আজ শুক্রবার, ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৫শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ শুক্রবার, ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৫শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

ঐতিহাসিক নির্বাচন: কথা রাখলেন ডক্টর ইউনূস

দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস, গুঞ্জন, ষড়যন্ত্র ও শঙ্কার আবহ পেরিয়ে অবশেষে আমরা দেখলাম একটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ, রক্তপাতহীন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
এই নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার ঘোষণা করেছিলেন—এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সমালোচকরা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, কেউ কেউ উপহাসও করেছিলেন। কিন্তু দিনশেষে বাস্তবতা বলছে—ডক্টর ইউনূস তাঁর কথার মর্যাদা রক্ষা করেছেন।

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে এ বিষয়ে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই। এজন্য একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং বিশ্লেষক হিসেবে আমি ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে মোবারকবাদ জানাতে চাই।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নানা মহল থেকে শঙ্কার সুর শোনা গিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিদেশভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেলে অস্থিতিশীলতার পূর্বাভাস, সহিংসতার আশঙ্কা, এমনকি সেনাশাসন ফিরে আসার মতো অতিরঞ্জিত বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু ভোটের দিন সেই আশঙ্কার অনেকটাই ভেস্তে গেছে। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ২টা পর্যন্ত গড়ে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়ে। দিনশেষে বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই ভোটগ্রহণ শেষ হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, অভিযোগ ও দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর খবর থাকলেও সার্বিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ছিল নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল।

এখানেই ড. ইউনূসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষাটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুরু থেকেই একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়েছেন পরিষ্কার বার্তা—দায়িত্ব হবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রভাব বিস্তার নয়।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সশস্ত্র বাহিনীর। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন নজরদারি, মোবাইল টহল, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল—সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হয়।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—এই বিশাল উপস্থিতি আতঙ্ক নয়, বরং জনমনে আস্থা সৃষ্টি করেছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে হস্তক্ষেপ না করে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে, সংযত আচরণে দায়িত্ব পালন করে সশস্ত্র বাহিনী প্রমাণ করেছে যে তারা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান—কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হাতিয়ার নয়।

গত এক দশকে নানা রাজনৈতিক বিতর্কে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে এবারের নির্বাচন তাদের জন্যও ছিল ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ। বলা যায়, তারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ অবস্থান ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে সাহস জুগিয়েছে—এ কথা বিভিন্ন মহলে স্বীকৃত।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী আজ যে পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে, তা জাতি দীর্ঘদিন মনে রাখবে। ড. ইউনূস তাদের ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তারা সেই আস্থার মর্যাদা দিয়েছে।

তবে এখানে একথাও স্বীকার করতে হবে যে নির্বাচন শুধু সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্ট গার্ড এবং বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগও ছিল প্রশংসনীয়।

বিচ্ছিন্ন ককটেল বিস্ফোরণ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা বা এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে—কারও অসুস্থতাজনিত কারণে, কোথাও ধস্তাধস্তির অভিযোগ রয়েছে। এগুলো অবশ্যই দুঃখজনক এবং তদন্তসাপেক্ষ। তবে সার্বিক চিত্রে নির্বাচন সহিংসতার মহড়ায় পরিণত হয়নি—এটাই বড় কথা।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শতভাগ নিখুঁত নির্বাচনের উদাহরণ খুবই বিরল। গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে অনিয়ম মোকাবিলা করেছে। এ দিক থেকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ছিল।
কোথাও অনিয়মের অভিযোগে কর্মকর্তাদের অব্যাহতি, কোথাও জরিমানা—এসব পদক্ষেপ একটি বার্তা দিয়েছে যে নিয়ম ভাঙলে ছাড় নেই।

নির্বাচনের দিন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। তবে একই সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, সারাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হচ্ছে। জামায়াতও ভোটকেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা প্রতিরোধে জনগণের ভূমিকার কথা বলেছে।

এখানে একটি ইতিবাচক দিক হলো—প্রধান দলগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং ফলাফল ঘোষণার আগে কেন্দ্র না ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতরেই থাকার বার্তা দিয়েছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ।

তবে নির্বাচনোত্তর সময় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ড. ইউনূস যথার্থভাবেই আহ্বান জানিয়েছেন—চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পরও যেন গণতান্ত্রিক শালীনতা ও সহনশীলতা বজায় থাকে। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐক্য অপরিহার্য।

অন্যদিকে দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। ছয় লাখ ৪৮ হাজার পোস্টাল ব্যালট জমা পড়েছে বলে জানানো হয়েছে। এটি নির্বাচনী ব্যবস্থার আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি নীতিগত প্রশ্নে মত দিয়েছে—এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার লক্ষণ। নির্বাচনে কেবল প্রতিনিধি বাছাই নয় বরং এটি রাষ্ট্রের নীতিগত দিকনির্দেশনায়ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই নির্বাচন ছিল তাঁর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা। তিনি শুরু থেকেই একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন—সরকার নিরপেক্ষ থাকবে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদার আচরণ করবে।

নির্বাচন শেষে তাঁর বক্তব্যে তিনি যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন—নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও ভোটারদের প্রতি—তা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের পরিচয় দেয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—“জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।”
এ কথাটি কেবল সাংবিধানিক বাক্য নয় বরং এটি গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকাশ।

এই নির্বাচন যদি সত্যিই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে সেটিই হবে তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা, জাল ভোট বা কেন্দ্র দখলের অভিযোগ—এসব নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। যদি কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকে, সেটি চিহ্নিত ও সংশোধন করতে হবে।

শেষ কথা:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শতভাগ গ্রহণযোগ্য ছিল কি না—তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটুকু বলা যায়, ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাকে অতিক্রম করে দেশ একটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।
ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস শুরু থেকেই বলেছিলেন—এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল নির্বাচন। অন্তত নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও সার্বিক পরিবেশের দিক থেকে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতির বড় অংশ পূরণ করেছেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে—সরকার যদি নিরপেক্ষ থাকে, নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি পেশাদার আচরণ করে, তবে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অসম্ভব নয়।
বাংলাদেশ আজ আবারও প্রমাণ করেছে—জনগণই ক্ষমতার উৎস। আর সেই সত্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ডক্টর ইউনূস তাঁর কথার মর্যাদা রেখেছেন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,
ঢাকা।
ই-মেইল ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin