গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়“জঙ্গি” শব্দটি কখনোই নিছক একটি নিরাপত্তা-সংকেত হয়ে থাকেনি; বরং সময়ের পরিক্রমায় এটি পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক এক রাজনৈতিক বয়ানে—যেখানে নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ, আন্তর্জাতিক বার্তা বিনিময় এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল একসূত্রে গাঁথা। ইতিহাস বলে, এই শব্দটি যখনই সামনে আসে, তখন তার পেছনে থাকে দৃশ্যমান ঘটনার চেয়েও অদৃশ্য বাস্তবতার দীর্ঘ ছায়া।
এমন এক প্রেক্ষাপটে, সদ্য নির্বাচিত একটি সরকারের বয়স যখন মাত্র দুই মাস, তখন হঠাৎ করে জঙ্গি ইস্যুতে উচ্চমাত্রার সতর্কতা—এটি কি কেবল নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও জটিল কোনো রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ? এই প্রশ্ন আজ শুধু বিশ্লেষকদের নয়, সাধারণ মানুষের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার, বিমানবন্দরগুলোতে বাড়তি সতর্কতা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র যেন হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছে। অথচ একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছেন—দেশে বর্তমানে কোনো সক্রিয় জঙ্গি তৎপরতা নেই।
সরকারের এই দ্বৈত ভূমিকা কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং তা রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যদি বাস্তবিক অর্থে জঙ্গি তৎপরতা না থাকে, তবে এত উচ্চমাত্রার সতর্কতা কেন? আর যদি হুমকি বাস্তব হয়, তবে সেটি অস্বীকারের কারণ কী? এই অসামঞ্জস্যতা জনমনে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতার বীজ বপন করে—যা যে কোনো নিরাপত্তা সংকটের চেয়েও বিপজ্জনক বলে আমি মনে করি।
এ ধরনের দ্বৈত ভূমিকা একদিকে যেমন জন আস্থা বিনষ্ট করে অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
২০০৫ সালের ৬৪ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, রমনা বটমূলে বোমা হামলা—এসব ঘটনা সাধারণভাবে জঙ্গিবাদী তৎপরতা বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এটি জঙ্গিবাদের মোড়কে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের একটি জটিল খেলা ছিল। যার নাটাই ছিল দেশের বাইরে।
বহুল আলোচিত এক-এগারোর সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই এর বড় প্রমাণ।
সুতরাং জঙ্গিবাদ কেবল নিরাপত্তা ব্যর্থতার ফল নয়; এটি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কখনো কখনো পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতার ফসল।
এই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমি প্রশ্ন তুলতে চাই—এই নতুন করে “জঙ্গি সতর্কতা” কি কোনো বাস্তব হুমকির প্রতিফলন, নাকি এটি একটি নির্মিত বাস্তবতা, যার উদ্দেশ্য ভিন্ন?
বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্টকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করার সুদূরপ্রসারী কোনো প্রকল্প?
এখানে একটি ভয়ংকর বাস্তবতা হচ্ছে—রাষ্ট্রের গোপনীয়তা ভাঙনের অস্বাভাবিক প্রবণতা। পুলিশ সদর দপ্তর কিংবা সেনাসদর দপ্তরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাপ্তরিক চিঠি, যা সীমিত পরিসরে থাকার কথা, তা কীভাবে দেশের গণমাধ্যমের আগেই বিদেশে অবস্থানরত কিছু কথিত সাংবাদিক বা ইউটিউবারদের হাতে পৌঁছে যায়?
এটি নিছক তথ্য ফাঁস নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাঠামোর ভেতরে ফাটলের স্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের ভেতরেই কি এমন একটি গোষ্ঠী সক্রিয়, যারা প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখালেও আড়ালে ভিন্ন কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে?
এই সন্দেহ আরও জোরালো হয় সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোতে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা, বিশেষ করে পেশাদার ও সৎ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও যদি এমন সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হয়, তাহলে তা কেবল ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানের মনোবলকেও আঘাত করে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল অস্ত্র বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সততা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিক শক্তির ওপর। কিন্তু যখন তোষামোদ ও অনুগত রাজনীতি দক্ষতা ও সততার ওপর প্রাধান্য পায়, তখন নিরাপত্তা কাঠামো ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা-এর দীর্ঘ শাসনামলের নীতিগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে। তার আমলে কথিত জঙ্গিবিরোধী অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রশংসিত হলেও সমালোচকদের অভিযোগ ছিল—একই সঙ্গে “জঙ্গিবাদ” শব্দটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এই দ্বৈত ব্যবহার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে—যেখানে প্রকৃত হুমকি ও রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের বক্তব্য—জঙ্গিবাদকে অতীতে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ—এই বিতর্ককেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারত-এর ভূমিকাও আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতা ও নির্ভরতার এক জটিল মিশ্রণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সম্পর্ক কতটা সমতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল?
সমালোচকদের মতে, শেখ হাসিনা আমলে এই সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছিল। ফলে আজ যখন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তখন সেই পুরনো প্রভাব বলয় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, হাসিনা রেজিম পতনের বছরখানেক আগে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘ভারতকে আমি যা দিয়েছি, এটা তারা কখনো ভুলতে পারবেনা।’ অন্যদিকে হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক হল,স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক।’
ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক বরাবরই জটিল এবং ইতিহাস-নির্ভর। একদিকে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা, অন্যদিকে আস্থার ঘাটতি, সীমান্ত ইস্যু, পানি বণ্টন—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি স্পর্শকাতর।
সুতরাং বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের উষ্ণতা কখনোই আওয়ামী লীগের পর্যায়ে হওয়া সম্ভব নয়। কারণ বিএনপি তথা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার যে ভারত নীতি সেটা তারেক রহমানের পক্ষে রাতারাতি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ভারত তা ভালো করেই জানে।
ফলে ভারত দৃশ্যত বিএনপি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কের ভান করলেও তারা কখনোই বিএনপি সরকারকে পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে দেবে না। এই কারণে বর্তমান বিশ্বের তুরুপের তাস ‘জঙ্গি কার্ড’ ভারত নিয়মিতই খেলবে। এ ব্যাপারে বিএনপি সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। ছোট্ট কোনো ভুলে যদি পা পিছলে যায় তাহলে সরকারের জন্য তা বড় ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।
বর্তমান সরকার একদিকে “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করছে, অন্যদিকে জঙ্গি সতর্কতা জারি করছে—এই দ্বৈত বাস্তবতা সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারই স্পষ্ট বহি:প্রকাশ। এখানে ষড়যন্ত্রকারীরা অর্থাৎ জঙ্গি কার্ডের নাটাই যাদের হাতে, তারা প্রাথমিক বিজয়ের আনন্দ করতেই পারে। কারণ নতুন সরকারকে তারা সম্পূর্ণ সফলভাবে বিভ্রান্ত করতে পেরেছেন।
সমালোচকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে—অর্থনৈতিক করিডর, সমুদ্রপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছুর জন্যই এটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঢাকার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে বাইরের আগ্রহ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
আমাদের গণমাধ্যমের কথা আর কি বলবো। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। যাচাইবিহীন তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা এবং আতঙ্ক সৃষ্টির প্রবণতা—সব মিলিয়ে একটি অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই শুভ নয়।
বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন ঠান্ডা মাথার বিশ্লেষণ, শক্তিশালী গোয়েন্দা সমন্বয় এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। কারণ, জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আতঙ্ক যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় সংকট—যা কোনো বাহ্যিক শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর।
পরিশেষে বলা যায়, জঙ্গি ইস্যুটি আজ কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি আস্থা, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি তার প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরের দুর্বলতা দূর করতে না পারে, যদি পেশাদারিত্বের জায়গায় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া অব্যাহত থাকে, তবে কোনো বাহ্যিক ষড়যন্ত্রের প্রয়োজন হবে না—রাষ্ট্র নিজেই নিজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যাখ্যা, সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সততা। কারণ, জঙ্গি আতঙ্কের চেয়েও বড় সংকট হলো—যখন একটি রাষ্ট্র নিজেই তার জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করে। সুতরাং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হতে হবে।
লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com