বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে পরাশক্তির ভুল হিসাব-নিকাশ নতুন কিছু নয়। কিন্তু কিছু ভুল এমন হয়, যা শুধু একটি যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে না—বরং একটি রাষ্ট্রের কৌশলগত ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। আজকের ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঠিক তেমনই এক সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সামরিক শক্তির অহংকার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং মিত্র রাষ্ট্রের প্রভাব মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বিপজ্জনক বাস্তবতা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি শুরু থেকেই ছিল আক্রমণাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই নীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিশেষ করে ইসরাইল-এর কৌশলগত ইন্ধনে ইরান-এর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে জয়ের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতির হিসাবই বড় হয়ে উঠছে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং তথ্যের অসামঞ্জস্য। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-এর অবস্থান এই সংকটের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
পেন্টাগনের তথ্য নিয়ে তার বারবার প্রশ্ন তোলা কেবল একটি প্রশাসনিক মতভেদ নয়; এটি আসলে যুদ্ধের বাস্তবতা বনাম প্রচারণার দ্বন্দ্ব। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সামরিক নেতৃত্ব যে “সাফল্যের গল্প” তুলে ধরছেন, তা কতটা বাস্তব—এই প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডলে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, তথ্যের এই বিকৃতি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ-এর সময় সরকার যেভাবে যুদ্ধের বাস্তবতা আড়াল করেছিল, তার ফল ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়। একইভাবে ইরাক যুদ্ধ-এর ক্ষেত্রেও “গণবিধ্বংসী অস্ত্র”-এর অজুহাতে যে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
ইরান যুদ্ধেও যেন সেই একই চিত্র পুনরাবৃত্তি হচ্ছে—বরং আরও জটিল আকারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা করেছিল, তা বাস্তবে রূপ পায়নি। বরং মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নই বলছে, ইরান এখনো তার সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ক্ষমতা, নৌ কৌশল এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে তাদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
এর ফলে যুদ্ধটি আর কেবল সামরিক সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধেও রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্বব্যাপী।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার। আধুনিক যুদ্ধে শুধু শক্তিশালী অস্ত্র থাকা যথেষ্ট নয়—তা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করার সক্ষমতাও থাকতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করে ফেলেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মজুদের অর্ধেকেরও বেশি শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বড় কৌশলগত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে: যদি এখনই আরেকটি বড় সংঘাত শুরু হয়—ধরা যাক চীন, রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে—তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি করবে? এর উত্তর এখন আর এতটা স্পষ্ট নয় বলেই মনে হচ্ছে।
এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো আইনি ও সাংবিধানিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সদ্য যে ভোটাভুটি হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে—দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই এখন গভীর দ্বিধা কাজ করছে। ১৯৭৩ সালের War Powers Resolution অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট কোনো যুদ্ধে সেনা পাঠালে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে বাধ্য।
কিন্তু সেই সময়সীমা ঘনিয়ে আসার পরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আইনি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সিনেটে প্রস্তাব পাস না হওয়া, দলীয় বিভাজন, এমনকি একই দলের ভেতরেও মতবিরোধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কি কেবল নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে, নাকি জনগণের প্রতিনিধিদের মতামতও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে?
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মতামত এই পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, করদাতাদের অর্থের অপচয়—এসবের প্রভাব সরাসরি জনগণের ওপর পড়লেও তাদের কণ্ঠস্বর সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই যুদ্ধ একটি কৌশলগত প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফল বেশি।
২০২৮ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের চেষ্টা, মিত্র রাষ্ট্রের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ—সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই অনিরাপদ করে তুলছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বাড়ছে, অস্ত্রভাণ্ডার কমছে, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভেঙে পড়ছে। এই চারটি উপাদানই একটি পরাশক্তির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সবচেয়ে বড় কথা, এই যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট “এগজিট স্ট্র্যাটেজি” নেই। কীভাবে এবং কখন এই সংঘাত শেষ হবে—তার কোনো পরিষ্কার রূপরেখা নেই।
ফলে এটি একটি অন্তহীন সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা সহজ নয়—এটি ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক জোট এবং অসম যুদ্ধ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে—শুধু সামরিক শক্তি নয়, সঠিক তথ্য, কৌশলগত ধৈর্য এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই তিনটির সমন্বয় না থাকে, তাহলে পরাশক্তির শক্তিই তার দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। আর আজকের বাস্তবতায় মনে হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেই পথেই হাঁটছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com