সংসদীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচন এবং তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। একটি নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম ১৮০ দিন বা ছয় মাস কেবল প্রশাসনিক খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় নয়, বরং সরকারের নীতিগত রূপরেখা ও কার্যকারিতা প্রমাণের প্রধানতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতেই একটি স্পষ্ট ও কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন—মন্ত্রীদের জন্য প্রথম ছয় মাস হবে ‘ট্রায়াল পিরিয়ড’ বা শিক্ষানবিসকাল। এই সময়ের মধ্যে যাদের পারফরম্যান্স ভালো থাকবে এবং যারা রাজনৈতিক সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতা দেখাতে পারবেন, কেবল তারাই টিকে থাকবেন। আর যারা অহেতুক বিতর্কের জন্ম দেবেন কিংবা জনমনে আস্থা হারানোর মতো কাণ্ড ঘটাবেন, তাদের বিদায় নিতে হবে।
আগামী ১৬ আগস্ট এই সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে সরকারের এই ‘১৮০ দিনের কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন’ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতদিন বাংলাদেশে সরকার গঠনের পর পাঁচ বছর কোনো মন্ত্রীর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার এমন প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা দেখা যায়নি। ফলে এই মূল্যায়ন কেবল একটি রুটিন প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে এখানে বলে রাখা ভালো যে, একজন বর্ষিয়ান ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের রাজনীতিবিদ, বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্ভবত আর মন্ত্রী পরিষদে থাকছেন না। সূত্র মতে তিনি বঙ্গভবনের বাসিন্দা হতে পারেন। অর্থাৎ আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অন্যতম ফেভারিট প্রার্থী হলেন মীর্জা ফরুল ইসলাম আলমগীর।
যাহোক মূল আলোচনায় ফিরে যাক,সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসের এই পর্যালোচনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের মাঝে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীলের অযাচিত বক্তব্য ও অসতর্ক সিদ্ধান্ত সরকারের সামগ্রিক অর্জনকে ম্লান করে দেওয়ার উপক্রম করেছে।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন পূর্ণমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার একদম শুরুতেই পরিবহন খাতের অনিয়ম ও চাঁদা আদায় নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে চরম সমালোচনার মুখে পড়েন। পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানকে রেলের সমস্ত সরকারি বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে জোর সুপারিশ করে চিঠি পাঠানোর ঘটনা সামনে আসলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এতে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও রাজনৈতিক সততা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
একইভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক প্রতিমন্ত্রী নিজ এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনায় পারিবারিক নামকরণ নিয়ে বিতর্ক ও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এছাড়া একটি আইনি মামলায় অনভিপ্রেত প্রভাব খাটানোর অভিযোগও তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের নীতিগত কিছু সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক গতিশীলতায় অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জাতীয় পরীক্ষা আয়োজনের জেদ এবং সাম্প্রতিক সময়ে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে কয়েকটি অসংবেদনশীল বক্তব্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পূর্ণমন্ত্রীর কার্যক্রমও শুরু থেকেই নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য এবং একটি স্বনামধন্য সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন তিনি। এমনকি জাতীয় পর্যায়ের এক সরকারি চিকিৎসালয়ের অনুষ্ঠানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করে তাকে মূল বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকার পরামর্শ দিতে হয়, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে।
অন্যদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI দিয়ে তৈরি বলে দাবি করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে নিরপেক্ষ ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মের বিশদ বিশ্লেষণে তার সেই দাবি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে জনমনে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়।
শুধু নীতিগত বা দাপ্তরিক সিদ্ধান্তই নয়, ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় চরম গাফিলতির ঘটনাও উঠে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চরম দায়িত্বহীনতার ছাপ স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও জাতীয় দিবসের ওই অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রমান্যচিত্রে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও ঐতিহাসিক সত্য বাদ পড়ায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আমন্ত্রিত দেশি-বিদেশি অতিথিদের সামনে এহেন অব্যবস্থাপনা বিশ্বমঞ্চে সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
একজন সংবাদকর্মী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তই নয়, জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত বিষয়গুলোও আমার পর্যালোচনার তালিকায় উঠে এসেছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে পেশাগত প্রয়োজনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছি যে, কাজ করার দক্ষতার পাশাপাশি আচরণের শালীনতাও সরকারের ভাবমূর্তির এক বিশাল নিয়ামক।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বহু দায়িত্বশীলের কথাবার্তা ও চলাফেরায় পদের অহংকারই প্রধান হয়ে উঠেছে। যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অসাধারণ বিনয় ও সহনশীল ভাবমূর্তির সঙ্গে মোটেও মানানসই নয়। একজন প্রাক্তন ছাত্রনেতা থেকে প্রতিমন্ত্রী হওয়া ব্যক্তির দপ্তরে প্রশাসনিক কাজে গিয়ে দেখা গেল, তিনি টেবিলে রাখা হরেক রকমের দামি ও সুস্বাদু বাদাম ও খেজুর খেতে খেতে অত্যন্ত অপেশাদার ভঙ্গিতে কথা বলছেন। তার এই শৈথিল্য ও আচরণে একটি দেশের দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয়ের গাম্ভীর্য ফুটে ওঠেনি, বরং মনে হয়েছে ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত আড্ডায় বসে আছেন।
আরেকজন সিনিয়র মন্ত্রী এবং একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টাকে আলাদা দুটি স্থানে সৌজন্যবশত সালাম জানানো সত্ত্বেও তারা সালামের উত্তর জানানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন মনে করেননি। তারা যেন ভিন্ন কোনো জগতের অধিবাসী! তাদের চোখেমুখে অহংকারের ঊর্ধ্বমুখী পারদ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের করের টাকায় পরিচালিত দায়িত্বশীল পদে বসে সাধারণ নাগরিক বা সংবাদকর্মীদের প্রতি এহেন চরম অবজ্ঞা রাষ্ট্রাচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ক্ষমতার এই দাপট সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। সচিবালয়ের ৭ নম্বর ও ৪ নম্বর ভবনে লিফটের সামনে দীর্ঘক্ষণ সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকার সময় একাধিক সংসদ সদস্যকে সদলবলে এসে নিয়ম ভেঙে সিরিয়াল ডিঙিয়ে লিফটে উঠে যেতে দেখা গেছে। যখন আমি প্রতিবাদ করে এমপি সাহেবদের স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শৃঙ্খলা মেনে চলার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন তারা থতমতো খেয়ে সাময়িক পিছু হটলেও তাদের অঙ্গভঙ্গিতে অহংকার স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। পোশাক-আশাকে আভিজাত্য থাকলেও তারা আচরণে ন্যূনতম শৃঙ্খলা মানতে নারাজ। এই আচরণগত ব্যাধিই আজ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বাধা।
অবশ্য এই হতাশাজনক আমলনামার মধ্যেও কিছু উজ্জ্বল আলো চোখে পড়েছে, যা পুরো ব্যবস্থার প্রতি আশা জাগায়। সব মন্ত্রী যে ক্ষমতার গরমে অন্ধ হয়ে গেছেন—তা নয়।
বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের কথা। পেশাগত জীবনে বহু মন্ত্রী ও সচিবের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে, কিন্তু হাবিবুর রশিদ নিজের আচরণে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার কাছে মন্ত্রিত্বের পদের চেয়ে মানবিক পরিচয়ই প্রধান হয়ে উঠেছে। অহমিকা, ক্ষমতার বড়াই বা কোনো কৃত্রিমতা তার মধ্যে দেখা যায়নি। একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সার্বক্ষণিক বিনয় ও আন্তরিকতা বজায় রেখে কাজ করছেন।
একইভাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামও এক অসম্ভব সুভদ্র, সংযত ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ কিংবা সংবাদকর্মী—যারাই তাদের কাছে গিয়েছেন, তারাই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন।
বাস্তবতা হলো, একজন মন্ত্রীর পক্ষে শতভাগ মানুষের সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তিনি চাইলে সুন্দর, মার্জিত ও মানবিক আচরণ দিয়ে নাগরিককে আশ্বস্ত করতে পারেন। হাবিবুর রশিদ ও ফকির মাহবুব আনামের মতো দূরদর্শী মন্ত্রীরা প্রমাণ করেছেন যে, কীভাবে কাজের পাশাপাশি আচরণের মাধ্যমে পুরো সরকারের ভাবমূর্তি জনমানুষের হৃদয়ে উজ্জ্বল করে তোলা যায়।এছাড়াও বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জাবি উল্লা, প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি সমুন্নত রেখে দায়িত্ব পালন করছেন।এর বাইরে কৃষি মন্ত্রী আমিনুর রশিদ মহসিন সহ আরো কয়েকজন মন্ত্রী সরকারের সুনাম রক্ষায় অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।
আমার আরেকটি গভীর পর্যবেক্ষণ বর্তমান সরকারের ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবের সাথে সম্পর্কিত। অতীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বাদে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সরকারি যোগাযোগের নম্বর প্রকাশিত থাকত। ফলে যেকোনো প্রয়োজনে দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হতো এবং সরকারের সাথে জনগণের একটি সচ্ছ যোগাযোগ তৈরি হতো।
কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব বা তাদের একান্ত সচিবদের যোগাযোগের নম্বরগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে কিংবা সীমিত করা হয়েছে। একটি ‘ডিজিটাল গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রব্যবস্থায় এহেন গোপনীয়তা ও আমলাতান্ত্রিক দূরত্ব কখনোই সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না।
এর পাশাপাশি আরও বড় সমস্যা হলো—অধিকাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পেশাগত প্রয়োজনে মোবাইল কল বা লিখিত বার্তার কোনো জবাব দেন না। একজন পেশাদার সংবাদকর্মী তার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়; বরং সরকারের নীতিগত অবস্থান জানতে, গুজব রোধ করতে এবং সঠিক তথ্য যাচাই করতেই মন্ত্রীদের বক্তব্য নেন। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তথ্যগত শূন্যতা তৈরি হয়, যার সুযোগ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত বিচারে সরকারেরই ক্ষতি হয়। একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কেবল ফাইলে সই করা নয়, মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও তার সাংবিধানিক কর্তব্য।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর কর্মদক্ষতার বিশদ পর্যালোচনা চলছে। কেবল ব্যক্তি-বিশেষের অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কই নয়, এই মূল্যায়নে প্রধান প্রাধান্য পাচ্ছে কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড:
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতির হার ও নির্দিষ্ট সময়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।
দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতি দূর করা।
গণমাধ্যমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, সুশাসন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ এবং সংসদে সক্রিয়তা। দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি বজায় রাখা, ব্যক্তিস্বার্থ বা স্বজনপ্রীতি এড়ানো এবং ক্ষমতাদর্পী আচরণ না করা।
একই সাথে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে অন্তত ১২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন, যার ফলে কাজের গতি শ্লথ হচ্ছে। আসন্ন রদবদলে কাজের ভার লাঘব করে সুনির্দিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা হতে পারে।
সরকারের মন্ত্রিসভায় যদি পরিবর্তন আসে, তবে তাতে অভিজ্ঞ রাজনীতিক, তরুণ মুখ, টেকনোক্র্যাট এবং শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের একটি সুন্দর ভারসাম্য দেখা যেতে পারে।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে—যেমন যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ায়—’ক্যাবিনেট শাফেল’ বা মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি। সেখানে কোনো মন্ত্রীর সামান্যতম ব্যর্থতা, অদক্ষতা বা কেলেঙ্কারি সামনে আসলে সরকারের প্রধান নৈতিক চাপে পড়েন এবং দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার এই শক্তিশালী রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাব ছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ‘ছয় মাসের পারফরম্যান্স টেস্ট’ এবং তার ভিত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তাটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য বা দলীয় প্রভাবশালী পরিচয় টিকে থাকার মানদণ্ড হতে পারে না; কাজের দক্ষতা, বিনয়, শৃঙ্খলা এবং ভাবমূর্তি রক্ষা করাই হলো টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
নিয়মিত মূল্যায়ন ও কঠোর সিদ্ধান্তই একটি সরকারকে জনবান্ধব করে তোলে। যারা অর্পিত দায়িত্বের সৎব্যবহার করতে ব্যর্থ হবেন কিংবা আচরণের দম্ভে জনগণকে অবমূল্যায়ন করবেন, তাদের সরিয়ে দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের সুযোগ দেওয়াই সুশাসনের প্রধান শর্ত।
পরিশেষে বলতে চাই, আগামী ১৬ আগস্টের পর মন্ত্রিসভায় যে রদবদলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল রাজনীতির অংক মেলানো নয়; বরং এটি সরকারের কার্যকারিতা, গতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। জনগণ এখন দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়।
বিতর্কে জড়ানো, দাপ্তরিক কাজে ব্যর্থ হওয়া কিংবা অহংকারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে যদি হাবিবুর রশিদ কিংবা ফকির মাহবুব আনামের মতো দায়িত্বশীল, বিনয়ী ও দক্ষ নেতাদের হাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়, তবে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ‘১৮০ দিনের মূল্যায়ন নীতিতে যদি দাপ্তরিক রিপোর্টের পাশাপাশি এই আচরণগত সূচক ও যোগাযোগের সহজপ্রাপ্যতাকে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জবাবদিহিতার এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রীদের এই বহু প্রতীক্ষিত পরীক্ষার ফলাফলে কাদের পদোন্নতি হয় আর কাদের বিদায়ঘণ্টা বাজে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com