আজ বুধবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ বুধবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

পোশাকের রং বদল নয়, দরকার নৈতিকতার পুনর্গঠন ও মানোন্নয়ন
আহসান হাবিব বরুন

রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ নয়—এটি নাগরিক আস্থা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির প্রতিফলন। কিন্তু যখন সেই আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বাহ্যিক পরিবর্তনের চকচকে মোড়ক দিয়ে বাস্তব সংকট ঢেকে রাখা যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ইউনিফর্মের রং পরিবর্তনের উদ্যোগ সেই বাস্তবতারই একটি প্রতীকী উদাহরণ।

গাঢ় নীল ও হালকা অলিভ বা জলপাই রঙের সংমিশ্রণে নতুন ইউনিফর্ম চালুর প্রস্তাবকে কর্তৃপক্ষ পেশাগত গাম্ভীর্য ও সদস্যদের সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিবর্তন কি পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে? নাকি এটি কেবল একটি দৃশ্যমান সংস্কার, যার আড়ালে অদৃশ্য সমস্যাগুলো রয়ে যাবে আগের মতোই?

এখানে আরেকটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে—সরকার বদল মানেই পুলিশের পোশাকের রং বদল। এ যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। মাত্র ক’মাস আগেই সরকার রং বদল করেছিল। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারও এই রং বদলের চর্চা থেকে বের হতে পারেনি।প্রশ্ন হচ্ছে, এই রং বদলের খেলাটা কার স্বার্থে? বাস্তবতা হচ্ছে, পোশাকের এই রং বদলের সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষের পকেটের রংও বদলে যায়, অর্থাৎ পকেট ভরে ওঠে।

ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের সরবরাহ, ক্রয় এবং পরিবর্তনের সঙ্গে প্রায়শই একটি আর্থিক প্রবাহ জড়িত থাকে, যার পুরোটা স্বচ্ছ নয়। যে জনগণের টাকায় বার বার এই রং পরিবর্তন, অথচ সেই জনগণের সেবার মানে কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই—এ এক নির্মম বৈপরীত্য। যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে একটি প্রশ্ন উঠেই যায় যে,পোশাকের রংবদলে মানুষের প্রতি পুলিশের আচরণে কি কখনো পরিবর্তন এসেছে? থানায় গিয়ে সাধারণ মানুষ কি আগের চেয়ে বেশি সম্মান, নিরাপত্তা বা ন্যায়বিচার পাচ্ছে? যদি তা ‘না’ হয়, তবে এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয় একটি কাজ। সুতরাং, জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকায় এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর পুলিশের ভেতরে যে অস্থিরতা ও অপেশাদারিত্বের সূচনা হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। শৃঙ্খলা, কমান্ড চেইন এবং দায়িত্ববোধ—এই মৌলিক বিষয়গুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বাহিনী কার্যত অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অচলাবস্থার ছাপ স্পষ্ট—যা কোনোভাবেই একটি রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রায় ৯,০০০ এএসআই নিয়োগের উদ্যোগ আরও বিস্ময় তৈরি করে। পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতর থেকেই যখন বলা হচ্ছে যে এই মুহূর্তে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের তেমন প্রয়োজন নেই, তখন এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় সেটি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। তাহলে বর্তমান সরকার কেন আবারও সেই একই পথে হাঁটছে?

এখানে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে—সংখ্যা বাড়ানো কি সমাধান, নাকি মান উন্নয়ন? একটি বাহিনীর কার্যকারিতা নির্ভর করে তার সদস্যসংখ্যার ওপর নয়, বরং তাদের দক্ষতা, সততা এবং পেশাদারিত্বের ওপর। যদি বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে নতুন নিয়োগ কেবল সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলবে।

বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট আজ নৈতিকতার সংকট। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার—এই ত্রিমুখী চাপে পেশাদারিত্ব বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে প্রভাবশালী মহলের ইচ্ছাই প্রাধান্য পায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি হয়—যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার। প্রথমত, পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে—শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও। তৃতীয়ত, একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অনিয়মের দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয়।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ধারণাটিকেও নতুনভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনা, তাদের আস্থা অর্জন করা এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করা—এসবই একটি আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগগুলো অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। এগুলোকে কার্যকর করতে হলে মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়ন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোর সবকিছুর কেন্দ্রে থাকতে হবে নৈতিকতা। কারণ প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষণ কোনো কিছুই একজন অসৎ কর্মকর্তাকে সৎ করে তুলতে পারে না, যদি তার ভেতরে সেই মূল্যবোধ না থাকে।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, পুলিশের অবস্থান এখন সম্পূর্ণরূপে তার বিপরীতমুখী। সময়ের পরীক্ষায় নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ, অসাধারণ সৎ ও মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তারাই এখন কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছেন বলে গণমাধ্যমে নিয়মিত খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

সম্প্রতি পুলিশের আইজিপি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, পুলিশের ৯৯ শতাংশ সদস্যই সৎ। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের কত শতাংশ মানুষ আইজিপির বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন? প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং এতে জন আস্থার সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠে এবং বাহিনীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এ ধরনের অবাস্তব মন্তব্য করা মোটেও সমীচীন নয় বলে আমি মনে করি।

আরেকটি নির্মম বাস্তবতা আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ, বাসস্থান ও কল্যাণের বিষয়টিও দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, মানসিক চাপ—এসব কারণে অনেক সময় তাদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই তাদের জন্য একটি মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ন্যায্য বেতন, ভালো বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক সহায়তা—এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। এতে আমার নূন্যতম সন্দেহ নেই।

পরিশেষে একটি কঠিন কিন্তু সত্য কথা বলা জরুরি—পোশাকের রং বদলে পুলিশের ভাবমূর্তি বদলানো যায় না। বরং যখন বারবার এই ধরনের বাহ্যিক পরিবর্তন দেখা যায়, তখন এটি জনগণের চোখে এক ধরনের বিভ্রান্তি বা অগ্রাধিকারহীনতার প্রতীক হয়ে উঠে।
কারণ, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কোনো বাহিনীর পোশাকে নয়, বরং সেই বাহিনীর ন্যায়পরায়ণতা, সততা এবং মানবিকতায় নিহিত থাকে।সুতরাং পোশাকের রং নয়—নৈতিকতার পুনর্গঠনই হোক প্রধান লক্ষ্য।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin