অর্থে তিনি রাজনৈতিক নেতা থেকে ক্রমশ হয়ে উঠছেন মানুষের হৃদয়ের রাজা।

এই দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ভেতরেই মানুষের দৃষ্টিতে আসছে নতুন এক নাম—জাইমা রহমান। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য নন; বরং আধুনিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং সংযত ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক সম্ভাবনাময় তরুণ আইনজ্ঞ।

জাইমা রহমানের জীবনপথের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি বেড়ে উঠেছেন এক ভিন্ন বাস্তবতায়। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় অল্প বয়সেই তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে শিক্ষা অর্জন করেন, আইন পেশায় যুক্ত হন এবং একটি পরিণত, বহুমাত্রিক সামাজিক ও আইনি কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করেন।

লন্ডনের মতো একটি বিশ্বনাগরিক শহরে বেড়ে ওঠা মানে শুধু একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং এটি চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করে, বৈচিত্র্যময় সমাজকে বোঝার ক্ষমতা তৈরি করে এবং আইনের শাসন ও মানবাধিকারের আধুনিক ধারণার সঙ্গে গভীর পরিচয় ঘটায়। এই অভিজ্ঞতা একজন আইনজ্ঞকে কেবল পেশাগতভাবে নয়, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ করে।

বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ কমন ল’ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় অভিজ্ঞতা অর্জন করা একজন আইনজ্ঞ খুব সহজেই সেই অভিজ্ঞতাকে দেশের বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে পারেন। বিচারব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, আইন সংস্কার কিংবা নীতিনির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই এই ধরনের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

তবে শুধু শিক্ষা বা পেশাগত দক্ষতাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ফেরার পর জাইমা রহমানকে ঘিরে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় কারণ তাঁর ব্যক্তিত্ব। জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি, কথাবার্তার ভঙ্গি এবং সংযত আচরণ অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে প্রায়ই উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য, তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের সংস্কৃতি দেখা যায়, সেখানে একটি শান্ত, সংযত ও ভদ্র উপস্থিতি মানুষের কাছে আলাদা করে ধরা দেয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, তাঁর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার সেই পরিচিত বিনয়ী ও মৃদুভাষী ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।

এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে প্রজন্মান্তরের পরিবর্তন খুব ধীর লয়ে ঘটে। অথচ বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে—শিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ তরুণরা রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত হয়ে নতুন নতুন ও সৃজনশীল ধারণা নিয়ে আসছে।

জাইমা রহমান সেই প্রজন্মেরই প্রতিনিধি, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। ডিজিটাল অর্থনীতি, মানবাধিকার, আইনি সংস্কার কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতা—এসব বিষয়ে তাঁর মতো শিক্ষিত তরুণদের ভূমিকা একটি রাষ্ট্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এতে আমার নূন্যতম সন্দেহ নেই।

এখানে ঐতিহাসিকভাবে একটি সত্য হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক নেতৃত্বের প্রবণতা বহু পুরনো। এই প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই—গণতান্ত্রিক সমাজে চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা এবং জনগণের আস্থা। যদি কোনো ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব যোগ্যতা, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তাঁর পারিবারিক পরিচয় বাধা নয়; বরং একটি অতিরিক্ত যোগ্যতা মাত্র। কারণ,
একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার মেধা ও দক্ষতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে।

একজন আইনজ্ঞ, একজন অর্থনীতিবিদ বা একজন প্রযুক্তিবিদ—যে যেখানেই দক্ষ, রাষ্ট্র যদি তাকে সেখানেই সুযোগ দেয়, তাহলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।

এই দৃষ্টিতে দেখলে, জাইমা রহমানের মতো একজন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আইনজ্ঞকে দেশের সেবায় যুক্ত করা একটি বাস্তবসম্মত চিন্তা। তা সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমে হোক, কিংবা নীতিনির্ধারণী কোনো কাঠামো—যেমন উপদেষ্টা পরিষদ, আইন সংস্কার কমিশন বা নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান—যেখানেই হোক, তাঁর অভিজ্ঞতা দেশের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে।

আমার এই আলোচনাটি ব্যক্তি বা পরিবারকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশ কি তার সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে? প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ আজ এক পরিবর্তনশীল সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনীতি বাড়ছে, সমাজ বদলাচ্ছে, বিশ্বরাজনীতিও নতুন রূপ নিচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

পরিশেষে বলতে চাই,জাইমা রহমান হয়ে উঠতে পারেন পরিবর্তনশীল সময়ের সম্ভাবনার একটি প্রতীক। তাঁর ভেতরে রয়েছে ঐতিহ্য, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চায়, তাহলে এমন প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর শক্তি। কারণ একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ হচ্ছে তার দক্ষ ও যোগ্য মানুষ—আর সেই মানুষদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর মধ্যেই গড়ে ওঠে একটি আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক ও অগ্রসরমান রাষ্ট্র। সুতরাং জাইমা রহমানের যোগ্যতা ও দক্ষতা দেশ ও মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগান।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin