আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ইরানের অসমমিত যুদ্ধ কৌশল 

ইরান কেন অসমমিত যুদ্ধ কৌশল (Asymmetric Warfare) ব্যবহার করে—বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বুঝতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের সংঘাতে দেখা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ, Patriot Missile System এবং THAAD Missile Defense System—প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। অন্যদিকে ইরানের তৈরি Shahed Drone-এর দাম মাত্র প্রায় ২০,০০০–৩৫,০০০ ডলার। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে খুব কম খরচে ইরান এমন অস্ত্র ব্যবহার করছে, যা প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি ব্যয় করতে বাধ্য করছে।
এই কৌশলের ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিপুল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে পারে। যদি যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি দীর্ঘ হয়, তাহলে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য সরাসরি সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমান হওয়া নয়; বরং কম খরচে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা। তাই ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখে, যাতে সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিখুঁত হামলা ও গোয়েন্দা তৎপরতা মাঝে মাঝে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
এই কারণেই ইরানের কৌশলকে অনেক বিশেষজ্ঞ “Survival and Leverage Strategy” বলে উল্লেখ করেন—অর্থাৎ টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক বিজয়ের চেয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল “Shadow War” বা ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।
ইরান এই অসমমিত যুদ্ধ কৌশল গড়ে তোলে Iranian Revolution-এর পর, যখন Mohammad Reza Pahlavi-এর শাসনের পতন ঘটে। এরপর থেকে তারা উন্নত যুদ্ধবিমান বা বিশাল নৌবহরের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার অপারেশন এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে একটি “forward deterrence” কৌশল তৈরি করেছে।
ইরানের অসমমিত যুদ্ধ কৌশলের আরেকটি মূল ভিত্তি হলো বিভিন্ন মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননের Hezbollah, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী, সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র দল, গাজার Hamas ও Palestinian Islamic Jihad, এবং ইয়েমেনের Houthi Movement। এই গোষ্ঠীগুলো ইরানের কাছ থেকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও আদর্শিক সহায়তা পায়। ফলে ইরান সরাসরি যুদ্ধ না করেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখতে পারে এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
এদিকে যুদ্ধের ১২তম দিনে, ইরানের Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) হুমকি দেয় যে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংকগুলোতে হামলা চালাতে পারে। ইরানের দাবি, এর আগে একটি ইরানি ব্যাংকের ওপর হামলা হয়েছে। এর পর থেকেই কাতারে থাকা বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংক—যেমন Citibank এবং HSBC—কিছু শাখার কার্যক্রম বন্ধ করতে শুরু করেছে। এতে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো—যেমন Google, Microsoft, Palantir Technologies, IBM, Nvidia এবং Oracle Corporation—এর বিভিন্ন অফিস ও ক্লাউড অবকাঠামো ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর এবং কিছু উপসাগরীয় দেশে অবস্থিত। ইরান এসব স্থাপনাকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে হুমকি দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সহযোগীদের জন্য বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির ও তোলপাড় করার ব্যবস্থাও করেছে ইরান।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, অসমমিত যুদ্ধ ইরানের জন্য কেবল সামরিক কৌশল নয়; এটি একটি বাস্তববাদী পদ্ধতি, যার মাধ্যমে তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়। তারা বিশ্বাস করে যে তারা একটি ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যের জন্য (Righteous Cause) লড়াই করছে। আজ ১৭ দিন যুদ্ধের পর যা অনুধাবন করা যাচ্ছে, ইরান সহজে যুদ্ধবিরতির দিকে যাবে না। আমেরিকার বর্তমান অবস্থা এমন হয়েছে যে—“ছেড়ে দে মা কেটে পড়ি।” কখনোই গ্রাউন্ড ফোর্স ব্যবহার করার সাহস হবে না। রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলো এখন শুধু অঙ্ক করা শুরু করেছে—তারা কি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সেবাদাস হয়ে থাকবে, নাকি স্বাধীনভাবে নিজেদের স্বাধীনতা ভোগ করবে। এই পর্যন্ত ১৭ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।-লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক,ঢাকা।

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin