যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার পররাষ্ট্রনীতির আত্মমর্যাদা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক ভূমিকার ওপর। একটি দেশ বিশ্বদরবারে কতটা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, তা বহুলাংশেই নির্ধারিত হয় সে দেশের সরকারের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সংবাদমাধ্যমের প্রহরীসুলভ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চব্বিশ-উত্তর বাংলাদেশে যখন জাতীয় আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, ঠিক তখন দেশের গণমাধ্যমের একাংশের ভূমিকা চরম হতাশাজনক এবং প্রশ্নবিদ্ধ। সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশের মূলধারার অনেক গণমাধ্যম যেন দিল্লির সাউথ ব্লকের প্রেসক্রিপশন ও মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের উন্মুক্ত মঞ্চে পরিণত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, জনআকাঙ্ক্ষা এবং সত্যের পক্ষে না দাঁড়িয়ে আমাদের গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ যেভাবে ভারতীয় সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাচ্ছে, তা কেবল দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে না, বরং সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এক গুরুতর সতর্কসংকেতও বটে।
সর্বশেষ ঘটনাটির সূত্রপাত সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার বাতিলের ঘটনাকে ঘিরে। ২৯ আগস্ট নয়াদিল্লির Foreign Correspondents’ Club of South Asia বা FCC South Asia এবং বেলজিয়ামভিত্তিক Hand in Hand Foundation-এর যৌথ উদ্যোগে ‘Europe and Asia: From Dialogue to a Partnership’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। অনুষ্ঠানে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ, গবেষক, অধিকারকর্মী ও অন্যান্য বক্তার অংশ নেওয়ার কথা ছিল। আমন্ত্রিত বক্তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদও ছিলেন। শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়নি। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে অনুমতি না দেওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে হয় এবং আবেদনপত্রে ‘certain controversies’ কথাটি উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে নিউ দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার বলেছেন, FCC-তে এ ধরনের প্যানেল আয়োজনের জন্য পুলিশের অনুমতি প্রয়োজন হয় না এবং পুলিশ কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। অর্থাৎ ঘটনাটির সরকারি ব্যাখ্যায় একটি অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। অন্যদিকে এফসিসির সভাপতি ওয়াইল আওয়াদ নিজেই গণমাধ্যমে চরম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন যে এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা সভা ছিল এবং পুলিশ কেন অনুমতি দিল না তা তিনি নিশ্চিত নন।
কিন্তু এই সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বিষয়টিকে ‘বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের কূটনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার অনন্য প্রমাণ’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠল।
আমাদের গণমাধ্যম কীভাবে আগ বাড়িয়ে এই মনগড়া ব্যাখ্যা আবিষ্কার করল, সেটিই আমার প্রশ্ন। দিল্লি পুলিশের অব্যক্ত চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে নিজেদের মাথা থেকে বানিয়ে ‘সম্পর্ক উন্নয়নের শুভ উদ্যোগ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা কোনো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নয়; এটি হলো প্রভুর অবাধ্য না হওয়ার এবং দাসত্বমূলক মনস্তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত একপ্রকার চাটুকারিতা।
এখানে স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি যে, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে চরম আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। ওই সংবাদ সম্মেলনের আগেই ঢাকা থেকে ভারত সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছিল যেন শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও ভারত সেই অনুরোধে কান দেয়নি।
