বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাহসের বড় অভাব। এখানে নেতা আছেন অনেক, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রনায়ক নেই। বক্তৃতা আছে, কিন্তু বিতর্ক নেই। মিছিল আছে, কিন্তু যুক্তি নেই। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই দেশ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বন্দী—যেখানে ক্ষমতা চাই, কিন্তু প্রশ্ন চাই না; ভোট চাই, কিন্তু ভোটারের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয়।
তবে এখানে আমাকে বলতেই হবে যে, স্বাধীনতার ঘোষক একজন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন সম্পূর্ণরূপে ব্যতিক্রম।
ভয়ের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই এক রাতের একটি ফেসবুক পোস্ট যেন বিস্ফোরণের মতো আঘাত হেনেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বলছেন—বৈধতা আসে কেবল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, তিনি আহ্বান জানাচ্ছেন উন্মুক্ত মঞ্চে সরাসরি বিতর্কের। ক্যামেরার সামনে। জনগণের চোখে চোখ রেখে। প্রশ্ন-উত্তরের টেবিলে বসে।
এটা সৌজন্যের ডাক নয়। এটা রাজনৈতিক সাহসের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। এবং স্পষ্ট করে বললে—এটা তারেক রহমানের জন্য এক নিখুঁত গুগলি।
১৯৭১ সালে এই দেশ জন্ম নিয়েছিল জনগণের ক্ষমতার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে হত্যা করা হয়েছে। কখনো একদলীয় শাসনে, কখনো সামরিক শাসনে, কখনো আবার তথাকথিত নির্বাচনী গণতন্ত্রের মুখোশে। গণতন্ত্রকে কবর দেওয়া হয়েছে বারবার। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ক্ষমতার চেহারা বদলালেও চরিত্র বদলায়নি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই দল পালাক্রমে রাষ্ট্র দখল করেছে, কিন্তু কেউই রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফেরত দেয়নি।
সংসদ হয়েছে রাবার স্ট্যাম্প। নির্বাচন হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। বিরোধী দল মানে শত্রু। আর জনগণ? তারা বরাবরই থেকে গেছে পোস্টার লাগানোর হাত, মিছিলের পা আর ভোটের অঙ্ক হিসেবে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসে একটি ঘটনাও খুঁজে পাওয়া যাবে না—যেখানে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা স্বেচ্ছায় বলেছেন, “চলুন, আমরা উন্মুক্ত বিতর্কে বসি। জনগণ বিচার করুক।”
কারণ ভোগবাদের এই রাজনীতিতে জনগণের সামনে দাঁড়ানো সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এই জায়গাটিতে অদম্য সাহস নিয়ে সিংহের গর্জনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন ডা. শফিকুর রহমান। যিনি নির্বাচনী মাঠে ইতোমধ্যে ‘দাদু’র উপাধি লাভ করেছেন। আর দাদুরা তো বুড়োই হয়,তাই না?
মিস্টার শফিক ঠিক সেটাই করলেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কার্যত নিষিদ্ধ—জনগণের সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিলেন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে।
তার বক্তব্যের সবচেয়ে ভয়ংকর ও সাহসী অংশটি হচ্ছে—রাজনীতি সমালোচনা সহ্য করবে, গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণের মুখোমুখি হবে, এবং জবাবদিহিমূলক হবে।
এই একটি বাক্যই বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতির জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর। কারণ এখানে ক্ষমতায় গেলে সমালোচনা দমন করা হয়, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে সমালোচনার জবাব না দিয়ে আবেগী ভাষণ দেওয়া হয়। যুক্তিনির্ভর রাজনীতি—এদেশে প্রায় বিদেশি ধারণা। তা কে না জানে? ডা. শফিকুর রহমান সেই নিষিদ্ধ ঘরেই ঢিল ছুড়েছেন।
তিনি “জুলাই বিপ্লব”-এর কথা বলেছেন—এটা কাকতালীয় নয়। এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, তরুণরা আর পুরোনো গল্পে বিশ্বাস করে না। তারা প্রশ্ন করে—তোমার কর্মসূচি কী? তোমার অতীত কী বলে? তুমি ক্ষমতায় গেলে কী করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মাইকে চিৎকার করে দেওয়া যায় না। দিতে হয় আলোচনার টেবিলে।
তরুণদের সামনে দাঁড়িয়ে।
রাজনীতি যে সভ্য, যুক্তিনির্ভর এবং জনমুখী হতে পারে—এটা প্রমাণ করতে না পারলে আগামী দিনের বাংলাদেশে কোনো দলই টিকবে না। ডা. শফিকুর রহমান সেটা বুঝেছেন। প্রশ্ন হলো—অন্যরা বুঝেছেন কি?
আমি মনে করি, ডা. শফিকুর রহমানের এই আহ্বানের পর তারেক রহমানের সামনে দুটি পথ খোলা।
এক—চুপ থাকা। এড়িয়ে যাওয়া। বিষয়টি উপেক্ষা করা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা খুবই পরিচিত চিত্র।
দুই—উন্মুক্ত বিতর্কে বসা। জনগণের সামনে নিজের রাজনীতি উন্মোচন করা। প্রশ্নের জবাব দেওয়া। অতীত ও ভবিষ্যৎ—দুটোরই দায় নেওয়া। প্রথম উপায়টি যতটা সহজ
দ্বিতীয় পথটি ততোধিক কঠিন।
কারণ উন্মুক্ত বিতর্ক মানে আরামদায়ক বক্তৃতা নয়। সেখানে প্রশ্ন আসবে ২০০১-২০০৬-এর শাসন নিয়ে, আসবে রাজনীতিতে সহিংসতার দায় নিয়ে, আসবে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে। প্রার্থী মনোনয়নের মানদন্ড নিয়েও প্রশ্ন আসবে।
এই কারণেই এই আহ্বান একটি গুগলি। ব্যাটসম্যান যদি বুঝতে না পারেন, আউট অনিবার্য। ক্লিন বোল্ড।
উন্মুক্ত বিতর্ক ক্ষমতাবানদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সেখানে নিয়ন্ত্রিত স্ক্রিপ্ট চলে না। সেখানে দলীয় মিডিয়া নেই। সেখানে জনগণ সরাসরি বিচারক।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতা তৈরি হয়েছে ভক্ত দিয়ে, যুক্তি দিয়ে নয়। তাই উন্মুক্ত বিতর্ক মানেই ভক্তনির্ভর রাজনীতির মৃত্যু। ডা. শফিকুর রহমান সেই মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছেন।
এখানে একটি বাস্তব সত্য অস্বীকার করা যাবে না—জামায়াতে ইসলাম নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে গেছে, সমালোচিত হয়েছে, প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে দলটি যে বিষয়টি সামনে আনছে, তা হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
এই আহ্বান জামায়াতকে বড় দেখানোর চেষ্টা নয়; বরং অন্যদের ছোট করে দেখানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ প্রশ্নটা এখন দলীয় নয় বরং নৈতিক।
এখানে মুখ্য প্রশ্ন হচ্ছে, কে জনগণের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়?
নতুন বাংলাদেশ মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন রাজনৈতিক আচরণ। যেখানে নেতা প্রশ্ন এড়িয়ে যাবে না, সমালোচনা দমন করবে না, বিতর্ককে ভয় পাবে না।
ডা. শফিকুর রহমান তার পোস্টের শেষাংশে বলেছেন—জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানানোই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি। এই বাক্যটি যদি কেউ হালকাভাবে নেয়, তবে সে রাজনীতির ভবিষ্যৎ বুঝতে পারছে না।
আমি মনে করি,এটা একটি মানদণ্ড স্থাপনের চেষ্টা। ভবিষ্যতে যে নেতা উন্মুক্ত বিতর্ক এড়িয়ে যাবেন, জনতা তাকেই সন্দেহের চোখে দেখবে।
শেষ কথা:
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ আর আগের মতো নিরাপদ নয়। জনগণ দেখছে, শুনছে, বিশ্লেষণ করছে। উন্মুক্ত বিতর্কের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হোক বা না হোক—একটি সত্য বদলে গেছে:
রাজনীতির আয়নায় মুখ দেখার সময় এসে গেছে। একজন বুড়ো দাদু ডাক্তার শফিকুর রহমানের আহ্বান গ্রহণ করা হবে কি না—তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, আহ্বানটি দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসে সেটাই লেখা থাকবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিকে আজ একজন বুড়ো দাদু আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে—সে আয়নায় নিজের মুখ দেখানোর সাহস নিয়ে কোনো জোয়ান এগিয়ে আসবে নাকি আগের মতোই লুকিয়ে থাকবে?
আমি মনে করি,উন্মুক্ত বিতর্ক কোনো দলের জয় নয়। এটা জনগণের জয়। আর সেই জয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেই বোঝা যাবে—কারা সত্যিই জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস করে, আর কারা কেবল ক্ষমতার জন্য জনগণকে ব্যবহার করতে চায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বুড়ো দাদু গুগলি ছোড়েছেন।
সুতরাং এখন দেখা যাক—কে ব্যাট তোলে, আর কে প্যাভিলিয়নের পথ খোঁজে।
লেখক:সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল:
ahabibhme@gmail.com