বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—এখানে দুর্নীতি অনেক সময় বেআইনি নয়, বরং “নীতিমালাসম্মত”। জনগণের অর্থ লুণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়—এসবের বড় অংশই ঘটে প্রশাসনিক বৈধতার ছায়াতলে। ফলে জনগণ শুধু লুটের শিকারই হয় না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকেই নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার গুপি রায়ের হাটের ইজারা বিতর্ক সেই বাস্তবতারই এক নগ্ন উদাহরণ।
এই হাটটি নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে—কেন গত বছর প্রায় পৌনে চার কোটি টাকায় ইজারা হওয়া হাট এবার নেমে এলো মাত্র সোয়া এক কোটিতে?
মানবজমিন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ দেখার পর আমি সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহানা মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিগত তিন বছরের গড় ইজারামূল্যের সঙ্গে ছয় শতাংশ বৃদ্ধি করে নতুন বছরের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সেই সূত্র ধরেই ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে হাটটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার ৭৪২ টাকা। আর সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ১ কোটি ২৫ লাখ ৫৭ হাজার ৭০০ টাকায় ইজারা পেয়েছেন ডিবি হারুনের ক্যাশিয়ার খ্যাত চেয়ারম্যান মোকাররম সর্দার।
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্রের এই নীতিমালা আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? কারণ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৪৩০ বঙ্গাব্দে সরকারি মূল্য ছিল ১৮ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইজারা হয় ২১ লাখ ৬২ হাজার টাকায়। ১৪৩১ সালে সরকারি মূল্য নির্ধারণ হয় ২৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৫ টাকা, আর ইজারা হয় ৩২ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ বাজারটি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ দর উঠেছে মাত্র ৩২ লাখ টাকার কিছু বেশি।
কিন্তু হঠাৎ করেই ১৪৩২ বঙ্গাব্দে সরকারি মূল্য মাত্র ২৫ লাখ ৩৪ হাজার ৮১৩ টাকা থাকলেও সর্বোচ্চ দর উঠে যায় ৩ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকায়। ভ্যাট ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে যা দাঁড়ায় প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি বাস্তব বাজারমূল্য সত্যিই এত বেশি হয়ে থাকে, তাহলে এক বছরের ব্যবধানে সেটি আবার কীভাবে সোয়া এক কোটিতে নেমে আসে? আর যদি সোয়া এক কোটিই “বাস্তব” হয়ে থাকে, তাহলে গত বছর তিন কোটির বেশি দর উঠলো কীভাবে?
এই দুই অবস্থার যেকোনো একটি অবশ্যই অস্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, গত বছর কি কোনো একটি ভয়াবহ সিন্ডিকেট প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাজারকে অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে তুলেছিল, অথবা এবার প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধার্থে বাজারমূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে নিচে নামানো হয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত, উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই পুরো ব্যবস্থাটি “নীতিমালাসম্মত”।
অর্থাৎ এমন একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বাস্তব বাজার সম্ভাবনা নয়, বরং পূর্ববর্তী গড় হিসাবকে ভিত্তি ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে একটি হাটের প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনসমাগম, বেচাকেনার পরিমাণ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা—এসব কোনো কিছুই কার্যকরভাবে বিবেচনায় আসে না। এতে করে স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী, প্রশাসনিক প্রভাবশালী চক্র এবং সিন্ডিকেট সহজেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ কম মূল্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
এটাই বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্নীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম রূপ। এখানে কেউ সরাসরি টাকা চুরি করছে না; বরং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার দুর্বলতাকে ব্যবহার করে জনগণের সম্পদ ব্যক্তিগত প্রভাবের অর্থনীতিতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
গুপি রায়ের হাটের ঘটনাটি তাই কেবল একটি পশুর হাটের ইজারা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতিমালার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। একজন সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, একজন এমপি স্থানীয় হাট-বাজারের ইজারা থেকে শুরু করে জলমহাল, টেন্ডার, স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটি, এমনকি কোন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি কে হবে—সেটিও নির্ধারণ করেন।
অর্থাৎ আইন প্রণেতা হয়ে ওঠেন স্থানীয় অর্থনীতির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। এটি শুধু গণতন্ত্রবিরোধী নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দর্শনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
কারণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো ঠিক উল্টো।
এখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় রাজনৈতিক বলয়ের হাতে। উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা—সবকিছু কার্যত স্থানীয় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে জনপ্রতিনিধির চেয়ে “ক্ষমতাবান ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি” হয়ে ওঠে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় সৎ প্রতিযোগিতা টিকে থাকতে পারে না। টেন্ডার হয় নিয়ন্ত্রিত, ইজারা হয় পূর্বনির্ধারিত, আর প্রশাসন অনেক সময় নীতিমালার আড়ালে দাঁড়িয়ে দায় এড়িয়ে যায়।
ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার বদলে একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়।
এ কারণেই আজ বাংলাদেশের বহু মানুষ মনে করেন—এ দেশে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার জরুরি। কারণ ব্যক্তি বদলালেও যদি ব্যবস্থাটি একই থাকে, তাহলে লুটপাটের চরিত্র বদলায় না। শুধু সুবিধাভোগীর নাম বদলায়।
আজ যে গোষ্ঠী ক্ষমতায়, সুবিধা তারাই ভোগ করছে। কাল অন্য কেউ এলে একই কাঠামো ব্যবহার করে তারাও একই কাজ করবে। কারণ সমস্যার মূল ব্যক্তি নয়, সমস্যার মূল হলো এমন একটি কাঠামো—যেখানে জবাবদিহিতা দুর্বল, প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, আর স্থানীয় সরকার প্রকৃত অর্থে পরাধীন।
বাংলাদেশে উন্নয়ন নিয়ে অসংখ্য সেমিনার হয়, পরিকল্পনা হয়, কৌশলপত্র তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—যে রাষ্ট্রে স্থানীয় পর্যায়ে একটি হাটের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ নিয়েও স্বচ্ছতা নেই, সেখানে টেকসই উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব?
জনগণের করের টাকা দিয়ে রাস্তা হবে, হাসপাতাল হবে, স্কুল হবে—এটাই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই টাকাই যদি রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের ভাষণ কেবল কাগজেই থাকে, সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না ।
গুপি রায়ের হাটের ঘটনাটি তাই বাংলাদেশের জন্য একটি নির্মম উদাহরণ। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা যদি জনস্বার্থের বদলে সিন্ডিকেটের সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে উন্নয়ন কখনোই জনগণের কাছে পৌঁছাবে না। বরং রাতারাতি কিছু মানুষের আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে, আর সাধারণ মানুষ বঞ্চিতই থেকে যাবে।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই আমি প্রশ্ন করতে চাই, কেন স্থানীয় সরকার এখনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়?
কেন একজন এমপি স্থানীয় প্রশাসনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন?
কেন রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়নে স্বাধীন অর্থনৈতিক নিরীক্ষা নেই?
কেন জনগণের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় না? কেন একটি হাটের ইজারা নিয়ে এত বড় প্রশ্ন উঠলেও প্রশাসন কেবল “নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে” বলে দায় শেষ করতে চায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজলে বাংলাদেশে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব হবে না।
কারণ উন্নয়ন শুধু বড় বড় সেতু বা ভবন নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করা। উন্নয়ন হলো জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়া। উন্নয়ন হলো এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো, যেখানে ক্ষমতা নয়—নীতিই হবে সর্বোচ্চ শক্তি।
আর সেই রাষ্ট্র গড়তে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, স্থানীয় সরকার সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার আমূল পুনর্বিন্যাস। নতুবা গুপি রায়ের হাটের মতো ঘটনা বারবার ঘটবে, জনগণের সম্পদ বারবার লুণ্ঠিত হবে। সুতরাং জনস্বার্থ বিরোধী নীতিমালার সংস্কার অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com