নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয় বরং এটি একটি জাতির মনস্তত্ত্ব, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ কল্পনার পুনর্গঠন বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ এমন এক সময় ২০২৬ সালে পা রাখছে যখন পেছনে ফেলে আসা বছরগুলো ছিল সংকট, অস্থিরতা ও আত্মজিজ্ঞাসায় ভরা। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ—তিন ক্ষেত্রেই চাপের মুখে ছিল দেশ। আমরা জানি যে সংকট প্রায়শই সম্ভাবনার জন্ম দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রস্তুত?
গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সহিংসতা, রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর—এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিরাপদ করে তুলেছে। রাজনীতির এই অস্থিরতা অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলেছে; বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এসব বাস্তবতা ২০২৬–কে স্বাগত জানাতে গিয়ে আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন হাজির করে: আমরা কি পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করব, নাকি নতুন পথে হাঁটব?
তবে এই সংকটের মধ্যেই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত লক্ষণীয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে একটি শক্তিশালী দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। আর তা হলো দায়িত্বশীল রাজনীতি ও কার্যকর সুশাসন। নাগরিকরা এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না; তারা চান দৃশ্যমান ফলাফল।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, আইনের শাসন, জবাবদিহি—এই বিষয়গুলো ২০২৬–এর আলোচনায় কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠছে। এটি খুবই ইতিবাচক লক্ষণ বলে আমি মনে করি। কারণ সচেতন নাগরিক সমাজ ছাড়া কোনো গণতন্ত্রই টেকসই হতে পারে না।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে রপ্তানি খাত, প্রবাসী আয় ও অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালে নতুন যাত্রার অর্থ হবে—অর্থনীতিকে কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যায় নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে মূল্যায়ন করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা—এসবই হবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
রাজনীতির ক্ষেত্রে ২০২৬ একটি পরীক্ষার বছরও হতে পারে। বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সংলাপ ও সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হবে সময়ের দাবি। কেননা দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না বরং রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ভিন্নমতকে শত্রুতা নয়, গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। এই পরিবর্তন ঘটাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ প্রজন্মই ২০২৬–এর সবচেয়ে বড় শক্তি বলে আমি মনে করি। প্রযুক্তি-সচেতন, বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত এই প্রজন্ম কেবল চাকরি চায় না; তারা চায় মর্যাদা, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে এই তরুণরাই বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ—এসব ক্ষেত্র ২০২৬–এ নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
সামাজিক দিক থেকেও নতুন যাত্রার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজের ভেতরে যে ফাটল ধরিয়েছে, তা মেরামত করা জরুরি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন—যেখানে কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না—এই দর্শনই ২০২৬–এর সামাজিক এজেন্ডা হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ এখন আর প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়। শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা, আঞ্চলিক বাণিজ্যে সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান এখন যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৬–এ এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে অগ্রগতি আন্তর্জাতিক আস্থাকে আরও দৃঢ় করবে।
তবে এই সব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন বহু অংশে নির্ভর করছে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার ওপর। কারণ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে উন্নয়নের সুফল কোনদিনই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তাই ২০২৬–এর নতুন যাত্রা মানে কেবল নতুন প্রকল্প নয়; এটি একটি নৈতিক রূপান্তরের আহ্বান।
শেষ কথা:
আমি মনে করি ২০২৬ আমাদের সামনে একটি সুযোগ। সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে হাঁটার এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তবে এজন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নাগরিক সচেতনতা ও সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ। যদি আমরা বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তায় পৌঁছাতে পারি, তবে ২০২৬ সত্যিই বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন যাত্রার সূচনা হতে পারে। যেখানে আশা থাকবে বাস্তবসম্মত, আর ভবিষ্যৎ হবে আরও স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। সুতরাং মুছে যাক যাক সকল অন্ধকার। সংকট পেরিয়ে এগিয়ে যাক আমাদের সকলের প্রিয় বাংলাদেশ। স্বাগত ২০২৬।
লেখক:সাংবাদিক-কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com