আমাদের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় নেই, কোনো রক্তের সূত্র নেই—তবুও সেগুলো সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে সত্য। ডা. মোহাম্মদ আখতার হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল তেমনই এক আত্মার বন্ধন, যা সময়ের স্রোতেও ম্লান হয়নি, বরং আরও দৃঢ় হয়েছে।
আজ তিনি নেই—এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই দশক আগে, যখন আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতাম, তখনই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। সেই পরিচয় ছিল পেশাগত, কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তা রূপ নেয় গভীর মানবিক সম্পর্কে। তিনি ছিলেন দেশের একজন স্বনামধন্য ত্বক রোগ বিশেষজ্ঞ, আর আমি একজন সংবাদকর্মী—এই দুই ভিন্ন জগতের মানুষ কীভাবে এত কাছাকাছি চলে এলাম, তা ভেবে আজও বিস্মিত হই।
আখতার ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন আমার আপনজন। আমাদের পরিবারগুলোর মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত আত্মীয়তা—যেখানে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আন্তরিকতা ছিল বেশি, সম্পর্কের ভাষা ছিল হৃদয়ের। তিনি আমার বাসায় এসেছেন, আমি আমার স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তাঁর বাসায় গিয়েছি। আমাদের সুখ-দুঃখ, রোগ-ব্যাধি—সবকিছুর সঙ্গী ছিলেন তিনি।
আমাদের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলেই প্রথম যে নামটি মনে আসত, সেটি ছিল আখতার ভাই। ফোন করলেই তিনি মনোযোগ দিয়ে সব শুনতেন, ধৈর্য নিয়ে পরামর্শ দিতেন, প্রয়োজনে প্রেসক্রিপশন দিতেন। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর চিকিৎসায় এবং আল্লাহর রহমতে আমরা বারবার সুস্থ হয়েছি—শুধু ওষুধের কারণে নয়, তাঁর আন্তরিকতার কারণেও। তাঁর কথায় এমন এক আশ্বাস থাকত, যা রোগীর অর্ধেক কষ্ট দূর করে দিত।
প্রায় দেড় বছর আগে তাঁর গুলশানের বাসায় গিয়েছিলাম আমার একমাত্র সন্তান আহনাফ হাবিব আলভীর ত্বকের চিকিৎসার জন্য। সেদিনও তিনি আগের মতোই আন্তরিক ছিলেন। মনোযোগ দিয়ে রোগ দেখলেন, পরামর্শ দিলেন, এমনকি আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে গল্প করলেন। তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ ভাবি তখন অস্ট্রেলিয়ায় সন্তানদের কাছে ছিলেন। আখতার ভাই নিজ হাতে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন—একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের এই সরলতা সত্যিই বিরল।
এর কিছুদিন পর তিনিও অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেলেন। দূরত্ব বেড়ে গেলেও আমাদের যোগাযোগ থামেনি। নিয়মিত ফোনে কথা হতো। তিনি দেশের খোঁজ নিতেন, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন, দেশের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। তাঁর কণ্ঠে আমি প্রায়ই এক ধরনের ব্যথা অনুভব করতাম—একজন দেশপ্রেমিক মানুষের ব্যথা, যিনি দূরে থেকেও দেশের জন্য ভাবেন।
অস্ট্রেলিয়ার জীবন নিয়ে তিনি অনেক গল্প করতেন। সেখানে সরকারি সেবার মান, মানুষের আচরণ, খাবার দাবার ,পরিবেশ—সবকিছু নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা শুনতাম মুগ্ধ হয়ে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করতেন, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। তাঁর সেই দীর্ঘশ্বাস আজও কানে বাজে—একজন সচেতন নাগরিকের নীরব প্রতিবাদ।
কয়েক মাস আগেও তিনি বলেছিলেন, খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন। ফিরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন, অনেক গল্প করবেন। সেই আশায় আমি অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু জীবন তো সব সময় আমাদের ইচ্ছার মতো চলে না।
গত শুক্রবারের সেই বিকেলটা যেন আজও আমার চোখে ভাসে। দুপুরের খাবারের পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হালকা ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিকেল চারটার দিকে ফোন বেজে উঠল। ফোনের ওপারে ছিল ইন্তূ—আখতার ভাইয়ের ছোট ছেলে। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত ভারী সুর। সে জানাল, “আব্বু আর নেই…”
মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু থেমে গেল। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুখ থেকে বেরিয়ে এল—“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
আখতার ভাই চলে গেছেন—এটা শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়, এটি আমার জীবনের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার খবর।
ডা. মোহাম্মদ আখতার হোসেন চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডার্মাটোলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং দেশের একজন খ্যাতিমান স্কিন বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তাঁর পরিচয় এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ—নিরহংকারী, দেশপ্রেমিক, মানবিক এবং ধর্মপ্রাণ।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সরলতা। একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক হয়েও তিনি রোগীদের কাছ থেকে মাত্র এক হাজার টাকা ভিজিট নিতেন। গরিব ও অসহায় মানুষদের কাছ থেকে তিনি কোনো ফি নিতেন না। এই সময়ে, যখন চিকিৎসা একটি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, তখন তাঁর এই মানবিকতা সত্যিই বিরল ও অনুকরণীয়।
গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায়ই রিকশায় করে চেম্বারে যেতেন। বিলাসিতা তাঁর জীবনের অংশ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সেবা করাই সবচেয়ে বড় কাজ। তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও মূল্যবোধ ছিল অসাধারণ।
তিনি ছিলেন একজন ধার্মিক মানুষ। নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন, আল্লাহর প্রতি ছিল গভীর বিশ্বাস। তাঁর প্রতিটি কাজে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যেত। তিনি শুধু একজন ভালো ডাক্তারই ছিলেন না, ছিলেন একজন ভালো মানুষ—আর সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তাঁর পরিবারটিও তাঁর মতোই সুন্দর ও গুণে ভরপুর। আক্তার ভাইয়ের পিতা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ভাবিও একজন ডাক্তার। সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসর নিয়েছেন ক’বছর আগে। বড় ছেলে রাফিন অস্ট্রেলিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে উচ্চপদে কর্মরত, যা আক্তার ভাইয়ের গর্বের বিষয় ছিল। একমাত্র মেয়ে আফরিদা সিডনির একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কাজ করছেন, আর ছোট ছেলে ইন্তূ সিডনির একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুনামের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করেছে মাত্র। সর্ব শেষ যখন আক্তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়, ইন্তুর জন্য একটি পাত্রী দেখতে বলেছিলেন। শিক্ষিত এবং ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি পরিবারের কথা বলেছিলেন।
এই সন্তানদের সাফল্যের পেছনে আখতার ভাইয়ের শিক্ষা ও মূল্যবোধই ছিল মূল ভিত্তি।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া এই মূল্যবোধ, এই মানবিকতা, এই আদর্শ—এসবই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে আমাদের মাঝে।
মৃত্যু অনিবার্য। আমরা সবাই একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। আখতার ভাই আমাদের একটু আগে চলে গেলেন, আমরা হয়তো পরে যাব। কিন্তু তিনি যেভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, তা সবাই পারে না।
আজ যখন তাঁর কথা ভাবি, তখন শুধু একজন ডাক্তারকে নয়, একজন অভিভাবককে, একজন বন্ধু, একজন পথপ্রদর্শককে স্মরণ করি। তাঁর অভাব কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
হে মহান আল্লাহ, আপনি তাঁকে জান্নাতুন নাঈম ও জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন, তাঁর সকল গুনাহ মাফ করে দিন। তাঁর পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন।
আখতার ভাই, আপনি হয়তো আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে আপনি চিরজীবী। আপনার স্মৃতি, আপনার শিক্ষা, আপনার ভালোবাসা—এসবই আমাদের পথ দেখাবে।
ভেবেছিলাম, শনিবারেই আপনাকে স্মরণ করে কিছু লিখব। কিন্তু পার্থিব জীবনের স্বার্থপরতায় বন্দী জীবনে অনেক কিছুই আমাদের ইচ্ছাধীন নয়। এই অপারগতার জন্য ক্ষমা চাইছি। আমায় ক্ষমা করবেন, প্রিয় আক্তার ভাই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com