আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

আনন্দ-বেদনার ঈদ এবং কিছু প্রশ্ন

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই উচ্ছ্বাস, ঈদ মানেই প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ। বছরের পর বছর কর্মব্যস্ততায় ক্লান্ত মানুষ এই একটি সময়ের জন্যই অপেক্ষা করে—শিকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার জন্য, মায়ের রান্না, বাবার সান্নিধ্য, শৈশবের স্মৃতির কাছে নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার জন্য। কিন্তু যখন এই আনন্দযাত্রা ভোগান্তিতে রূপ নেয়, যখন ঘরে ফেরার পথ হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা, দুর্ভোগ ও মৃত্যুভয়ের প্রতীক—তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

এবারের ঈদযাত্রা সেই চিরচেনা বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে, তবে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। কারণ, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় এক ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রোটোকল কমিয়ে কাজের গতি বাড়ানো—এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে মানুষের আশা ছিল—ঈদযাত্রাও হয়তো এবার হবে স্বস্তিদায়ক, নিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা সেই প্রত্যাশাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। যাত্রার শুরুতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে পুরোনো ভোগান্তির চিত্র—দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, নৌপথে বিশৃঙ্খলা। সাধারণ মানুষ আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে: পরিবর্তন কোথায়?

এখানে একটি সত্য স্বীকার করতেই হবে—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঈদযাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ছিল—এমন ধারণা জনমনে এখনো বিদ্যমান। সেই সময় প্রশাসনিক কঠোরতা, সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে যাত্রাপথ অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: একটি অনির্বাচিত সরকার যেখানে এই কাজটি করতে পেরেছিল, সেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকার কেন একই সক্ষমতা দেখাতে পারছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামোগত বাস্তবতা বুঝতে হবে। নির্বাচিত সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ, মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রভাব, পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট সংস্কৃতি—এসব বিষয় প্রশাসনিক কঠোরতা প্রয়োগকে জটিল করে তোলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলনামূলকভাবে এই চাপমুক্ত থাকে, ফলে তারা দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য সেই একই মাত্রার কঠোরতা প্রয়োগ অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

তবে এই বাস্তবতা কোনোভাবেই ভোগান্তির অজুহাত হতে পারে না। কারণ, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বই হলো নাগরিকের নিরাপদ ও সম্মানজনক যাতায়াত নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ঈদের মতো একটি বৃহৎ সামাজিক উৎসবের সময় এই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল দুর্ঘটনার সংখ্যা। একদিনে ২৮ জনের প্রাণহানির মতো ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। সড়ক, রেল ও নৌপথ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা এখনো কতটা ভঙ্গুর। এগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অপূরণীয় শূন্যতা। অথচ গবেষণা বারবার বলছে—এই দুর্ঘটনার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। তদারকির অভাব, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি—এই সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে একইভাবে রয়ে গেছে।

অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। যখন সাধারণ মানুষ বাস্তবে দ্বিগুণ ভাড়া দেয়, অথচ দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হয়—“অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না”—তখন বাস্তবতা ও বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর ফাঁক তৈরি হয়। এই ফাঁকই জনআস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি করে।

তবে সমালোচনার এই প্রেক্ষাপটেও সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্টভাবে উল্লেখযোগ্য। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি না করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করেছে। একই সঙ্গে সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কাজের প্রতি দৃশ্যমান আন্তরিকতা মানুষের মধ্যে একটি আশাবাদ সৃষ্টি করেছে—যা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

রাষ্ট্র পরিচালনার এই মিশ্র বাস্তবতার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দিকও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “ইত্যাদি”—যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষের বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম—সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠানটি যেন তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। একঘেয়েমি, নতুনত্বের অভাব এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুষ্ঠানটিকে অনেকটাই নিস্তেজ করে তুলেছিল।

কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে প্রথম সম্প্রচারিত পর্বটি সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। দুর্নীতি, ঘুষ, সুবিধাবাদী মানসিকতা—এসব বিষয়কে সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। এমনকি এআইয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমের চরিত্র বিশ্লেষণের পর্বটি ছিল দারুন উপভোগ্য এবং বাস্তব সম্মত। এতে বোঝা যায়—শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক পরিসরেও একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে।

তবে এই ইতিবাচকতার মাঝেও একটি অপূর্ণতা লক্ষ্য করা গেছে—চাঁদাবাজির মতো একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুষ্ঠানটিতে অনুপস্থিত ছিল। যা হতাশা জনক। কারণ, একটি সমাজের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে গেলে এই বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
তারপরও স্বীকার করতে হবে—অনুষ্ঠানটিতে একটি গতিময়তা ফিরে এসেছে, নতুনত্ব এসেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাস্তবতাকে স্বীকার করার সাহসিকতা ফিরে এসেছে।

নির্মাতা হানিফ সংকেত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালায় যে গুণগত পরিবর্তনের কথা বলছিলেন, সেটির আভাস এই পর্বে পাওয়া গেছে বলেই মনে হয়। এটি প্রমাণ করে—সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে চায় সরকার।

সুতরাং এবারের ঈদের সামগ্রিক চিত্রটি আনন্দ বেদনার একটি দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিফলন বলেই মনে হয়েছে। একদিকে রয়েছে সরকারের আন্তরিকতা, উদ্যোগ এবং পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত; অন্যদিকে রয়েছে বাস্তবায়নের ঘাটতি, পুরোনো কাঠামোগত সমস্যা এবং জনভোগান্তির কঠিন বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন করতেই হয়:
কেন প্রতি বছর ঈদযাত্রা একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটায়?
কেন আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত হয় না?
কেন একটি আনন্দময় উৎসবের পথ বারবার বেদনার প্রতীকে পরিণত হয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে বলা যায়, ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একটি জাতির সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। তাই এই উৎসবকে ঘিরে কোনো ধরনের ভোগান্তি বা অব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চায়, তবে সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় ঈদের মতো আনন্দ উৎসবের মুহূর্তগুলোতেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
ইমেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin