আমাদের রাজনীতিতে কিছু সত্য এতটাই স্পষ্ট উঠেছে যে সেগুলো অস্বীকার করা এখন আর মতাদর্শ নয় বরং নির্লজ্জতা-অসভ্যতা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠিক সেই স্পষ্ট সত্যের সামনে জাতিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি একটি নৈতিক বিচার—কারা দেশ চালাবে, আর কারা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।
দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে কার্যত প্রতারণার ওপর। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক কথা, ক্ষমতার করিডরে আরেক কথা। জনগণের সামনে উন্নয়নের গল্প, আর দলের ভেতরে ঋণখেলাপি, দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ ও টেন্ডারবাজদের লাল গালিচা সংবর্ধনা। এই দ্বিচারিতাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রোগ। আর এবার সেই রোগের বিরুদ্ধে মানুষ নীরব প্রতিরোধে নেমেছে বলেই মনে হচ্ছে।
একদল রাজনীতিক এখনও মনে করেন—মানুষ বোকার মতো সব মেনে নেবে। তারা ভাবেন, কিছু স্লোগান, কিছু আবেগী বক্তব্য, কিছু উন্নয়নের পোস্টার দেখালেই ভোট বাক্স ভরে যাবে। তারা বুঝতে পারেননি—এই দেশ বদলে গেছে। মানুষ বদলে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ আর দর্শক নয়, মানুষ এখন নিরীক্ষক। প্রতিটি নাগরিক এক একটি চলমান আদালত। কে কী বলছে, কে কী করছে—সবকিছুর হিসাব মানুষ রাখছে।
আজ আর মুখের কথায় ভোট পাওয়া যায় না। মানুষ এখন প্রশ্ন করে—আপনার দলের মনোনয়ন তালিকায় কারা আছে? মাদক ব্যবসায়ীরা কোথায়? ঋণখেলাপিরা কোথায়? ভূমিদস্যুরা কোথায়? যারা ব্যাংক লুট করেছে, যারা সরকারি সম্পদ গিলে খেয়েছে, তারা কোন ব্যানারে দাঁড়িয়ে ভোট চাইছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে কোনো ফুলঝুরি আর কাজে আসবে না।
এই বাস্তবতায় যারা এখনও স্বপ্নের গল্প শোনাতে চান, তারা আসলে সেই পুরনো বস্তা পচা রাজনীতির ছকে বন্দী। তাদের অনুর্বর মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে এড়াতে চায়। তারা বুঝতে পারে না যে—বাংলাদেশের মানুষ আর স্বপ্ন দেখতে চায় না, তারা স্বপ্নভঙ্গের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। তারা আর “আগামী পাঁচ বছর” শুনতে চায় না; তারা দশকের পর দশক ধরে চলা বস্তা পচা রাজনীতির হিসাব চায়।
জনগণ এখন রাজনৈতিক দল নয় বরং রাজনৈতিক আমলনামা দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—যারা মাদক, সন্ত্রাস, দখলবাজি, চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজির দৌরাত্ম বন্ধ করতে সাহস দেখাবে, এই দেশ তাদেরই বেছে নেবে। আর যারা এসব অপশক্তিকে লালন-পালন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, তাদের পতন অনিবার্য। বাংলার জনতা এবার নতুন ইতিহাস রচনা করবে।
এই নির্বাচন তাই ক্ষমতার লড়াই নয় বরং এটি একটি সাহসের লড়াই। প্রশ্ন হচ্ছে—কারা সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারবে? কারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিতে পারবে? কারণ বাংলাদেশে রাজনীতিতে সবচেয়ে দুষ্কর কাজ ক্ষমতা নেওয়া নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের উন্মুক্ত বিতর্কের আহ্বান রাজনীতির মাঠে একটি বড় ধাক্কা। এটি সাধারণ কোনো ফেসবুক পোস্ট নয়; এটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ভণ্ডামির ওপর সরাসরি আঘাত। নীতিমালা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কে বসার আহ্বান মানে—রাজনীতিকে অন্ধকার গলি থেকে যুক্তির মাঠে টেনে আনার অদম্য সাহস। আমি মনে করি, এটা তার রাজনৈতিক সততার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—লড়াই হোক ভাবনার, কে এই দেশের মানুষের জন্য ভালো নীতিমালা দিতে পারে তা প্রমাণ করার। এই বক্তব্যে যারা অস্বস্তি বোধ করছেন, তাদের অস্বস্তির কারণ বোঝা কঠিন নয়। কারণ নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক মানে হলো—অতীতের জবাবদিহি, বর্তমানের স্বচ্ছতা আর ভবিষ্যতের স্পষ্ট রূপরেখা। এই তিনটি জিনিসই বাংলাদেশের বহু রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তা কে না জানে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি আবু সাদিক কায়েমের পক্ষ থেকে এই বিতর্ক আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ আরও একটি শক্ত বার্তা বহন করছে। এটি বলে দেয়—তরুণ সমাজ আর অন্ধ আনুগত্যের রাজনীতি মানতে রাজি নয়। তারা প্রশ্ন করতে চায়, তারা শুনতে চায়, তারা বিচার করতে চায়। এই প্রজন্মকে বোকা বানানো যাবে না।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—অন্য রাজনৈতিক দলগুলো কি এই বিতর্কে বসার সাহস দেখাবে? নাকি তারা বরাবরের মতো নীরবতা বেছে নেবে? নীরবতাও এক ধরনের উত্তর। আর রাজনীতিতে নীরবতার অর্থ কৌশল নয় ভীরুতা।
তাই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ব্যালটের লড়াই নয়; এটি সাহস ও সুবিধাবাদের মধ্যে নির্বাচন। একদিকে থাকবে সত্য বলা ও ঝুঁকি নেওয়ার রাজনীতি, অন্যদিকে থাকবে সুবিধামতো কথা বলা আর অতীত লুকানোর রাজনীতি। জনগণ ঠিক এখানেই সিদ্ধান্ত নেবে—তারা কোন বাংলাদেশ চায়।
এ দেশের মানুষ আজ প্রতারণায় ক্লান্ত। তারা আর এমন রাজনীতি চায় না যেখানে মঞ্চে নৈতিকতার কথা বলা হয়, আর পেছনে দুর্নীতির বাজার বসে। তারা এমন নেতৃত্ব চায় যারা ক্ষমতায় গিয়ে প্রথমে নিজেদের লোকদের নয়, আইনের কথা ভাববে। যারা দলের চেয়ে দেশকে অগ্রাধিকার দেবে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—এই নির্বাচনে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যারা দাঁড়াবে, তাদের বিজয় অনিবার্য। যারা অন্যায়, জুলুম ও অবিচারের সঙ্গে আপস করবে, তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এটি কোনো আবেগী স্লোগান নয়, এটি সময়ের নির্মম সত্য।
বাংলাদেশের মানুষ বদলে গেছে—এটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। আর যে রাজনীতি এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হবে, ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না।
সুতরাং জাতির সামনে এখন একটাই প্রশ্ন—আমরা কি আবারও মিথ্যার সাথে আপস করব, নাকি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখাব? আমার বিশ্বাস, এই জাতি এবার সাহসকেই বেছে নেবে। ১২ ফেব্রুয়ারি সত্য ও সাহসের বিজয় অনিবার্য—ইনশাল্লাহ।
লেখক,সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com