একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কল্পনা করা যাক—শান্ত ও নির্মল সবুজ মাঠ, লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে থাকা স্বপ্নবাজ তরুণেরা, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতে উঠতে জন্ম নিচ্ছে নতুন চিন্তা, নতুন বিতর্ক, নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সেই ক্যাম্পাসই হঠাৎ করে বদলে যায়—শ্লোগান, দৌড়ঝাঁপ-ভাংচুরের শব্দে, আর আতঙ্কে ছুটে চলা শিক্ষার্থীদের ভিড়ে।
যেখানে কলম থাকার কথা ছিল হাতে, সেখানে দেখা যায় লাঠি; যেখানে যুক্তি হওয়ার কথা ছিল ন্যায়-নীতি ও আদর্শ, সেখানে প্রাধান্য পায় শক্তির প্রদর্শন। প্রশ্ন হচ্ছে—আবারো কোন পথে হাঁটছে আমাদের শিক্ষাঙ্গন?
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা—সংঘর্ষের রেখাচিত্র যেন একই গল্প বলছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির–এর মুখোমুখি অবস্থান, শাহবাগ–এ উত্তেজনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ভেতরে পাল্টাপাল্টি অবস্থান—এসব কি শুধুই আকস্মিক? নাকি এটি একটি সুপরিকল্পিত পুনরুত্থান, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে আবারও রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত করা হচ্ছে?
সবচেয়ে কঠিন সত্যটি হলো—এই অস্থিরতার পেছনে কেবল একটি পক্ষ নয়, বরং একটি অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি দায়ী। যে সংস্কৃতি শিক্ষাঙ্গনকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র না ভেবে ক্ষমতার করিডোরে প্রবেশের সিঁড়ি হিসেবে দেখে। যে সংস্কৃতি ছাত্রদের ‘মানুষ’ নয়, ‘ক্যাডার’ হিসেবে গড়ে তোলে। যে সংস্কৃতিতে ভিন্নমত মানেই শত্রু, আর শত্রুকে দমন করাই যেন নৈতিক দায়িত্ব।
ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত’ বলে আখ্যায়িত করার পর থেকে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে—এটা সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, ‘গুপ্ত’ কিংবা ‘প্রকাশ্য’—এই তর্কের আড়ালে আসল প্রশ্নটি চাপা পড়ে যাচ্ছে: কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সহিংসতার রাজনীতি এত সহজে ফিরে আসে? কেন একটি লেবেল লাগানো মাত্রই তরুণরা বই ছেড়ে লাঠি হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়?
এখানেই আমাদের নির্মম আত্মসমালোচনার প্রয়োজন। কারণ, আমরা একটি প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলেছি, যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য বুদ্ধিবৃত্তিক সততার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো অনেক ক্ষেত্রে আর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং প্রভাব বিস্তারের ঘাঁটি।
সিট পেতে হলে আনুগত্য দেখাতে হয়, টিকে থাকতে হলে ‘লাইন’ মেনে চলতে হয়—এ এক নীরব দাসত্ব, যা আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি।
আর প্রশাসন? তারা কি সত্যিই নিরপেক্ষ? নাকি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার নামে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে? যখন একটি সংঘর্ষের পর আরেকটি সংঘর্ষ ঘটে, যখন একই চক্র বারবার ফিরে আসে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তাদের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা কোথায়?
রাজনৈতিক দলগুলোর কথাও বলতে হয়। তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও, বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের ‘ফ্রন্টলাইন’, যেখানে আদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় শক্তি প্রদর্শন। ফলে সংঘর্ষ যেন একটি নিয়মিত ‘অভ্যাসে’ পরিণত হয়েছে—যেখানে রক্তপাতও আর কাউকে বিচলিত করে না।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা—যারা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই শুধু পড়াশোনা করতে চায়। তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এখন অনিশ্চয়তার আরেক নাম। আজ ক্লাস হবে কি না, হল নিরাপদ কি না, কখন কোথায় সংঘর্ষ বেঁধে যাবে—এই অনিশ্চয়তা তাদের প্রতিদিন তাড়া করে বেড়ায়। তাদের স্বপ্ন, তাদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই যেন এই অস্থিরতার কাছে জিম্মি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে , আমরা কি আবার সেই অন্ধকার সময়ে ফিরে যাচ্ছি, যখন বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ছিল ভয়, সহিংসতা আর দখলদারিত্ব? যদি সত্যিই তাই হয়, তবে এটি কেবল একটি শিক্ষাগত সংকট নয়—এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।
আমি মনে করি, এই সংকটের সমাধান সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রথমত, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে—শুধু কথায় নয়, কাজে। দ্বিতীয়ত, ছাত্রসংগঠনগুলোকে সহিংসতার রাজনীতি থেকে সরে এসে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতিনির্ভর রাজনীতিতে ফিরতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেই একটি নৈতিক জাগরণ ঘটাতে হবে—যেখানে তারা বুঝবে, কারো হাতিয়ার হয়ে নয়, নিজের ভবিষ্যতের জন্যই তাদের দাঁড়াতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই,যদি আমরা এখনই সাহস করে সত্যকে স্বীকার না করি, যদি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় না আনি, তবে এই আগুন শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি ছড়িয়ে পড়বে পুরো সমাজে।
সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেকোনো মূল্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর এজন্য সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে লেজুর ভিত্তিক রাজনীতির কালো ছায়া থেকে মুক্ত করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও সম্পাদক,আমার দিন,ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com