একদিন ভোরবেলা এক লোক মাথাব্যথা নিয়ে গ্রামের এক কবিরাজের কাছে গেলেন। সারারাত যন্ত্রণায় ঘুম হয়নি। চোখ লাল, কপাল গরম, মুখে অস্থিরতা। লোকটি কাতর গলায় বলল, “কবিরাজ সাহেব, মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে। একটু ওষুধ দেন।”
বৃদ্ধ কবিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন, “চিকিৎসা করতে অনেক সময় লাগবে। ওষুধ লাগবে, ধৈর্য লাগবে, নিয়ম মানতে হবে। তারচেয়ে সহজ সমাধান আছে।”
লোকটি আশায় বুক বাঁধল। ভাবল, কবিরাজ সাহেব নিশ্চয়ই কোনো মহৌষধের কথা বলবেন। কিন্তু কবিরাজ ধীরে ধীরে বললেন, “মাথাব্যথা যখন মাথাতেই, তাহলে মাথাটাই কেটে ফেলো! ব্যথাও থাকবে না, চিকিৎসার ঝামেলাও থাকবে না।” চারপাশের মানুষ হেসে উঠলেও লোকটির মুখ শুকিয়ে গেল। কারণ সে বুঝেছিল—এটা চিকিৎসা নয়, এটা সমস্যার কাছে আত্মসমর্পণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শিল্প ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের সরকারের আচরণ এখন অনেকটা সেই বৃদ্ধ কবিরাজের পরামর্শের মতো হয়ে উঠছে। কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে গেলেই সেটিকে আধুনিকায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা কিংবা দুর্নীতি-সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা নয়; বরং সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে বিক্রি করে দেওয়ার পথ। যেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানকে সুস্থ করা নয়, বরং “লোকসান” নামের অজুহাতে জনগণের সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় তুলে দেওয়া।
আর এই পথেই বারবার জন্ম নিয়েছে সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী আর রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে ওঠা এক নব্য ধনকুবের ও সুবিধাভোগী শ্রেণি।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান আগামী দুই বছরের মধ্যে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হবে। যুক্তি একটাই—এসব প্রতিষ্ঠান লোকসানি, আর তাদের দখলে হাজার হাজার বিঘা জমি অলস পড়ে আছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব জমিতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি গতিশীল হবে। কথাগুলো শুনতে নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে আশ্বস্ত করে না; বরং গভীরভাবে আতঙ্কিত করে। কারণ, এই দেশে “লোকসানি প্রতিষ্ঠান” শব্দবন্ধটি বহুবার ব্যবহার হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। কিশোরগঞ্জের কালিয়াচাপড়া চিনিকল—একসময় ওই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। শত শত শ্রমিক, আখচাষি এবং তাদের পরিবার এই মিলকে ঘিরে জীবন গড়ে তুলেছিল। অথচ ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই চিনিকলটি কয়েকশ একর জমিসহ নামমাত্র মূল্যে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়। নিটোল গ্রুপের মালিক মতলব আহমেদের কাছে মিলটি বিক্রি করা হয়েছিল সম্ভবত সাড়ে চার কোটি টাকায়। বর্তমানে ওই জমির বাজারমূল্য কয়েকশ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
অথচ সেই সময়ও শুধু জমির বাজারমূল্যই ছিল প্রায় শত কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু একটি কারখানা বিক্রি করেনি; জনগণের ভবিষ্যৎ, কৃষকের ভরসা এবং জাতীয় সম্পদকে কার্যত পানির দরে তুলে দিয়েছে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে।
তখন বলা হয়েছিল, চিনিকলটি লোকসানে চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—লোকসানের জন্য দায়ী কে? শ্রমিক? কৃষক? নাকি সেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কাঠামো, যারা বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করে তুলেছিল?
আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এ ধরনের বিক্রির পেছনে প্রায়শই সক্রিয় থাকে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, দালালচক্র এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অংশ মিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করে, দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত শত শত কোটি টাকার সম্পদ কয়েক কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয়। রাষ্ট্র বঞ্চিত হয় তার ন্যায্য সম্পদ থেকে, আর রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে ওঠে নতুন ধনকুবের শ্রেণি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের ঘটনাটি তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় এক যুগ আগে বিপুল সম্পত্তিসহ এই মিলটিকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান আখ্যা দিয়ে মাত্র পাঁচ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয় একটি শিল্পগোষ্ঠীর কাছে। অথচ সেই সময় জমির প্রকৃত মূল্যই ছিল কয়েকশ কোটি টাকা।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার কি সত্যিই লোকসান কমাতে চায়, নাকি রাষ্ট্রীয় সম্পদ স্থানান্তরের একটি পুরনো রাজনৈতিক অর্থনীতি আবারও সক্রিয় হচ্ছে?
যেখানে সরকারপ্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকারে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কেন উল্টো পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে—সেই প্রশ্ন এখন জনমনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ সত্যিই দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ভুগছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অদক্ষতা, রাজনৈতিক নিয়োগ, দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং বাজার-সংকটের কারণে সমস্যায় আছে। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো কী করেছে? তারা কি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছে?
চীন তার রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলোকে আধুনিকায়ন করেছে। মালয়েশিয়া পুনর্গঠন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করেছে। এমনকি ইউরোপের বহু দেশ লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে গবেষণা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সংস্কারের মাধ্যমে লাভজনক করেছে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন সেই পথ বেছে নিচ্ছে না? কারণ চিকিৎসা করতে ধৈর্য লাগে; কিন্তু বিক্রি করে দিতে শুধু একটি ফাইল সই করলেই হয়।
সরকার বলছে, হাজার হাজার বিঘা জমি অলস পড়ে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই জমি অলস রাখার দায় কার? রাষ্ট্র যদি বছরের পর বছর কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ না করে, আধুনিক প্রযুক্তি না আনে, দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে, রাজনৈতিক নিয়োগে প্রতিষ্ঠান ভরে ফেলে—তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান তো অচল হবেই। এরপর সেটিকে “লোকসানি” আখ্যা দিয়ে বিক্রি করে দেওয়া খুব সহজ।
এ যেন ইচ্ছাকৃতভাবে একজন রোগীকে ওষুধ না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া, তারপর বলা—“রোগী তো বাঁচবে না, তাই অঙ্গ বিক্রি করে দাও।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের মূল আকর্ষণ কারখানা নয়—জমি। ঢাকার আশেপাশে, জেলা শহরগুলোতে কিংবা শিল্পাঞ্চলে থাকা সরকারি মিল-কারখানাগুলোর জমির বর্তমান বাজারমূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা। ফলে শিল্পের চেয়ে জমিই হয়ে ওঠে আসল টার্গেট।
যখন কোনো শিল্পগোষ্ঠী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেখানে নতুন শিল্প গড়ে ওঠে না। বরং ধীরে ধীরে জমির ব্যবহার বদলে যায়। আবাসন, শপিং কমপ্লেক্স, গুদাম কিংবা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে ওঠে। অর্থাৎ শিল্পায়নের নামে শেষ পর্যন্ত শিল্পই হারিয়ে যায়।
সরকারের যুক্তি—বেসরকারি মালিকানায় গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা চাকরি হারায়। স্থানীয় অর্থনীতি ধসে পড়ে। কৃষক তার বাজার হারায়। রাষ্ট্র হারায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পদ।
আজ যখন বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, যখন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে, তখন সরকারের উচিত নতুন শিল্পাঞ্চল তৈরি করা, অব্যবহৃত খাসজমি ব্যবহার করা, অবকাঠামো উন্নত করা এবং লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক দক্ষতার সহায়তা নেওয়া।
কিন্তু সরকার যদি সহজ পথ বেছে নেয়—অর্থাৎ বিক্রি—তাহলে জনগণের মনে সন্দেহ জাগবেই। কারণ বাংলাদেশের মানুষ অতীত দেখেছে। তারা জানে, “লোকসান” শব্দটি অনেক সময় শুধু একটি অজুহাত। এর আড়ালে থাকে জমির খেলা, কমিশনের খেলা এবং প্রভাবশালীদের স্বার্থের রাজনীতি।
আর যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করতেই হয়, তাহলে প্রথম শর্ত হওয়া উচিত পূর্ণ স্বচ্ছতা। আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে। উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে হবে। সংসদীয় তদারকি থাকতে হবে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে নজরদারির সুযোগ দিতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিক্রির আগে প্রমাণ করতে হবে যে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করার সব পথ সত্যিই শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে প্রায়শই উল্টোটা ঘটে। আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিক্রি করার, তারপর তৈরি করা হয় লোকসানের গল্প। এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটও বটে।
কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো জনগণের সম্পদ। যে জমিতে একটি চিনিকল দাঁড়িয়ে আছে, সেটি শুধু ইট-পাথরের কারখানা নয়; সেখানে শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের স্বপ্ন, একটি অঞ্চলের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগ জড়িয়ে আছে।
আজ যদি সরকার আবারও সেই পুরনো পথে হাঁটে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো একদিন প্রশ্ন তুলবে—কেন বাংলাদেশ নিজের শিল্পভিত্তি ধ্বংস করেছিল? কেন রাষ্ট্র নিজেই নিজের সম্পদ বিক্রির দালালে পরিণত হয়েছিল?
পরিশেষে বলা যায়, সেই গ্রাম্য কবিরাজের মতো মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলাই সবচেয়ে সহজ সমাধান। কিন্তু সেটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হলো রোগ নির্ণয় করা, চিকিৎসা করা, সংস্কার করা এবং জনগণের সম্পদ রক্ষা করা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের সম্পদ বিক্রি করা নয়; বরং সেগুলোকে রক্ষা, পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তিতে দাঁড় করানো। সুতরাং জনস্বার্থ রক্ষায় সরকারকে সেই পুরোনো নীতি থেকে ফিরে আসতেই হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com