এমনকি ৫ আগস্টের নজিরবিহীন আপত্তিকর বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকারের তীব্র প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা সত্ত্বেও ১৮ আগস্ট ভারতের ‘দি পায়োনিয়ার’ পত্রিকায় শেখ হাসিনার একটি দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বিষোদ্গার করেন এবং বর্তমান সরকারের প্রতি ঘৃণা ছড়ান। এছাড়াও হাসিনা ভারতে আশ্রয় লাভের পর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে নিয়মিত সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এবং একের পর এক বিতর্কিত অডিও বার্তা ছড়িয়ে উসকানি দিচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে,এসব অডিও বার্তা বা রাজনৈতিক তৎপরতা যে শেখ হাসিনা কেবল নিজস্ব চিন্তাভাবনা থেকে করছেন তা নয়, বরং তাঁর আশ্রয়দাতা ভারতের প্ররোচনা ও প্রেসক্রিপশনেই তিনি এসব করছেন—এটা বোঝার জন্য কোনো বড় রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ভারত শেখ হাসিনাকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং এই কার্ড খেলা ভারত কখন বন্ধ করবে আদৌ করবে কিনা তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ থেকে যায়।
এখানে আমি মনে করি যে,ভারত সরকার যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বা জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানাতে চাইত, তবে তারা সরকারি মুখপাত্রের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বলতে পারত যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের স্বার্থে তারা ঝামেলা করতে চায় না বলেই এফসিসির সেমিনার বন্ধ করেছে। তারা তা যখন স্পষ্টভাবে বলেনি, তখন আমাদের মিডিয়া গায়ে পড়ে কেন আগ বাড়িয়ে বলে দিল যে এটা সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য করা হয়েছে?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের আরেকটি লজ্জাজনক ও লক্ষণীয় বিষয় হলো ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ের প্রতি তাদের অন্ধ ও অতি-সংবেদনশীল নজরদারি। দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যত ক্ষুদ্র, অস্পষ্ট বা এক লাইনের মন্তব্যই করা হোক না কেন, বাংলাদেশের মূলধারার পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সেটিকে নানা রঙের প্রলেপ দিয়ে পত্রিকার প্রধান শিরোনাম বা টকশো-র প্রধান উপজীব্য বানিয়ে ফেলে। তাদের এই অযাচিত উৎসাহ দেখে মনে হয় যেন তারা জাতিসংঘ সদর দপ্তর কিংবা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রচার করছে।
এখানে দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে চাই, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং সমর্থন দিয়েছিল—সেই ঐতিহাসিক সত্যের জন্য ভারত ও তার জনগণের প্রতি আমরা চির কৃতজ্ঞ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের এই সহযোগিতার মুহূর্ত বা অধ্যায়টিকে একপাশে সরিয়ে রাখলে, গত ৫৬ বছরে আর এমন একটি উদাহরণ কি দেখানো যাবে যেখানে ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়েছে?
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনো সদিচ্ছা দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে কখনই দেখা যায়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা সহযোগিতা করেছিল বলে শতাব্দী জুড়ে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার ব্ল্যাংক চেক দিয়ে বাংলাদেশকে শোষণ করবে, নিপীড়ন করবে, পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করবে, সীমান্তে গুলি করে মানুষ মারবে আর রক্তচক্ষু দেখাবে—সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যাদের মধ্যে ন্যূনতম দেশপ্রেম আছে, তারা কিছুতে এটা মেনে নিতে পারে না।
আজ সীমান্ত হত্যার যে চিত্র আমরা দেখি, তা পৃথিবীর কোনো সভ্য জাতির ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভারতের প্রতিবেশীনীতি ও আধিপত্যবাদী আচরণের নগ্ন রূপ উন্মোচিত হয় তাদের সীমান্ত নীতির দিকে তাকালে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গেও ভারতের রয়েছে প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার সীমান্ত। অথচ গত ২৫ বছরে (২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত) ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায় ৩,০০০ নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে।
এখানে স্মরণ করা দরকার যে,১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে, চরম সীমান্ত উত্তেজনা দেখা দিয়েছে এবং হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু চাইলেই যখন-তখন সীমান্তে বেসামরিক মানুষ হত্যা করতে পারেনি ভারতের বিএসএফ। কারণ পাকিস্তান কোনো নতজানু রাষ্ট্র নয়; তারা আক্রান্ত হলে সাথে সাথে পাল্টা আক্রমণ করার সক্ষমতা রাখে এবং প্রতিটি উসকানির মুখেই তারা প্রতিবার পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। সর্বশেষ পাহেলগাম ইস্যুতেও ভারতকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে পাকিস্তান। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও গত প্রায় ৮০ বছরে পাকিস্তানের ৫০ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যার কোনো রেকর্ড আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। যেখানে বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে গড়ে প্রায় প্রতি মাসে ৬ জন বেসামরিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করছে!
এই বৈষম্যমূলক পরিসংখ্যানই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা আজ কতখানি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এবং অতীত থেকে বয়ে বেড়ানো নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে একটি সত্য আমি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই,চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে কার্যত ভারতের সাউথ ব্লকের কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা অনুগত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছিল। সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্লজ্জ বক্তব্য “দিল্লি আছে আমরা আছি” কিংবা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রী” জাতীয় প্রজা সুলভ বয়ান বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জাতীয় আত্মমর্যাদায় চরম আঘাত হেনেছিল। শেখ হাসিনা নিজেও গর্ব করে বলেছিলেন, “আমি ভারতকে যা দিয়েছি, তারা তা কোনোদিন ভুলতে পারবে না।” প্রকৃতপক্ষে, ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য কায়েমের জন্য বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।
তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকার পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠন করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও, তিনি তড়িঘড়ি দিল্লি না গিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে বেছে নেন মালয়েশিয়া এবং পরবর্তীতে চীন সফর করেন, যা কূটনৈতিক ভারসাম্যের এক অনন্য নজির। একই সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ভারতকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পলাতক আসামিদের ফেরত দেওয়া, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা এবং অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি ছাড়া তড়িঘড়ি কোনো সফর সম্ভব নয়। দিল্লি ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন না করে যে সংকুচিত মনোভাব দেখিয়েছিল, তারেক রহমান সমমর্যাদার জায়গায় দাঁড়িয়ে তার যোগ্য জবাব দিয়েছেন।
একই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় ফ্রেমওয়ার্ক এবং ‘মক্কা প্রতিরক্ষা প্যাক্ট’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের যে ইতিবাচক মানসিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তুলেছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে আমাদের জন্য এই মক্কা প্যাক্টে যোগদানের কোনো বিকল্প নেই। দিল্লি পুলিশ কর্তৃক তথাকথিত একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার বাতিলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম বা নীতিনির্ধারকদের কেউ যদি মনে করে থাকেন যে ভারত হঠাৎ আমাদের বড় পরম বন্ধু হয়ে গেছে এবং সেই সুবাদে আমাদের মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার আর দরকার নেই, তবে আমি মনে করি সেটা হবে বাংলাদেশের জন্য চরম আত্মঘাতী একটি সিদ্ধান্ত। ভারতের সাময়িক কোনো কৌশলগত চালে বিভ্রান্ত না হয়ে বাংলাদেশের উচিত কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে মক্কা প্যাক্টে যোগদান করা এবং দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
এদিকে সরকারের প্রথম ছয় মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগান্তকারী সাফল্য ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর নতুন দিগন্ত যখন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থানকে পুনর্গঠন করছে, ঠিক তখনই ‘প্রথম আলো’র মতো গণমাধ্যমগুলো পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্বের অহেতুক ও অনভিপ্রেত বিতর্ক সামনে এনে এক চরম চক্রান্তমূলক ভূমিকা পালন করছে। যা আইনি নোটিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। সংবিধানের ৫৬ ও ৬৬ ধারা অনুযায়ী টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী নিয়োগের পর সাধারণ পাসপোর্ট জমা দিয়ে লাল (অফিসিয়াল) পাসপোর্ট গ্রহণ করার পর সেখানে দ্বৈত নাগরিকত্বের আইনি কোনো জটিলতা থাকে না। অথচ একটি সাফল্যকে ম্লান করতে তথ্য বিকৃত করে এই ‘অপসাংবাদিকতা’ পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সেই ঐতিহাসিক প্রশ্ন—“কার এত জ্বালা?”—প্রকৃতপক্ষে উন্মোচন করে দেয় যে, এই জ্বালা প্রথম আলোর নিজস্ব নয়, এই জ্বালা তাদের পেছনের প্রভুদের। মূলত ভারতীয় অপপ্রচার ও গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী এই মাধ্যমগুলো কোনোভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীন আন্তর্জাতিক সাফল্য মেনে নিতে পারছে না।
