১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর চালুর সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা সৃষ্টির চলছে, তা নিছক ব্যবসায়িক উদ্বেগ নয়—বরং এটি নাগরিক ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী একটি সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র বলে আমি মনে করি। অবৈধ আমদানি ও নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরও কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যে শর্ত আরোপের ভাষায় আন্দোলন করছে, তা ন্যায়সঙ্গত অবস্থান নয়, বরং “চোরের মায়ের বড় গলা” প্রবণতারই প্রতিফলন। বিটিআরসি সংস্কারের আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া হবে জাতীয় ও জনস্বার্থ বিরোধী। ব্যবসায়ীদের ন্যায় সঙ্গত ও যৌক্তিক দাবি বিবেচ্য হলেও ১৬ ডিসেম্বরের বাস্তবায়ন—হতেই হবে। এর কোন বিকল্প চিন্তা করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ জাতীয় স্বার্থ এবং কোটি মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর স্বার্থ কিছুতেই বড় হতে পারে না। সুতরাং বিজয় দিবসে সরকারের পরাজয় বরণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৬ ডিসেম্বর শুধুই একটি দিবস নয়—এটি জাতির আত্মপরিচয়ের দিন, স্বাধীনতার চেতনাকে নতুন করে ধারণ করার দিন। ঠিক এই ঐতিহাসিক দিনে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে জাতির জন্য এক যুগান্তকারী উপহার। সরকারের এই সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দ জানাই, কারণ এটি কেবল প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। এ উদ্যোগের জন্য সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে আমি কুণ্ঠাবোধ করি না।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মোবাইল ফোন খাতে একটি অদৃশ্য ও শক্তিশালী চক্র অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। এতে করে অনিবন্ধিত, চোরাই ও অবৈধভাবে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের অবাধ প্রবাহ একটি সমান্তরাল অবৈধ অর্থনীতির জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতির জন্য সেই সময়কার রাজনৈতিক শাসকরাই সম্পূর্ণরূপে দায়ী বলে আমি মনে করি। যারা জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে অর্থের বিনিময়ে চোরাকারবারি নেটওয়ার্ককে বছরের পর বছর পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এই বাস্তবতায় দেশের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র কার্যত এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করতে বাধ্য হয়েছে, যা ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
এনইআইআর চালু না থাকার ফলে গত দেড়-দুই দশকে দেশে অপরাধপ্রবণতা বহুগুণে বেড়েছে। চুরি হওয়া মোবাইল দিয়ে প্রতারণা, বিকাশ ও অন্যান্য আর্থিক সেবায় জালিয়াতি, ছিনতাই,হুমকি, এমনকি নানা গুরুতর অপরাধে অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেট ব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। মোবাইল ফোন, যা মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এনইআইআর যদি আগেই কার্যকর থাকত, তাহলে বহু পরিবার মানসিক, সামাজিক এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ত না। অর্থাৎ মানুষ একটি নিরাপদ জীবন পেত।
এই প্রেক্ষাপটে ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর চালুর ঘোষণা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী বার্তা—রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর উদ্যোগে এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ঘোষণায় যে দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এনইআইআর ব্যবস্থার মূল শক্তি হচ্ছে এর কেন্দ্রীভূত কাঠামো। প্রতিটি মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বরকে ব্যবহারকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও সংশ্লিষ্ট সিমের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে উঠবে। বৈধ ও অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা সহজ হবে, চুরি হওয়া ফোন দ্রুত ব্লক করা সম্ভব হবে এবং অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত ডিভাইস চিহ্নিত করা যাবে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনেও ফিরে আসবে আস্থার অনুভূতি।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেশের চারটি প্রধান মোবাইল অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও টেলিটক বাংলাদেশ—নিজস্ব ইআইআর ব্যবস্থা তৈরি করছে, যা একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। একইসঙ্গে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হকের বক্তব্যে যে নির্দেশনা এসেছে—অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে গ্রাহককে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো ও নির্দিষ্ট সময় পর নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া—তা শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা বলেই আমি মনে করি।
এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক ও শিল্পখাতের সুরক্ষা। মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ–এর সভাপতি জাকারিয়া শহীদের আশা—দেশীয় উৎপাদনশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে ভবিষ্যতে রপ্তানিতে সক্ষম হবে—তার পেছনে যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। অবৈধ আমদানির পথ বন্ধ হলে বৈধ উৎপাদকরা ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং একটি স্থিতিশীল প্রযুক্তি-শিল্প গড়ে উঠবে।
পাশাপাশি আমি এ কথাও বলতে চাই যে,এই অর্জনের উৎসবে আত্মতৃপ্তিতে ভেসে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। এটি মূলত রাজনৈতিক সরকারেরই দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পতিত স্বৈরাচার সরকার অবৈধ অর্থ ও অসাধু সুবিধার বিনিময়ে জনগণকে দিনের পর দিন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখে দিয়েছে। এমন রাজনীতি, এমন রাজনৈতিক দর্শন একটি জাতির জন্য কল্যাণ নয়, বরং অভিশাপ। তাই আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—ভবিষ্যতে যেন কোনো জাতিকে এমন ব্যর্থ নেতৃত্বের চরম মূল্য দিতে না হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এনইআইআর শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নয়; এটি একটি নৈতিক সংশোধনের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্র চাইলে নাগরিকের জীবন নিরাপদ করতে পারে, অপরাধের পথ সংকুচিত করতে পারে এবং একটি সুশাসিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল অতীতের গৌরব নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়িত্ববোধও।
পরিশেষে বলা যায়, এনইআইআর ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন যদি কঠোরভাবে, স্বচ্ছভাবে ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে বজায় রাখা যায়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন নিরাপদ ডিজিটাল যুগের সূচনা করবে। ১৬ ডিসেম্বরের এই ‘বিশেষ উপহার’ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব জীবনে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে-এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক:সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা। ahabibhme@gmail.com