আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পৃথিবীর একমাত্র মহামানব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও মৃত্যু দিবস।
ইতিহাসের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ও চরম ক্রান্তিলগ্নে বিশ্বমানবতা যখন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দিকভ্রান্তের মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল, ঠিক তখনই সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার চিরন্তন আলোর মশাল নিয়ে ধরাধামে আগমন ঘটেছিল আখেরি নবী, সাইয়েদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল পবিত্র মক্কা নগরীর বুকে মহানবী (সা.)-এর এই পবিত্র আগমন কেবল একজন সাধারণ মানব বা নবীর জন্মবৃত্তান্তের সরল ইতিহাস নয়; বরং এটি গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিশীলতায় এক সর্বশ্রেষ্ঠ, অলৌকিক ও অতুলনীয় রহমতের ফল্গুধারা। তৎকালীন আরব সমাজ যখন গোত্রীয় হানাহানি, সামাজিক চরম বৈষম্য, কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো পৈশাচিক বর্বরতা, সুদ, মদ্যপান, অনৈতিকতা ও অনাচারের নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তি দাওয়াত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুশাসনের রূপরেখা নিয়ে আসেনি। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মানব মর্যাদা, সাম্য, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, এতিম ও দরিদ্রের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক কালজয়ী ও পূর্ণাঙ্গ নৈতিক বিপ্লব।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই সার্বজনীন ও চিরন্তন আগমনকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও করুণা হিসেবে ঘোষণা করে বলেছেন, “ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল ‘আলামীন”—অর্থাৎ “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি” (সূরা আল-আনবিয়া, ২১:১০৭)। এই একক ঐশী বাণীই স্পষ্ট করে দেয় যে, তাঁর আবির্ভাব কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ভাষা, কাল কিংবা কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না; তিনি এসেছিলেন বিশ্বজগতের সার্বিক কল্যাণ ও মানবজাতির চিরন্তন মুক্তির দিশারী হিসেবে। একইভাবে সূরা আল-ইমরানের ১৬৪ নম্বর আয়াতে বিশ্বজাহানের মালিক ঘোষণা করেন, “লাকাদ মান্নাল্লাহু ‘আলাল মু’মিনীনা ইয্ বা’আছা ফীহিম রাসূলান”—যার মর্মার্থ হলো, আল্লাহ মুমিনদের ওপর পরম অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল পাঠিয়েছেন যিনি মানুষকে তিলাওয়াত, আত্মশুদ্ধি এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। সুতরাং, বিশ্বজুড়ে উদযাপিত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ (সা.) হলো সেই পরম আনন্দ, ঐশী কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত স্মারক।
তবে আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম সমাজের দৈনন্দিন নৈতিক বাস্তবতার দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে এক নির্মম ও বিভৎস বৈপরীত্য ফুটে ওঠে। একদিকে প্রতিবছর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হচ্ছে মিলাদুন্নবীর নানা আনুষ্ঠানিক আয়োজন, জশনে জুলুস, রঙ-বেরঙের আলোকসজ্জা ও ওয়াজ মাহফিল; অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর বাস্তব জীবনে আকিদা, আখলাক, সামাজিক আচার-ব্যবহার ও রাজনীতির ময়দানে নেমে এসেছে ইসলামী চেতনার চরম ও মারাত্মক অবক্ষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র ও নৈতিক দর্শনের সারমর্মকে দূরে ঠেলে দিয়ে আজ আমরা বাহ্যিক ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে এক ভয়ংকর ভন্ডামি, সততাহীনতা ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের অন্ধকার গহ্বরে পতিত হয়েছি। এই বেদনাদায়ক ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে কঠোর আত্মপর্যালোচনা, দ্বিচারিতার ব্যবচ্ছেদ এবং ইসলামী চেতনার এই ভয়াবহ অবক্ষয় মুছে ফেলার এক কঠোর তাগিদ নিয়ে।
‘মাওলিদ’ বা ‘মিলাদ’ শব্দের অভিধানগত অর্থ হলো জন্মকাল বা জন্মস্মরণ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে যে আনুষ্ঠানিক উদযাপনের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তার সূচনা ও বিকাশ ঘটেছে রাসুল (সা.)-এর ওফাতের কয়েক শতাব্দী পর। একাদশ-দ্বাদশ শতকে ফাতিমীয় মিসরে এবং পরবর্তীকালে ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে সুন্নি ঐতিহ্যে ইরবিলে বড় পরিসরে মাওলিদ উদযাপনের ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়। ফলে এটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি যে, মিলাদুন্নবীর আনুষ্ঠানিক পন্থায় উদযাপন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ—এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা মস্ত বড় ভুল। রাসুলের প্রতি ভালোবাসা ইসলামী ইমানের মূল চালিকাশক্তি, অন্যদিকে উদযাপনের রূপরেখা নিয়ে আলেমদের মধ্যে নানা ঐতিহাসিক মতভেদ বিদ্যমান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকের সমাজ এই উপলক্ষটিকে ঐক্যের শিক্ষা হিসেবে না নিয়ে অহেতুক বাহাস ও সামাজিক বিভাজনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। অথচ কুরআন রাসুলের চরিত্র সম্পর্কে চিরন্তন সনদ দিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছে, “ওয়া ইন্নাকা লা‘আলা খুলুকিন ‘আজীম”—অর্থ: “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী” (সূরা আল-কলম, ৬৮:৪)। আর মুমিনদের জন্য তাঁর সমগ্র সত্ত্বাকে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, “লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাহ”—অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)। অর্থাৎ, মিলাদুন্নবীর আসল শিক্ষা স্লোগান কিংবা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাসুলের মহান চরিত্র ও নৈতিকতাকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে হুবহু ধারণ করার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
ইসলামের পরম সৌন্দর্য হলো এর চিরন্তন সার্বজনীনতা। বিশ্বনবী (সা.) যে সুমহান জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন, তার মূল সুফল বা নীতিগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের দিকে তাকালে এক অদ্ভূত ও চরম লজ্জাস্কর বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজ পাশ্চাত্য ও আমেরিকার বহু অমুসলিম দেশে আমরা যেসব নাগরিক শিষ্টাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ দেখতে পাই—যেমন পারস্পরিক চুক্তির প্রতি শতভাগ সম্মান, কঠোর সময়নিষ্ঠা, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জবাবদিহি, জনসম্পদের সুরক্ষা, আইনের নিরপেক্ষ শাসন, ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ, ভোক্তার অধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি—সেগুলোর মূল উৎস কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহরই নৈতিক দর্শন। বিখ্যাত তাফসিরকারক ও চিন্তাবিদদের ভাষায় বলতে হয়, সেখানে হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম নেই, কিন্তু কুরআনিক অনেক নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে; অন্যদিকে আমাদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজগুলোতে বাহ্যিক ইসলামের প্রদর্শন প্রচুর হলেও তার পরম নৈতিক চেতনা ও সততা পুরোপুরি অনুপস্থিত।
এখানেই আমাদের চরম আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। আজ আমরা নিজেদের মুসলিম হিসেবে দাবি করছি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে চরম ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিচারিতায় ভুগছি। একজন মানুষ নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছেন, রোজা রাখছেন, সুন্নতি পোশাক-আশাক ও দাড়ি-টুপি ধারণ করছেন, কিন্তু একইসঙ্গে তিনি কর্মক্ষেত্রে অবলীলায় কোটি কোটি টাকার ঘুষ নিচ্ছেন, বাজারে পণ্যে ভেজাল দিচ্ছেন, ব্যবসায়ে ওজনে কম দিচ্ছেন, সহকর্মীর ক্ষতি করছেন কিংবা রাজনীতির স্বার্থে মিথ্যাচার ও গিবত করছেন। বাহ্যিক ধর্মীয় লেবাস ও ভেতরের পাপাচারের এই চরম বৈপরীত্যই আজকের ইসলামী চেতনার সবচেয়ে বড় সংকট।
আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই নৈতিক সংকটের মহোৎসব আরও স্পষ্ট ও বিভৎসরূপে ধরা দেয়। বাংলাদেশে ধর্মের লেবাস পরা মানুষের অভাব নেই, কিন্তু নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ আজ চরমে। পবিত্র রমজান মাস কিংবা ধর্মীয় উৎসবগুলো এলে আমাদের সমাজ ও বাজারব্যবস্থায় যে দৃশ্যপট তৈরি হয়, তা চরম হৃদয়বিদারক। রমজান হলো তাকওয়া, আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রসাধনের মাস; অথচ এই মাসটি এলেই একশ্রেণীর অসাধু মুসলিম ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী করে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষকে চরম বিপাকে ফেলে দেয়। সিয়ামের পবিত্রতাকে তারা পরিণত করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মুনাফাখোরির হাতিয়ারে। অথচ পশ্চিমের তথাকথিত অমুসলিম দেশগুলোতে ক্রিসমাস বা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে ব্যবসায়ীরা সতস্ফূর্তভাবে পণ্যে বিশেষ ছাড় (Discount) দেয়, যেন সাধারণ নাগরিকরা সহজে উৎসব উদযাপন করতে পারে। একজন অমুসলিম ব্যবসায়ী যে মানবিকতা ও নাগরিক সহানুভূতি প্রদর্শন করে, একজন মুসলিম ব্যবসায়ী হয়ে আমরা রমজানের মতো পবিত্র মাসেও তার লেশমাত্র দেখাতে পারি না—এর চেয়ে বড় ধর্মীয় পরাজয় আর কী হতে পারে?
আমাদের সমাজে মিথ্যা ও প্রতারণা যেন আজ অতি স্বাভাবিক এক সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিথ্যাচারকে রীতিমতো এক লাভজনক শিল্প ও কলাকৌশল হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছে। জনসম্মুখে অনায়াসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া, ক্ষমতার লোভে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া, চরিত্রহনন, পদ-বাণিজ্য, তোষামোদি এবং সুবিধাবাদের চর্চা আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ও ঘৃণ্য বিষয় হলো—যখন এই অনাচার ও দুর্নীতির চর্চা করা হয় ধর্মের পবিত্র দোহাই দিয়ে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো দেখলে যেকোনো বিবেকবান মানুষের শিউরে ওঠার কথা। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে পবিত্র কুরআন মুদ্রণ ও প্রকাশনা সংক্রান্ত প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। যে প্রতিষ্ঠান থেকে আল-কুরআনের বাণী সুদ্ধভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা, সেখানে কুরআনের নাম ভাঙিয়ে অর্থ লুটপাট করা নিছক কোনো প্রশাসনিক অপরাধ নয়; এটি সরাসরি ঐশী আমানতের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। আরও ভয়ংকর সংবাদ হলো, নিজেদের তথাকথিত ‘আদর্শিক রাজনৈতিক দল’ ও ‘ইসলামের পতাকাবাহী’ হিসেবে দাবি করা জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে পবিত্র মসজিদের অসহায় ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সরকারি বরাদ্দের টাকা জালিয়াতি করে আত্মসাৎ করার নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। অন্য যেকোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল যখন দুর্নীতি করে, তখন মানুষ তা প্রচলিত পচা রাজনীতির অংশ হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু যারা ইসলাম কায়েমের স্লোগান দেয়, নিজেদের ধর্মের একমাত্র আমানতদার বলে দাবি করে, তাদের নেতাকর্মীদের হাতে যদি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের সামান্য টাকার আমানতও নিরাপদ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ ধর্মের ওপর আস্থা রাখবে কীভাবে? এটি কেবল রাজনৈতিক কিংবা আর্থিক দেউলিয়াত্ব নয়; এটি বিশ্বনবী (সা.)-এর ‘আল-আমিন’ উপাধির প্রতি এবং তাঁর শেখানো আমানতদারিতার সুন্নাহর প্রতি এক চরম পাপাচার ও বিশ্বাসঘাতকতা। কোনো অপরাধীকে ধর্মীয় রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ঢেকে রাখা যেমন অপরাধ, তেমনি ধর্মের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি করা আরও বড় ধর্মদ্রোহিতা।
ইসলামী চেতনার এই চরম ধস ও নৈতিক অবক্ষয় কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; এর বিষাক্ত প্রভাব আজ ছড়িয়ে পড়েছে খোদ ইসলামের কেন্দ্রস্থল মধ্যপ্রাচ্য ও পবিত্র আরবের মাটিতেও। যে পবিত্র মক্কা ও মদিনার মাটি থেকে বিশ্বনবী (সা.) তাওহিদ ও জাহিলিয়াতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেই সৌদি আরবে আজ রাজতন্ত্র ও শাসকগোষ্ঠীর উদ্যোগে যে তথাকথিত ‘আধুনিকায়ন’ ও ‘ভিশন ২০৩০’ চর্চা হচ্ছে, তা বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করছে। বিনোদন ও পর্যটনের নামে সেখানে পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতির অবাধ লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। বিতর্কিত সব কনসার্ট, উন্মুক্ত বিনোদন মেলা, সিনেমা হল এবং অতি সম্প্রতি রিয়াদে অমুসলিম কূটনীতিকদের জন্য মদের দোকান চালুর পর বিদেশি প্রিমিয়াম-রেসিডেন্সধারীদের জন্যও অ্যালকোহল বিক্রয়ের সুযোগ সম্প্রসারণের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিকতার নামে পবিত্র কাবা শরীফের আকৃতির সাথে সাদৃশ্য রেখে কনসার্টের মঞ্চ তৈরি করার মতো ধৃষ্টতাপূর্ণ ঘটনাও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে।
এখানে আধুনিক বিজ্ঞান, আধুনিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা নারীর সম্মানজনক কর্মসংস্থানের বিরোধিতা করা হচ্ছে না; কারণ ইসলাম কখনো প্রগতি বা বিজ্ঞানের বিরোধী নয়। কিন্তু আধুনিকায়নের মোড়কে যখন ইসলামী আকিদা, নৈতিকতা ও পবিত্রতার মূল গোড়ায় কুঠারাঘাত করা হয়, তখন তা চেতনার চরম দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। পাশাপাশি, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অনুন্নত দেশের নারী গৃহশ্রমিকদের ওপর যে ধারাবাহিক ও অমানবিক মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে, তা চরম মানবতাবিরোধী। পেটের তাগিদে কাজ করতে যাওয়া অসচ্ছল নারীদের ওপর এই নির্মম নির্যাতন বিশ্বনবীর (সা.) সেই বিদায় হজ্জের ভাষণের চরম বরখেলাপ, যেখানে তিনি নারী ও দুর্বলদের অধিকার রক্ষার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মুসলিম বিশ্বের ভূমিকার দিকে তাকালে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশ্বনবী (সা.) মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সাথে তুলনা করেছিলেন—যার একটি অঙ্গে আঘাত লাগলে পুরো শরীর ব্যথিত হয়। অথচ আজ ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ এবং পশ্চিমাদের দাসত্বের কারণে মুসলিম বিশ্ব চরম বিভাজনে খণ্ড-বিখণ্ড। ফিলিস্তিনের গাজায় যখন শতাব্দীর সবচেয়ে বর্বরোচিত গণহত্যা চালানো হয়, কিংবা স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের ওপর যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে অবৈধ আগ্রাসন ও বিমান হামলা চালায়, তখন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ধনকুবের আরব দেশগুলোকে দেখা যায় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে আগ্রাসীদের মদদ দিতে এবং নিজের মুসলিম ভাইয়ের পিঠে ছুরি মারতে। নিজেদের রক্ষায় পশ্চিমাদের ওপর নির্ভর করা