রাজনীতিতে ভণ্ডামি নতুন কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং এটিই এখন আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনীতির প্রধান ময়দান হয়ে ওঠার পর সেই ভণ্ডামি প্রকাশ্য, নির্লজ্জ এবং প্রায় নির্বিকার হয়ে ওঠেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে দেওয়া একটি পোস্ট ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রগত সংকটের একটি উন্মুক্ত দলিল।
জামায়াতের দাবি—ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল এবং মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে সেটি পুনরুদ্ধার করা হয়। এই দাবিই পুরো ঘটনাকে হাস্যকর করে তোলে। কারণ প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় এর কোনো ভিত্তি নেই। একদমই নেই।
আমি কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে লিখি না। বিশেষ করে প্রযুক্তির মতো স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য বিষয়ে অনুমাননির্ভর বক্তব্য আমার কাছে পেশাগত অসততা। এই কারণেই আমি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কর্মরত একজন অভিজ্ঞ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁর বক্তব্য দ্ব্যর্থহীন—বাংলাদেশে যেসব ঘটনাকে ‘হ্যাক’ বলা হয়, তার সিংহভাগই প্রকৃত অর্থে হ্যাক নয়। এগুলো মূলত কম্প্রোমাইজিং হ্যাক।
এর অর্থ—যে অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছে বলে প্রচার করা হয়, সেটির ভেতরের কেউ না কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এটি ইচ্ছাকৃতও হতে পারে, সুবিধাবাদীও হতে পারে, আবার অবহেলাজনিতও হতে পারে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই বাইরের কোনো পেশাদার হ্যাকার দলের নিখুঁত অপারেশন নয়।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনাকেও প্রথমে ‘সাইবার হ্যাক’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। পরে সেটিই প্রমাণিত হয়—ভেতরের সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়। অর্থাৎ সেটিও ছিল কম্প্রোমাইজিং হ্যাক।
একজন পেশাদার হ্যাকার কোনো ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে ঢুকলে প্রথমেই রিকভারি ইমেইল, ফোন নম্বর এবং টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এসব না বদলে কেবল একটি পোস্ট দিয়ে বসে থাকা—পেশাদার হ্যাকিংয়ের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে না।
এই বাস্তবতায় জামায়াতের ‘৪৫ মিনিটে রিকভার’ গল্প বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং এটি একটি সাজানো ব্যাখ্যা।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—পোস্টটি কে দিল? উত্তরটা খুবই অস্বস্তিকর, কিন্তু বাস্তবসম্মত। শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট এককভাবে পরিচালিত হয় না। নির্বাচন সামনে থাকলে তো নয়ই। অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেন একাধিক অ্যাডমিন। এই ঘটনার সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো—জামায়াত আমীরের অ্যাকাউন্টের কোনো একজন অ্যাডমিন পোস্টটি দিয়েছেন। বিতর্ক শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘হ্যাক’ শব্দটি সামনে আনা হয়েছে।
এখানে আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হচ্ছে—কেন একজন অ্যাডমিন এমন করবেন?
উত্তর একাধিক হতে পারে। দল বা নেতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্কে ফেলতে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থেকে। রাজনৈতিক বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে। অথবা চরম দায়িত্বহীনতায় পাসওয়ার্ড শেয়ার করার মাধ্যমে।
একটি সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে স্ক্রিনশট নেওয়ার অভিযোগ পুরো ঘটনাকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে। এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট ও স্বচ্ছ জবাব জামায়াত দিতে পারেনি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এক্স পোস্টের বক্তব্যটি কি জামায়াতে ইসলামের আদর্শের বাইরে?
