আজ সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

মায়ের ভাষার মর্যাদা চাই

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয় বরং ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও আত্মার গভীরতম প্রকাশ। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জাতি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে, ভূখণ্ডের জন্য লড়েছে, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছে। কিন্তু একটি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। আমরা গর্ব করে বলতে পারি—বাংলা ভাষার জন্য রক্তদানকারী জাতি হিসেবে আমরা অনন্য।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছিল। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে এককভাবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলাভাষী জনগণের প্রতিবাদ ছিল আত্মপরিচয়ের লড়াই। ঢাকার রাজপথে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অগণিত তরুণ জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন—মায়ের ভাষা কেড়ে নেওয়া যায় না।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাংলাভাষী। তবু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতিফলন। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন—“উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এই ঘোষণা বাঙালির চেতনায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্রদের শহীদ হওয়া ছিল বাঙালির ভাষাগত আত্মমর্যাদার রক্তাক্ত অধ্যায়। এই আত্মত্যাগের ফলেই ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় বাংলা।

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হচ্ছে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষিক শিক্ষার স্বীকৃতি হিসেবে। এটি কেবল বাংলাদেশের অর্জন নয় বরং এটি মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক অধিকারের এক অনন্য স্বীকৃতি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, যে ভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি, সেই ভাষার চর্চায় আমরা এখনো যথেষ্ট যত্নবান নই। শহরের অভিজাত স্কুলগুলোতে বাংলাকে প্রায় অবহেলিত করে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাকে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলার বদলে ইংরেজিতে স্ট্যাটাস দেওয়াকে অনেকেই আধুনিকতার নিদর্শন মনে করেন।

বাংলাদেশের অফিস-আদালতে এখনো ইংরেজি ভাষার আধিপত্য দৃশ্যমান। উচ্চ আদালতের রায়, চুক্তিপত্র, দাপ্তরিক চিঠিপত্র—সবখানেই ইংরেজির প্রাধান্য আমাদের ভাষাগত আত্মসম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে আমরা পিছিয়ে। এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয় বরং এটি মানসিক ঔপনিবেশিকতার প্রতিফলন বলে আমি মনে করি।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতে ইংরেজির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ইংরেজির গুরুত্ব স্বীকার করতে গিয়ে কি আমরা বাংলাকে অবহেলা করব? একটি ভাষা শেখা আর নিজের ভাষাকে তুচ্ছ করা এক জিনিস নয়।

জাপান, ফ্রান্স বা চীন—তারা আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষ হলেও নিজেদের ভাষাকে প্রশাসন ও শিক্ষার মূলভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাও একটি সমৃদ্ধ ভাষা। হাজার বছরের সাহিত্য-ঐতিহ্য, কাব্য, সংগীত, দর্শন, গবেষণা—সব মিলিয়ে বাংলা একটি পরিপূর্ণ জ্ঞানভাষা। কাজেই বাংলা ও ইংরেজিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের চিন্তা, শিক্ষা ও বিনোদনের বড় অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতায় বাংলা ভাষার চর্চা নতুন মাত্রা দাবি করে। বাংলা কনটেন্ট, গবেষণা, বিজ্ঞানভিত্তিক বই, প্রযুক্তিগত অনুবাদ—এসব ক্ষেত্রে আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

শিশুদের প্রথম শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়া উচিত—এ কথা বহু গবেষণায় প্রমাণিত। মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ শিশুর বোধগম্যতা ও সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করে। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পরিবারেও ভাষাচর্চার পরিবেশ তৈরি জরুরি। বাবা-মা যদি সন্তানদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলাকে আধুনিকতার চিহ্ন মনে করেন, তবে শিশুর মনে বাংলার প্রতি দূরত্ব তৈরি হবে। ভাষার মর্যাদা শুরু হয় ঘর থেকেই।

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের বিষয়টি কেবল আবেগ নয় বরং এটি গণতান্ত্রিক অধিকার। সাধারণ নাগরিক যেন আদালতের রায়, সরকারি নোটিশ বা আইন নিজের ভাষায় বুঝতে পারেন—এটি এটি একটি মৌলিক দাবি বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত। সুতরাং সকল অফিস-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রযুক্তির এই যুগে বাংলা টাইপিং, সফটওয়্যার ও অনুবাদব্যবস্থা উন্নত করা কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা ও নীতিগত দৃঢ়তা।

প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, প্রভাতফেরিতে অংশ নিই, ভাষা শহীদদের স্মরণ করি। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ভাষার মর্যাদা কতটুকু?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু অতীতের গৌরব নয় বরং এটি বর্তমানের দায় ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। বিশ্বের বহু ক্ষুদ্র ভাষা বিলুপ্তির পথে।

ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা করা মানবসভ্যতার দায়িত্ব। আমরা যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, আমাদের এই দায় আরও বড়।

শেষ কথা:
মায়ের ভাষা আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। আমরা একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি—এ গর্ব যেমন আমাদের শক্তি, তেমনি এটি আমাদের দায়বদ্ধতার স্মারক।
ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা—আমরা শিখব, দক্ষ হব, বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করব। কিন্তু নিজের ভাষাকে অবহেলা করে নয়। বাংলা হবে প্রশাসনের ভাষা, শিক্ষার ভাষা, বিচারব্যবস্থার ভাষা এবং হৃদয়ের ভাষা।
আসুন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা অঙ্গীকার করি—
বাংলা ভাষার চর্চায় যত্নবান হব,
অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের দাবি জোরদার করব,
পরবর্তী প্রজন্মকে ভাষার ইতিহাস ও গৌরব শেখাব,
এবং মায়ের ভাষাকে সত্যিকারের মর্যাদা দেব। রক্তের ঋণ কেবল স্মৃতিতে নয়, চর্চায় শোধ করতে হয়। সুতরাং মায়ের ভাষার মর্যাদা চাই—আজ, আগামীকাল এবং মহাকাল।

লেখক:সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin