গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে যখন খাবারের টেবিলে বসে মানবজমিন অনলাইনের শিরোনামগুলো চোখ বুলাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ একটি খবর আমাকে আশাবাদী করে তুলল। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন—চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার হয়েছে।
বহুদিন ধরে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে জিম্মি করে রাখা এই ব্যাধির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
মুহূর্তেই মনে হলো—এই তো সেই উদ্যোগ, যার জন্য এতদিন ধরে আমি লিখেছি, বলেছি, সতর্ক করেছি। চাঁদাবাজি কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি একটি নীরব মহামারি, যা রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে উন্নয়নের সমস্ত সম্ভাবনাকে গ্রাস করে। সেই আনন্দ নিয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম—আজকের লেখাটি হবে সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। ক্লাব থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই আরেকটি সংবাদ চোখে পড়তেই সেই আশাবাদ মুহূর্তে হতাশায় পরিণত হলো। একটি টকশোতে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিলোফার চৌধুরী মনির একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে—“যাকাতের চেয়ে চাঁদাবাজি ভালো” (আস্তাগফিরুল্লাহ-নাউজুবিল্লাহ)
সংবাদটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিলাম। যেখানে আমি বলেছি,
“মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, বিএনপিকে আওয়ামী লীগের কাতারে নামিয়ে আনার আগেই নিলুফার মনিদের সামলান। আমি মনে করি, এদেশের ধর্মপ্রাণ লক্ষ-কোটি সাধারণ মানুষই বিএনপির আসল শক্তি।
সুতরাং নিলুফার মনিদের মতো আবোল-তাবোল মানুষ বিএনপিতে না থাকলে বিএনপির কিছুই হবে না। বরং সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপি আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, ইনশাল্লাহ।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের একজন নগণ্য সংবাদকর্মী হিসেবে আপনার প্রতিমুহূর্তের অবর্ণনীয় সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করছি। পতিত-পলাতক হাসিনা এবং অথর্ব ইউনুস সরকারের রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আপনি নির্ঘুম সময় পার করছেন। দেশের মানুষ আপনার নেতৃত্বের প্রতি ক্রমশ আরও বেশি আস্থাশীল হয়ে উঠছেন।
এমন পরিস্থিতিতে নিলুফার মনিদের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। তার এই ধরনের আচরণ বিএনপির উদার ইসলামী নীতির চরম লঙ্ঘন বলে আমি মনে করি।
সুতরাং তাকে অবিলম্বে দল থেকে বহিষ্কার এবং গ্রেপ্তার করার জন্য আপনার নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।”
নিলুফার মনির ন্যাক্কারজনক এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় দেশের অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ যেমন বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি ক্ষুব্ধও হয়েছেন। কারণ, যাকাত মুসলমানদের জন্য শুধু একটি দান নয়; এটি একটি ফরজ ইবাদত, একটি নৈতিক-সামাজিক দায়িত্ব, যা সমাজে বৈষম্য কমানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই যাকাতের সঙ্গে চাঁদাবাজির মতো একটি অপরাধের তুলনা—তা যেভাবেই বলা হোক না কেন—এটি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে আঘাত হানতে বাধ্য ।
যাকাত হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ হচ্ছে যথাক্রমে কালিমা, নামাজ, যাকাত, রোজা ও হজ।
সুতরাং নিলুফার মনির এই বক্তব্য এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
এই একটি বাক্য এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ক্লিপ, ফটোকার্ড, আংশিক উদ্ধৃতি—সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জনমত তৈরির উপকরণ হয়ে গেছে। এর ফলে সরকারের চাঁদাবাজিবিরোধী ইতিবাচক উদ্যোগটিও আড়ালে পড়ে গেছে—যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি সরকারের যখন হিমশিম দশা, তখন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এই ধরনের মন্তব্য কি কোনো সাধারণ ভুল? নাকি এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে? ক’দিন আগেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা পুনরোল্লেখ করেছেন। সুতরাং নিলুফার মনি কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সরকারকে বিব্রত করতে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন কিনা, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা একান্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ নতুন নয়, এবং এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়ারও নজির রয়েছে।
প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে, আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনা। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ নিয়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষোভ, দেশের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ এবং ব্যাপক সমালোচনার মুখে তৎকালীন সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
শেখ হাসিনা তখন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। পরবর্তীতে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার যাকে ইসলামবিদ্বেষী সরকার বলা হয়—এমন সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও—সেই সরকার যদি ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ নিয়ে মন্তব্য করার কারণে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারে, তাহলে ইসলামপ্রেমী দল বলে খ্যাত বিএনপি ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্যকারী সংরক্ষিত নারী এমপির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে—সেটি দেখতে মানুষের বিশেষ আগ্রহ থাকা খুবই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজির বাস্তবতা ভয়াবহ। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে পরিবহন,ছোট দোকান, হাট-বাজার, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত—চাঁদাবাজিতে আক্রান্ত। ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন, আর সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত এর মূল্য পরিশোধ করেন দ্রব্যমূল্যের মাধ্যমে। তাই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই।
এই প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। বিএনপি, যারা নিজেদেরকে একটি জনপ্রিয় গণমুখী দল হিসেবে তুলে ধরে, তাদের জন্য এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে তারা কীভাবে সামাল দেয়—সেটিই নির্ধারণ করবে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধের মাত্রা। তবে ঘটনার কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে বিএনপির নীরবতা ধর্মপ্রাণ মানুষকে দারুণভাবে হতাশ করেছে।
এ বিষয়ে বিএনপিকে অবিলম্বে তাদের দলীয় নীরবতা ভাঙা জরুরি বলে আমি মনে করি। প্রথমত, দলীয়ভাবে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া জরুরি। এটি একটি ভুল শব্দচয়ন—এমন ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা রাজনৈতিকভাবে পরিণত আচরণ হবে। এতে করে দলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট নেত্রীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া যেতে পারে। দল থেকে বহিষ্কার করা যেতে পারে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অন্যথায়, যেকোনো ধরনের নীরবতা এখানে সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে—এখনকার যুগে একটি বাক্যই একটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে। মিডিয়া ট্রেনিং, বার্তা নিয়ন্ত্রণ (message discipline) এবং জনসম্মুখে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা—এসব এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ইস্যুটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রতিবাদ, বিবৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা—সবই শুরু হয়েছে। এমনকি ভুয়া উক্তি এবং বিকৃত তথ্য ছড়ানোর ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ফলে এটি শুধু একটি বক্তব্যের বিতর্ক নয়; এটি একটি তথ্যযুদ্ধেও রূপ নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় জনআস্থার। মানুষ যখন দেখে, একদিকে সরকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, আর অন্যদিকে রাজনীতিবিদদের মুখে চরম বিতর্কিত মন্তব্য আসছে—তখন স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই বিভ্রান্তি দূর করা সরকার ও বিএনপি—উভয়ের জন্যই জরুরি।
এখন দেখার বিষয়, বিএনপি কি এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখবে, নাকি এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করবে? তারা কি দ্রুত, দায়িত্বশীল ও পরিণত প্রতিক্রিয়া দেখাবে, নাকি নীরব থেকে বিতর্ককে আরও বড় হতে দেবে? রাজনীতিতে ভুল হতেই পারে, কিন্তু সেই ভুলকে কীভাবে সংশোধন করা হয়—সেখানেই একটি দলের প্রকৃত চরিত্র ফুটে ওঠে।
বিএনপি যদি এক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রাখতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের অনেক চড়া মূল্য গুনতে হতে পারে। বস্তুতপক্ষে নিলুফার মনির এই বেফাঁস মন্তব্যে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে গেছে বিএনপি তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পরিশেষে বলতে চাই, আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি। এই দুই ব্যাধিকে নির্মূল না করে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা নিছক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। তাই রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক দল—সবারই উচিত এই লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা। সুতরাং ঐক্য বজায় রাখার স্বার্থে বিএনপিকে অবিলম্বে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত প্রদানকারী নিলুফার মনিকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপি তথা তারেক রহমানকে এই কঠিন পরীক্ষায় জিততেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com