আসল সত্য হলো, পুরোপুরি বাইরে নয়। জামায়াতের নারীবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এই বক্তব্য একেবারে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এটি ব্যাখ্যার সুযোগ রাখে—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না।
ভোটের ঠিক আগে, যখন সমাজ নারীর প্রশ্নে সংবেদনশীল, তখন এমন ভাষা ব্যবহার রাজনৈতিক আত্মঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রশ্ন হলো—জামায়াত কি এতটাই রাজনৈতিকভাবে অদূরদর্শী, নাকি তারা ভেবেছিল দায় এড়ানো যাবে?
আমি মনে করি,নৈতিক সাহস থাকলে জামায়াত এই বক্তব্যের দায় স্বীকার করতে পারত। কোরআন ও হাদিসের আলোকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং হ্যাকের গল্প সাজিয়ে একটি আদর্শিক বিতর্ককে প্রযুক্তিগত অজুহাতে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটিই ভণ্ডামি।
এই ভন্ডামি জামায়াতের ভোটের রাজনীতিতে হয়তো বড় কোনো ক্ষতি করবে না। কারণ, যারা জামায়াতকে ভোট দেন, তারা এতে বিচলিত হবেন না। আর যারা জামায়াতকে ভোট দেন না, তারা এমনিতেই দেবেন না। বরং একটি নির্দিষ্ট রক্ষণশীল ভোটব্যাংক এই বক্তব্যে আরও সংহত হলেও আমি অবাক হব না।
অন্যদিকে যারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন, তারা জামায়াতের ভোটব্যাংকের অংশ নন। এটিই নির্মম সত্য।
এই বিতর্কে আরেকটি ভণ্ডামিও নগ্ন হয়ে উঠেছে। যে বিএনপির বিরুদ্ধে ভোটের মাঠে নারীদের হেনস্তা, হিজাব টানা, পোশাক খুলে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ রয়েছে—তারাই আজ নারীবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। নারীর অধিকার নিয়ে এই হঠাৎ দরদ রাজনীতির সবচেয়ে পুরোনো ভণ্ডামিরই নতুন সংস্করণ।
নারীর অধিকার রক্ষা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেটি যদি কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হয়, তাহলে তা নৈতিক অবস্থান নয়—সস্তা রাজনীতি।
প্রশ্ন হচ্ছে—জামায়াত কি সত্যিই নারী বিদ্বেষী?
আমি তা মনে করি না। বাস্তবে জামায়াতে ইসলামের সাংগঠনিক কাঠামোয় নারীদের প্রতি শালীনতা ও শৃঙ্খলা অন্য অনেক দলের চেয়ে বেশি। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির জড়তা সেই বাস্তবতাকে ঢেকে দেয়। আর রাজনীতিতে ধারণাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
ইসলামের ইতিহাস নারী নেতৃত্বে সমৃদ্ধ। হজরত খাদিজা (রা.), হজরত আয়েশা (রা.), সাবার রানী বিলকিস, সুলতানা শাজার আল-দুরর—এই নামগুলো প্রমাণ করে ইসলাম কখনোই নারীকে নেতৃত্বের বাইরে রাখেনি। সমস্যাটি ইসলাম নয়; সমস্যাটি ইতিহাসবিচ্ছিন্ন ও সুবিধাবাদী ব্যাখ্যা।
ইসলামের ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় যে, ইসলামের ইতিহাস নারীকে কখনোই নেতৃত্বের বাইরে রাখেনি। সুতরাং
জামায়াতে ইসলামের উচিত এই ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে চর্চা করা। নারীদের বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি।
ইসলামকে অনেক সময় ভুলভাবে কেবল পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়—ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই নারী নেতৃত্ব, সিদ্ধান্তগ্রহণ ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ও সম্মানিত ভূমিকা রেখেছেন।
কুরআন, হাদিস এবং ইসলামের রাজনৈতিক–সামাজিক ইতিহাসে নারী নেতৃত্ব কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং তা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।
ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ খোদ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেই পাওয়া যায়। তাঁর প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, স্বাধীন অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এবং নবুওয়তের প্রথম বিশ্বাসী। ইসলামের সূচনালগ্নে তাঁর আর্থিক, নৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন ছাড়া নবীজির দাওয়াতি সংগ্রাম কল্পনাই করা যায় না। তিনি কেবল একজন স্ত্রী ছিলেন না, বরং এক দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতীক ছিলেন।
নবীজির মৃত্যুর পর ইসলামের জ্ঞান ও নেতৃত্বে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে গভীর, তিনি হজরত আয়েশা (রা.)। তিনি ছিলেন হাদিস বর্ণনায় অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। সাহাবি ও তাবেঈনরা তাঁর কাছে ফিকহ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ নিতেন। ইতিহাস বলছে—তিনি শুধু ধর্মীয় নয় বরং রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসেও নারী নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নজির রয়েছে। ইয়েমেনের শাসক রানী আরওয়া বিনতে আহমদ (১১শ শতক) প্রায় পাঁচ দশক ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর শাসনামলে ইয়েমেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। একইভাবে, মিশরের সুলতানা শাজার আল-দুরর ১৩শ শতকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন—যা মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বে নারী নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তিতেও নারী নেতৃত্ব অস্বীকৃত নয়। কুরআনে সাবার রানী বিলকিসের নেতৃত্বের বর্ণনা এসেছে ইতিবাচক ও সম্মানজনকভাবে। তিনি ছিলেন পরামর্শভিত্তিক, কৌশলী ও জনগণের কল্যাণে সচেতন শাসক। এই বর্ণনা স্পষ্ট করে—ইসলাম নেতৃত্বের যোগ্যতাকে লিঙ্গ দিয়ে নয়, প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের মানদণ্ডে বিচার করে।
আধুনিক মুসলিম বিশ্বেও নারী নেতৃত্ব ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়—বরং ইতিহাসের ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্কসহ বহু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, ইসলামের নামে নারী নেতৃত্বকে অস্বীকার করা মূলত ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ফল।
সুতরাং ইসলামের ইতিহাসে নারী নেতৃত্ব কোনো নতুন দাবি নয়; এটি একটি প্রমাণিত সত্য। সমস্যাটি ইসলাম নয়—সমস্যা আমাদের ইতিহাসবিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা। ইসলামের প্রকৃত চেতনায় নারী ও পুরুষ উভয়ই ন্যায়ের নেতৃত্বে সমানভাবে দায়িত্বশীল। ইতিহাস সেই কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
নৈতিক ও সততার জায়গা থেকে রাজনীতি করলে জামায়াত ভণ্ডামির আশ্রয় না নিয়ে সত্য স্বীকার করে নিতে পারত।
জামায়াত চাইলে বলতে পারত—এই বক্তব্য আমাদের আদর্শের আলোকে ব্যাখ্যাযোগ্য। কোরআন ও হাদিসের আলোকে তারা তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারত। সেটি করলে রাজনৈতিকভাবে তারা তুলনামূলক কম ক্ষতির মুখে পড়ত। কিন্তু হ্যাকের গল্প সেই সুযোগটিও নষ্ট করেছে।
এই বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামের এখন আর ধোঁয়াশার সুযোগ নেই। তারা ক্ষমতায় গেলে নারীরা আরও স্বাধীনতা পাবে—এ কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর অঙ্গীকার করতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে এ বিষয়ে অস্পষ্টতা জামায়াতের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়েই থাকবে।
শেষ কথা:
এই এক্স পোস্ট কেবল একটি পোস্ট নয়। এটি জামায়াত, বিএনপি—সব পক্ষের রাজনৈতিক ভণ্ডামির এক নগ্ন প্রদর্শনী। এখানে কেউই নৈতিক উচ্চভূমিতে নেই। ক্ষমতার রাজনীতিতে নীতি ও সততা উভয় পক্ষের কাছেই গৌণ।
এই ভণ্ডামির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে রাজনীতির নৈতিকতা।
আর সেটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ঢাকা
ahabibhme@gmail.com