আর ভাইয়ের বিরুদ্ধে শত্রুর সাথে হাত মেলানো—এই ভূরাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতাই আজ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো জ্বলে ওঠে যখন নীতিনিষ্ঠ ঐক্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ উদ্যোগে যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ সামরিক সক্ষমতা ও পারস্পরিক নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে গঠিত এই চুক্তিটি মুসলিম বিশ্বের হারানো গৌরব ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে তুরস্ক যখন ঘোষণা করেছে যে এই চুক্তির দরজা অন্যান্য মুসলিম দেশের জন্যও উন্মুক্ত, তখন বাংলাদেশসহ ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিশর, কাতার ও জর্ডানের মতো রাষ্ট্রগুলোর উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও মাজহাবি বিভেদ ভুলে এই ধরনের জোটে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশের জন্য অবশ্যই নিজস্ব সংবিধান, জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; যেন তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সার্বভৌমত্ব, শান্তি, অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানবিক নিরাপত্তার এক সিসাঢালা প্রাচীরে পরিণত হয়।
এখানে আমাকে বলতেই হবে যে,ইসলামের পরম শত্রু বাহ্যিক আক্রমণকারীরা নয়; ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ভেতরের এই নৈতিক অবক্ষয় ও ছদ্মবেশী ভন্ডামি। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন—মিথ্যা, ঘুষ, ভেজাল, তোষামোদি, আমানতের খিয়ানত, মানুষের অধিকার হরণ ও রাজনৈতিক প্রতারণা কখনো ইসলামী চেতনার অংশ হতে পারে না। আমরা যদি মুখে হাজার বার দরুদ শরীফ পাঠ করি, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বা বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকাই; আমরা যদি মিলাদ মাহফিলে উঁচু গলায় জিলিপি বিতরণ ও রাসুলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হই, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ঘুষের টাকায় সংসার চালাই কিংবা ধর্মকে ব্যবহার করে দুর্নীতি করি—তবে সেই ভন্ডামি দিয়ে আল্লাহর রাসুলের সন্তুষ্টি অর্জন কখনোই সম্ভব নয়।
আজকের এই রবিউল আউয়ালে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে: আমরা কি কেবল প্রদর্শনীমূলক ও আনুষ্ঠানিক ইসলামের অনুসারী হবো, নাকি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র নৈতিক দর্শনের প্রকৃত ধারক-বাহক হবো?
আসুন, এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল আলো জ্বালানোর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, আমাদের ভেতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে এবং সমাজের সর্বস্তরের অনাচারের বিরুদ্ধে এক সুদৃঢ় বিপ্লবে পরিণত করি। আলো শুধু শহরের রাজপথে বা মসজিদে জ্বালালে হবে না—আলো জ্বালাতে হবে মানুষের মনের কলুষিত প্রকোষ্ঠে ও চরিত্রে। মুখে শুধু সুন্নাতের বুলি আওড়ালে হবে না—জীবনে ধারণ করতে হবে সততা, আমানতদারি ও ইনসাফের চিরন্তন আদর্শ। রাজনীতির ময়দান থেকে ধর্মীয় ভন্ডামি ও তোষামোদি দূর করে সুশাসন ও আমানতদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে; বাজারব্যবস্থা থেকে সিন্ডিকেট ও ভেজাল উৎখাত করে মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে; এবং উম্মাহর বিভেদ ভুলে বিশ্বজুড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হতে হবে। তবেই ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর প্রকৃত বার্তা আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়বে এবং সব ধরনের পাপাচার ও ইসলামী চেতনার চরম অবক্ষয় মুছে দিয়ে এক নতুন কালজয়ী মানবিক ও নৈতিক জাগরণের সূচনা ঘটবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com