বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে “সুশাসন” শব্দটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, কিন্তু সবচেয়ে কম বাস্তবায়িত একটি শব্দ। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই সুশাসন, জবাবদিহি, আইনের শাসন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর পর সেই প্রতিশ্রুতির জায়গা দখল করে নেয় পদ বণ্টন, দলীয় আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতি। ফলে সরকার পাল্টায়, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টায় না।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদকে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিষয়টি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং সুশাসনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা লিখেছিলেন,”The quality of government matters more than the form of government.”অর্থাৎ সরকার কোন দলের, সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সরকার কতটা দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখনও সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারিনি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল দেশের বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এখানে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির ভূমিকা কেবল আনুষ্ঠানিক নয়; কার্যকর তদারকি, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কাকে আনা হচ্ছে—এটি তাই জনস্বার্থের প্রশ্ন।
যখন এমন একজন ব্যক্তিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে প্রকাশ্যে জানা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই দায়িত্ব কার্যকরভাবে কীভাবে পালন করা হবে? এটি কোনো ব্যক্তির অসুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণে কার্যকর সক্ষমতা বিবেচিত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রে কি সত্যিই যোগ্য, কর্মক্ষম ও সময় দিতে সক্ষম মানুষের এতই অভাব যে একই ব্যক্তির ওপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসেরই অংশ। রাষ্ট্রের কাঠামোগত এই সংকট বজায় রেখে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা কতটুকু প্রাসঙ্গিক সেটিই একটি বড় প্রশ্ন।
ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটি চেনা দৃশ্য দেখি। স্কুল পরিচালনা কমিটি, কলেজ গভর্নিং বডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, মসজিদ পরিচালনা কমিটি, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, বাজার কমিটি, সমবায় সমিতি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যতা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই হয়ে ওঠে প্রধান যোগ্যতা।
ফলে এমন বাস্তবতাও দেখা যায় যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তি আসেন, যিনি সেই প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে আগে কখনও সক্রিয় ছিলেন না। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে এমন ব্যক্তিও স্থান পান, যাঁর শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে বাস্তব কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এতে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রকে আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিয়ম; ব্যক্তিগত আনুগত্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা প্রায়ই আমরা তার উল্টো চিত্র দেখি।
আজ রাজনীতির একটি বড় সংকট হলো—পদকে দায়িত্ব হিসেবে নয়, অর্জন হিসেবে দেখা। ফলে পদ বণ্টন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পুরস্কারের অংশ। এই সংস্কৃতি যতদিন চলবে, ততদিন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে না; ব্যক্তি শক্তিশালী হবে।
এখানে আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই।
প্রয়াত সিএসপি কর্মকর্তা শাহ আব্দুল হান্নান সাহেবের সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি ছিলেন এনবিআরের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। জীবনের কঠিন সময়ে তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে যেতাম। তাঁর মধ্যে যে সততা, নৈতিকতা, পেশাদারিত্ব এবং আল্লাহভীতি দেখেছি, তা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তিনি এমন একজন কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি রাষ্ট্রের স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতেন। দীর্ঘ সরকারি চাকরি জীবনের পরও তিনি ব্যক্তিগত বিলাসিতার পেছনে ছুটেননি। তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি—রাষ্ট্রসেবা মানে ক্ষমতা ভোগ নয়; এটি একটি আমানত।
আমার স্মৃতিতে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্ক ও আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কী বিবেচনা কাজ করেছিল, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে একজন সৎ, নীতিবান ও পেশাদার কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আমি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবেই দেখি।
আমি বহুবার লিখেছি—যেখানে ভালো কাজ হবে, সেখানে প্রশংসা করব; যেখানে ভুল হবে, সেখানে সমালোচনা করব। সত্যকে সত্য এবং ভুলকে ভুল বলাই একজন লেখকের নৈতিক দায়িত্ব।
আজ বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারের জন্য এই শিক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে ইতিহাসের আরেকটি নির্মম অথচ দিকনির্দেশনামূলক সত্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুবিচারমূলক।
একবার ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার চাকরি সংক্রান্ত একটি ফাইল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে উপস্থাপিত হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও কেবল সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেননি। সেই ফাইলে শহীদ রাষ্ট্রপতি স্বহস্তে লিখেছিলেন—’Please wait till he comes back.’ (তিনি ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন)।
অর্থাৎ, শহীদ জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন মেধা, সততা ও সুসংহত নৈতিকতার আলোকে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা অন্ধ দলীয় সংকীর্ণতাকে তিনি কখনোই দেশের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করার পথে বাধা হতে দেননি। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রচিন্তা করার এই মহান গুণ এবং মানবিক মেধার মূল্যায়নের কারণেই তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধায় অবস্থান করছেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুশাসন নিশ্চিত করতে শহীদ জিয়ার এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সুবিচারের চর্চা এক অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
শহীদ জিয়ার সেই রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মিস্টার তারেক রহমানও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। তাই এই সার্বিক প্রশাসনিক ও সামাজিক সংকটের কথা বলতে গিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা রাখতে চাই এবং এই বিতর্কের বাইরে রাখতে চাই। তিনি শুরু থেকেই এই পুরনো অচল ও জরাজীর্ণ সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন; নিজেই সেই পরিবর্তনের কাণ্ডারী হয়ে রাতদিন নিরলস পরিশ্রম করছেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের প্রশাসন, একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সুবিধাভোগী চক্র সেই পুরনো ভোগবাদী মানসিকতা, তোষামোদি আর দোষারোপের রাজনীতি থেকে কোনোভাবেই বেরোতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন ও পরিবর্তনের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা মাঠপর্যায়ে গিয়ে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই চরম সত্যটি সম্প্রতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যেই। সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, গত চার-পাঁচ মাসে বাস্তবে কিছুই বদলায়নি; দুর্নীতিবাজরা আগের মতোই ঘুষ খেয়ে যাচ্ছে এবং সরকারের অনেক ভালো ভালো উদ্যোগকে আটকে দেওয়া হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই প্রচ্ছন্ন আক্ষেপের পরদিনই যেন তার কথার সরাসরি প্রতিধ্বনি শোনা গেল প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকেও। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তারও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, দুর্নীতির চিত্র আগের তুলনায় একটুও কমেনি। যখন খোদ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং মুখ্য সচিবের মুখে এমন নিরুপায় স্বীকারোক্তি উঠে আসে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যকে কীভাবে আড়ালে থেকে একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নস্যাৎ করে দিচ্ছে।
প্রশাসনিক এই স্থবিরতার পাশাপাশি আরেকটি নির্মম বাস্তবতা উল্লেখ না করলেই নয়—তা হলো আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চিত্র। পুলিশে যে অপেশাদারিত্ব, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও লবিং চলছে, তা গোটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক।
যে পুলিশের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, দুঃখজনকভাবে তাদের নিজেদের ভেতরেই এখন চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। অতীত ফ্যাসিবাদের আমলের মতোই পুলিশের ভেতরে একটি সুবিধাভোগী রাজনৈতিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, যারা আইন ও নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করছে না। এরা সৎ, মেধাসম্পন্ন, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের নানা রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।
এমনকি যেসব কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে সরাসরি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে কর্মজীবনে অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে চাকরি করছেন, তাদেরকেও সুকৌশলে “জামায়াত” ট্যাগ দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
কেন এই ট্যাগিং? কারণ তারা ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক, নিয়মিত নামাজ পড়েন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাত দাড়ি রাখেন, সততার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন এবং ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত থেকে দুর্নীতিবাজদের কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করেন! নীতি ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করাই যেন এখন তাদের একমাত্র অপরাধে পরিণত হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা জরুরি বলে মনে করছি। নামাজ পড়া, সুন্নাত দাড়ি রাখা বা সৎ পথে চলা কি নির্দিষ্ট কোনো দলের পৈতৃক সম্পত্তি কিংবা একমাত্র রাজনৈতিক নিদর্শন? নাকি এটি যেকোনো খাঁটি মুসলিম ও আল্লাহপ্রেমিক মানুষের ঈমানী ও প্রধান নৈতিক কর্তব্য?
এই দুর্নীতিবাজ ও কর্তৃত্বপরায়ণ চক্রের হীন কর্মকাণ্ডের কারণেই আজ সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান—আপনি অবিলম্বে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ এই অস্থিতিশীলতা ও অপেশাদারিত্ব দূর করতে কঠোর সংস্কারে হাত দিন। পুলিশ বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে না পারলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়নের কোনো সম্ভাবনা নেই। আর আমাদের মনে রাখা দরকার, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নতুন বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা সরাসরি এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভরশীল।
যদি দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সততা, দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতাকে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি করা যায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি কার্যকর হবে।
স্যামুয়েল পি.হান্টিংটন বলেছিলেন, “The most important political distinction among countries concerns not their form of government but their degree of government.”অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর, তার ওপর।
সিঙ্গাপুরের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। লি কুয়ান ইউ প্রশাসনে মেধা ও সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে ছোট একটি দেশ বিশ্বমানের প্রশাসনিক দক্ষতার উদাহরণে পরিণত হয়।
জাপানে বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সাধারণত দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের NHS -এর মতো বিশাল স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সক্ষমতা একটি মৌলিক শর্ত।
বাংলাদেশে আমরা কি সেই শিক্ষা নিচ্ছি? নাকি এখনও রাজনৈতিক আনুগত্যকেই সর্বোচ্চ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করছি?
আজ পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা প্রশাসন, স্বাস্থ্য খাত, স্থানীয় সরকার—সবখানেই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে। সৎ, পেশাদার ও নীতিবান কর্মকর্তারা কি যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন, নাকি বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় লেবেল ও পক্ষপাতের শিকার হচ্ছেন?
রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ একটি দুর্বল প্রশাসন কখনো শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে পারে না। দুর্বল আইনশৃঙ্খলা বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানবসম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দুর্বল শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পিছিয়ে দেয়।
সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুশাসন। সুশাসন মানে কেবল দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য নয়। সুশাসন মানে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানো। সুশাসন মানে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সুশাসন মানে রাষ্ট্রকে ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
আজ যদি আমরা সেই রাজনৈতিক সাহস দেখাতে না পারি, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যানও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংকট নয়; নেতৃত্বের মানের সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সংকট এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার সংকট।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি কেবল কমিটির সভাপতি পরিবর্তন হয়, কিন্তু নিয়োগের দর্শন পরিবর্তন না হয়, তাহলে পরিবর্তনের দাবি কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে হাসপাতালের নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বোঝার সক্ষমতা দিয়ে; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে শিক্ষাবোধ দিয়ে; ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের আস্থা দিয়ে; আর রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদ নির্ধারিত হবে সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে।
এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে মুখে যতই সুশাসনের কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটবে না।
পদ দখলের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে এবং জনগণের আস্থা ধ্বংস করে। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কোন পথ বেছে নেব তার ওপর—দলীয় আনুগত্যের পথ, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের পথ।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রথম পথ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করে; দ্বিতীয় পথ রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করে। সুতরাং আমরা কোন পথ বেছে নেব, আর এক মুহূর্ত দেরি না করে এই সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল:ahabibhme@gmail.com