একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্য দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। যে রাষ্ট্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না, সেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের আস্থা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই প্রশ্নটি কেবল একটি নিয়োগের বিষয় নয়; বরং এটি দেশের সুশাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে দুদকের নেতৃত্ব নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক ও নাগরিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে দুদকের চেয়ারম্যান ড. এম. এ. মোমেন এবং দুই কমিশনার পদত্যাগ করার পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমেও একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নেতৃত্ব কে হবেন এবং সেই নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হবে—এই প্রশ্ন এখন জনমনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এমন এক সময়ে সম্ভাব্য নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসলেও বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছেন ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেন। বিচারিক জীবনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সততা এবং সাহসিকতার কারণে অনেকেই মনে করছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি একটি শক্তিশালী নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতে পারেন।
মোতাহার হোসেনের বিচারিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ ও নির্ভীক বিচারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিচারকের আসনে বসে তিনি কখনো ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রাধান্য দেননি; বরং আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নীতিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর রায়গুলোতে সাধারণত যুক্তির দৃঢ়তা, আইনের সঠিক ব্যাখ্যা এবং নৈতিক অবস্থানের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যেত। সহকর্মী বিচারক ও আইনজীবীদের কাছেও তিনি ছিলেন একজন সংযত, মানবিক ও নীতিবান মানুষ।
এখানে বিশেষভাবে আলোচিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০১৩ সালে একটি বহুল আলোচিত অর্থপাচার মামলায় বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিচারিক স্বাধীনতার একটি সাহসী উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। সে সময় দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক ও উত্তাপ বিরাজ করছিল। এমন পরিস্থিতিতে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ রায় প্রদান করা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু মোতাহার হোসেন সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেননি।
এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর নাম একটি সাহসী ও নিরপেক্ষ বিচারকের প্রতীক হিসেবে আলোচিত হতে থাকে। বিভিন্ন মহলে এমন আলোচনাও ছিল যে, এই রায়ের কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নানা প্রতিকূলতা ও চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এমনকি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তাঁকে পরবর্তীতে বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, একজন বিচারক হিসেবে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে ন্যায়বিচারের নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই মনোভাবই তাঁর ব্যক্তিত্বকে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন তাঁর নাম দুদকের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান হিসেবে সামনে আসে, তখনই বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিন্নধর্মী কিছু তথ্য প্রচার হতে শুরু করে। কোথাও বলা হচ্ছে তিনি অসুস্থ, কোথাও বলা হচ্ছে তিনি চিকিৎসাধীন এবং দায়িত্ব পালনের অবস্থায় নেই। অথচ তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি—এই তথ্যগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি সত্যিই কোনো ব্যক্তি তাঁর সততা, সাহসিকতা ও অভিজ্ঞতার কারণে আলোচনায় আসেন, তাহলে তাঁর সম্পর্কে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রয়োজন কেন দেখা দেয়? অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণ প্রায়ই বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নেতৃত্ব অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
ফলে কখনো কখনো সেই নেতৃত্বকে ঠেকানোর জন্য অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা দেখা যায়।
এদিকে দুদকের নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের প্রক্রিয়াও এবার একটি নতুন কাঠামোর মধ্য দিয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশনের কাঠামো সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে। আগের কাঠামোতে যেখানে একজন চেয়ারম্যানসহ তিনজন কমিশনার থাকতেন, সেখানে নতুন কাঠামোতে চেয়ারম্যানসহ সর্বোচ্চ পাঁচজন কমিশনার থাকার বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একজন নারী এবং একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কমিশনার রাখার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের লক্ষ্য হচ্ছে দুর্নীতির নতুন ধরণ—বিশেষ করে ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ ও জটিল আর্থিক জালিয়াতি—মোকাবিলায় কমিশনকে আরও দক্ষ করে তোলা। নতুন কমিশন গঠনের জন্য একটি সাত সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করার কথাও বলা হয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। এই কমিটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করবে, অভিজ্ঞতা যাচাই করবে এবং সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রার্থীদের বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় বাস্তবিক অর্থে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে মোতাহার হোসেনের নাম আলোচনায় আসা অনেকের কাছে আশাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই পরিচালনা করতে হলে এমন একজন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যিনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে আপস করবেন না।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জনগণও সেই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। কিন্তু যদি সত্যিই কোনো চক্র বিভ্রান্তি ছড়িয়ে একজন সম্ভাব্য যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ ঠেকানোর চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচার নয়; বরং সরকারের ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী নীতির জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে অপপ্রচারকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কারণ দুর্নীতিবিরোধী লড়াই তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না।
বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রা টেকসই করতে হলে সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দুদকের নতুন নেতৃত্ব তাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সেই নেতৃত্ব এমন হতে হবে, যিনি কেবল আইনের ভাষা জানেন না, বরং ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনা ধারণ করেন।
শেষ কথা:
একজন নীতিবান, সাহসী এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব যদি দুদকের নেতৃত্বে আসেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থা নতুন করে জাগ্রত হতে পারে। আর যদি সেই প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্তি বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়, তাহলে তা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই একটি গভীর উদ্বেগজনক বিষয়।
কারণ, বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন একটি নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছে—যে নেতৃত্ব দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হবে, আইনের শাসনের প্রশ্নে দৃঢ় থাকবে এবং রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে।
লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ইমেইল:
ahabibhme@gmail.com