দিল্লির সাউথ ব্লক ও তাদের দেশীয় সহযোগীরা বিগত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনাকে “জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনের একমাত্র কান্ডারী” হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিক্রি করে ক্ষমতার লাইসেন্স কিনেছিল। আজ হাসিনাহীন বাংলাদেশে তারা আবারও সেই পুরনো ‘উগ্রবাদের বয়ান’ ছড়িয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। ভারতে বসে শেখ হাসিনার বিষোদ্গার ও ‘দি পায়োনিয়ার’ পত্রিকার নিবন্ধের সংগে আমাদের দেশের কিছু পত্রিকার সংবাদ পরিবেশনের অদ্ভুত মিল পরিলক্ষিত হয়। দিল্লির মূল ভয় ও ব্যাকুলতা আসলে শেখ হাসিনার আমলে সম্পাদিত তিনটি মারাত্মক একপেশে চুক্তি নিয়ে— চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের (এসিএমপি) চুক্তি যেখানে কাস্টমস চেকিং ছাড়াই ভারতের পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএসএ), এবং ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট (পিআইডব্লিউটিটি) প্রটোকল।
চব্বিশ-উত্তর নির্বাচিত সরকার যদি এসব চুক্তি পর্যালোচনা বা বাতিল করে, তবে গত ১৫ বছরে ভারত বিনামূল্যে যেসব সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছিল তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই দিল্লি উগ্রবাদের ভুয়া বয়ান তৈরি করে এবং হাসিনাকে ‘ট্রাম্পকার্ড’ বানিয়ে চাপ সৃষ্টি করে তারেক রহমানকে তড়িঘড়ি দিল্লি নিয়ে এসব চুক্তি সচল রাখার গ্যারান্টি আদায় করতে চাইছে। ১/১১-এর অসাংবিধানিক সরকার আনার নেপথ্যে থাকা গণমাধ্যমগুলো আজ আবারও সেই চক্রান্তে শামিল হয়েছে।
বস্তুতপক্ষে পতিত-পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ছায়া থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর কোনো প্রচেষ্টা দিল্লির আচরণে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই চরম বাস্তবতার নূন্যতম প্রতিচ্ছবি আমাদের অধিকাংশ গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে না। বরঞ্চ আমাদের নির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যম বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও জনআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায় অনেক বেশি মনোযোগী।
বিশ্বের যেকোনো স্বাধীন দেশের গণমাধ্যমের প্রথম ও প্রধান নীতি হলো—জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো গণতান্ত্রিক দেশের গণমাধ্যমগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেও জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত কিংবা বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে নিজেদের ‘জাতীয় স্বার্থ’ (National Interest) কে সর্বাগ্রে তুলে ধরে। এমনকি ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সরকারের সমালোচনা করলেও বাংলাদেশ বা পাকিস্তান নীতিতে শতভাগ সাউথ ব্লকের জাতীয় এজেন্ডা ও গোয়েন্দা সংস্থার বয়ান হুবহু প্রচার করে। অথচ আমাদের দেশের গণমাধ্যমের দেউলিয়াত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভূতপূর্ব সাফল্যকে খাটো করে প্রতিবেশী দেশের চাটুকারিতায় লিপ্ত থাকে। এটি কেবল পেশাগত দেউলিয়াত্বই নয়, এটি চরম দেশদ্রোহী ভূমিকা ও নৈতিক পতন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে যে কোনো সময় বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই,উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চাণক্যনীতি, উগ্রবাদের মনগড়া বয়ান কিংবা গণমাধ্যমের অপপ্রচার চালিয়ে চব্বিশ-উত্তর আত্মমর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশকে আর চেপে রাখা সম্ভব নয়। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে চায়, তবে তাদের শেখ হাসিনাসহ ভারতে আশ্রয় নেওয়া সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফেরত দিতে হবে এবং সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। প্রথম আলোর মতো গোষ্ঠীগুলোর অপপ্রচারের গায়ের জ্বালা যতই বাড়ুক না কেন, বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির যে সূচনা করেছে, তা কোনো চক্রান্তে দমে যাবে না। সুতরাং জাতীয় স্বার্থ ও জনআকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে যেসব গণমাধ্যম বিদেশি আধিপত্যবাদের দালালি করছে, তাদের এই অপসাংবাদিকতাকে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার অগ্রযাত্রাকে থামানোর সাধ্য কারো নেই। ষড়যন্ত্রকারীরা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হবেই ইনশাল্লাহ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com