আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: হানাদার বাহিনীর প্রেতাত্মারা আজও সক্রিয়

১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল ও প্রতিরোধের প্রতীকী দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা পরিকল্পিতভাবে এ দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নবজাত রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করা, জাতির চিন্তা-চেতনার নেতৃত্বকে ধ্বংস করে স্বাধীনতার অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়া। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, গবেষক—জাতির সূর্যসন্তানদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রায়েরবাজার, মিরপুরসহ নানা প্রান্ত। ইতিহাসের সেই কলঙ্কময় অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের মুক্তি নয় বরঞ্চ এটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নও বটে।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, ১৯৭১-এর সেই পরাজিত শক্তির ভাবধারা আজও নানা রূপে সক্রিয়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও হানাদার বাহিনীর প্রেতাত্মারা ভিন্ন নামে, ভিন্ন কৌশলে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে, শহীদদের ত্যাগকে খাটো করে, স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। এই প্রবণতা কেবল স্মৃতির অবমাননা নয়; এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ বলে আমি মনে করি।

মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিরা শুরু থেকেই সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় থেকেছে। কখনো ধর্মের অপব্যাখ্যা, ভুয়া তথ্য ও গুজবের আশ্রয়ে তারা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। ডিজিটাল যুগে এসে এই অপতৎপরতা আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সবখানেই ইতিহাস বিকৃতির এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস ধোঁয়াশায় পড়ছে। এ বিষয়ে আমাদের এখনই সজাগ হতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীরবতা আমাদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ে নিয়ে আসতে পারে।

অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননা ও সহিংসতার ঘটনাও জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিজয়ের মাসে রংপুরে এক বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা দম্পতির নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পরাজিত শক্তির ঘৃণার রাজনীতি কতটা নির্মম হতে পারে। মুক্তিযোদ্ধারা কেবল অতীতের নায়ক নন; তারা বর্তমান রাষ্ট্রের জীবন্ত নৈতিক ভিত্তি। তাদের ওপর আঘাত মানে স্বাধীনতার ভিত্তির ওপরই আঘাত।

একই সঙ্গে প্রবাসে বসে কিছু ইউটিউবার মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনী নিয়ে ধারাবাহিক অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অনিবার্য শর্ত হলেও ইতিহাস বিকৃতি ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে সংবিধানের আত্মাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এই অপপ্রচারের ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি সাহস পাচ্ছে, আর একাত্তরের পরাজিত শক্তি উল্লাস করছে।

এখানে আরেকটি গভীর সংকট লক্ষণীয় হচ্ছে ধর্মের অপব্যাখ্যা। ধর্ম এ দেশের মানুষের জীবনে নৈতিকতার শক্তিশালী উৎস। কিন্তু যখন ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত হয়। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চায়। জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও ক্ষমতার মসনদে পৌঁছানোর এই মরিয়া প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক।

তবে ইতিহাস আমাদের সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, মানবিক সূচক, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক অগ্রগতিতে অনেক ক্ষেত্রেই পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে জাতিকে থামিয়ে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র ছিল, তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবোধের লড়াইও সমান গুরুত্বপূর্ণ আমি মনে করি।

তাই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস শুধু আমাদের শোকের স্মরণ নয় বরং এটি প্রতিরোধের শপথ। প্রতিরোধ মানে কেবল রাস্তায় নামা নয়,এটি বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রতিরোধ। শিক্ষাব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নির্ভুল ও সমৃদ্ধ পাঠ নিশ্চিত করা, গবেষণা ও প্রকাশনায় প্রামাণ্যতা বজায় রাখা, গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা-এসবই এই প্রতিরোধের অংশ। একই সঙ্গে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো জরুরি, যাতে মানুষ গুজব ও অপপ্রচার চিহ্নিত করতে পারে।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও সচেতনতা অপরিহার্য। আগামী নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনার প্রশ্ন। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হচ্ছে সুচিন্তিত রায় দেয়া। ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। যা আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে তাকালেও দেখা যায়, যেসব জাতি তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করে বা বিকৃত করে, তারা টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রে পিছিয়ে পড়ে। জার্মানি নাৎসি অতীতের মুখোমুখি হয়েছে বলেই তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে দৃঢ়। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবাদের সত্য উন্মোচন করেছে বলেই জাতিগত পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশও মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে রক্ষা করেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো বেশি মর্যাদা অর্জন করতে পারে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে তাই আমাদের অঙ্গীকার স্পষ্ট হওয়া দরকার। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা, ধর্মের মানবিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা, এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা একান্ত আবশ্যক। সংস্কৃতি, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র সবখানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জীবন্ত রাখতে হবে। কারণ সংস্কৃতিই একটি জাতির দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ।

শেষ কথা:

আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? একটি বিভ্রান্ত, বিভাজিত ও ইতিহাসবিমুখ রাষ্ট্র, নাকি একটি আত্মবিশ্বাসী, মানবিক ও ইতিহাসসচেতন বাংলাদেশ? শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের পথচলা হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, সচেতন ও সাহসী। হানাদার বাহিনীর প্রেতাত্মারা যতই সক্রিয় থাকুক, ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কিছুতেই থামানো যায় না। সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin