নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম ভাষণে যে বার্তা দিয়েছেন, তা নতুন একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা-সংকেত বলেই মনে হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই ভাষণ একদিকে আত্মপ্রত্যয়ের ঘোষণা, অন্যদিকে দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি।
ভাষণের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় এবং হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ—এই দুই উপাদান তাঁর বক্তব্যকে আবেগময় ও ঐতিহাসিক ভিত্তি দিয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় সংগ্রামের ধারাবাহিকতার সঙ্গে নিজ সরকারের যাত্রাকে যুক্ত করেছেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ভোটাধিকার—এই তিনটি শব্দবন্ধ ভাষণের নৈতিক কাঠামো নির্মাণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বারবার “জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার” কথাটি উচ্চারণ করেছেন। এটি নিছক অলঙ্কার নয়; বরং বিগত সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান।
তিনি দাবি করেছেন, দেশ “তাবেদারমুক্ত” হয়েছে এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় প্রভাব নয়, আইনের শাসনই হবে শেষ কথা। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ব সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সুতরাং তাঁর এই প্রতিশ্রুতি কেবল দেশীয় রাজনীতির জন্য নয়, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক ইতিবাচক সংকেত।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে? কারণ প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার সময়সাপেক্ষ। দুর্বল শাসন কাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতা অল্প সময়ে বদলানো সত্যিই কঠিন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ মানুষের মধ্যে আশাবাদ জাগিয়েছে। সুতরাং মানুষ এখন এ ভাষণের বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে।
ভাষণের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। তিনি জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এটি একটি বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি অংশ মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে—যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন, সচেতনতা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না নিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
দুর্নীতির প্রশ্নে তাঁর ভাষণ ছিল সরাসরি ও দৃঢ়। “সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া” এবং “ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ” অনুসরণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সাহসের বহিঃপ্রকাশ। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাতে চাই।
এর আগেও আমি বহুবার বলেছি যে, দুর্নীতিই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা।
বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত—ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়া—প্রতীকী হলেও এই সিদ্ধান্ত সমাজকে একটি শক্তিশালী নৈতিক বার্তা দেয়।
এখানে একটি ঐতিহাসিক রেফারেন্সও নিহিত—স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান-এর প্রতিষ্ঠিত দলের উত্তরাধিকার। এই উত্তরাধিকারের নৈতিক উচ্চতা রক্ষা করাই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পবিত্র মাহে রামাদ্বানকে কেন্দ্র করে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন—এই মাসকে যেন অতিরিক্ত মুনাফার মৌসুমে পরিণত না করা হয়।
বাংলাদেশে রমাদ্বান এলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি একটি পুরনো বাস্তবতা। তাই তাঁর এই আবেদন জনমনে সাড়া জাগাবে। তবে কেবল নৈতিক আহ্বান যথেষ্ট নয়; বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করাও জরুরি বলে আমি মনে করি।
গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশনা একটি তাৎক্ষণিক জনবান্ধব পদক্ষেপ। পাশাপাশি কৃচ্ছতা সাধনের আহ্বান—মন্ত্রী ও এমপিদের দিয়ে উদাহরণ স্থাপনের চেষ্টা—রাজনৈতিক বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
রাজধানী ঢাকার যানজট ও জনদুর্ভোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছেন। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এটি একটি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি।
রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। উন্নত বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের যে ধারা, তার সঙ্গে এই পরিকল্পনার সাযুজ্য রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক সংস্থান, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কথা বলেছেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া সময়োপযোগী।
বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা—যদি দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়—তবে তা সত্যিই “জনসম্পদ” হয়ে উঠতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি খুবই আশাব্যঞ্জক।
কিন্তু এখানে প্রয়োজন সুসংগঠিত শিক্ষা সংস্কার, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো। নীতিগত ঘোষণা বাস্তব ফল দেবে তখনই, যখন তা বাজেট ও পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হবে।
ভাষণের শেষাংশে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন—যারা ভোট দিয়েছেন বা দেননি, সবার অধিকার সমান। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—পাহাড় বা সমতল—সবাই এই দেশের সমান নাগরিক।
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চরিত্রকে স্বীকৃতি দেয়। রাজনৈতিক বিভাজনের সময়ে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
রাষ্ট্র সবার—এই দর্শন যদি প্রশাসনিক আচরণে প্রতিফলিত হয়, তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
শেষ কথা:
তারেক রহমানের প্রথম ভাষণটি আশা, আত্মবিশ্বাস ও দায়বদ্ধতার সমন্বয়। যার তাৎপর্য বহুমুখী।এতে নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মিশ্রণ দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার করলে ভাষণটি একটি সুগঠিত রাজনৈতিক রূপরেখা—যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
কিন্তু ভাষণের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে বাস্তব প্রয়োগে। আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন, বাজার নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও তরুণ সমাজের কর্মসংস্থান—এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই আগামী দিনের পরীক্ষা।
অঙ্গীকারের ভাষণ জাতিকে অনুপ্রাণিত করতে পারে; কিন্তু ইতিহাস রচনা করে বাস্তবায়ন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে- প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ রাজনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং সত্যিই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com