মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা রাশেদ মিয়া একসময় হাসিমুখে বাজারে যেতেন। বিক্রেতার সঙ্গে দরাদরি করতেন, মাঝে মাঝে বাড়তি এক মুঠো শাকও পেতেন। কিন্তু আজকাল বাজার মানেই তার কাছে এক অজানা ভয়। গতকালই গিয়েছিলেন—বেগুনের দাম শুনে হাত কেঁপে উঠেছিল, করলার দাম জিজ্ঞেস করেই আর দাঁড়াতে পারেননি। মাছের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ, তারপর নিঃশব্দে চলে এসেছেন। বাড়ি ফিরে ছেলেকে বলেছিলেন, “আজ মাছ পাইনি বাবা”—কিন্তু সত্যটা তিনি নিজেই জানেন।
এই শহরে রাশেদ মিয়ার মতো হাজারো মানুষ আছেন—যারা গরিব নন, আবার স্বচ্ছলও নন। তারা সেই মধ্যবিত্ত, যারা স্বপ্ন দেখে, কিন্তু প্রতিদিন সেই স্বপ্নের সঙ্গে আপস করে বাঁচে। তারা কারও কাছে হাত পাততে পারে না, আবার নিজেদের চাহিদাও পূরণ করতে পারে না। প্রতিটি দিন তাদের কাছে এক নতুন হিসাব—কোনটা কিনবেন, কোনটা ছাড়বেন।
আজকের নিত্যপণ্যের বাজার যেন সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এক নির্মম পরীক্ষার নাম। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের প্রতিটি পণ্যের দামও যেন লাগামহীন হয়ে উঠেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি—সবকিছুই ধীরে ধীরে তাদের নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছে। বাজারে গিয়ে অনেকেই বলেন, “মনে হচ্ছে অন্য দেশে চলে এসেছি”—কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশ বদলায়নি; বদলে গেছে জীবনের সমীকরণ।
এই গল্প শুধু রাশেদ মিয়ার নয়—এটি আজকের বাংলাদেশের অসংখ্য গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নীরব আর্তনাদ। আর এই আর্তনাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন সত্য—নিত্যপণ্যের পাগলা ঘোড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।
এই দিশেহারা বাস্তবতার পেছনে সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। বাংলাদেশের মতো একটি সড়কনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার প্রাণশক্তি। কৃষকের ক্ষেত থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পণ্য পরিবহন করতে জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়া মানেই পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, আর সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সীমিত আয়ের মানুষের রান্নাঘরে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দূরপাল্লার ট্রাক ভাড়ায় কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যে পণ্য তুলনামূলক কম খরচে ঢাকায় আসত, এখন সেই একই পণ্য পরিবহনে দ্বিগুণ ব্যয় হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গরমের প্রভাব—সবজি দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বাজারে একটি কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে, যার ভার বহন করছে সাধারণ মানুষ।
তবে শুধু জ্বালানি খরচই এই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে যে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, সেটিও এই সংকটকে গভীর করেছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এখানে বড় একটি বিষয়। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ শহরের বাজারে সেই পণ্যই চড়া দামে বিক্রি হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক স্তরের দালাল থাকায় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, কেবলমাত্র কারওয়ান বাজার থেকেই প্রতিদিন চাঁদ ওঠে প্রায় কোটি টাকা।
এখানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়—গ্রামের কৃষক কষ্ট করে ফসল ফলান, কিন্তু লাভ পান না; শহরের ক্রেতা উচ্চ দামে কিনে ক্লান্ত, কিন্তু তারও কোনো বিকল্প নেই। মাঝখানে কিছু মানুষের হাতেই জমা হয় অতিরিক্ত মুনাফা। এই ব্যবস্থাটি শুধু অস্বচ্ছই নয়, এটি অন্যায়ও—যেখানে পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য হারিয়ে যায়, আর বাজার হয়ে ওঠে একটি অনিয়ন্ত্রিত খেলার মাঠ।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক পণ্যের দাম কমার খবর পাওয়া গেলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। এর পেছনে অন্যতম কারণ ডলারের উচ্চমূল্য ও আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি। বাংলাদেশ যেহেতু ভোজ্যতেল, ডাল, গমসহ অনেক নিত্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই ডলারের দামের ওঠানামা সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলে।
আমদানিকারকরা বেশি দামে পণ্য কিনে আনলে, সেই চাপ আবার খুচরা বাজারে পড়ে।
এছাড়া সময়মতো আমদানি না হওয়া, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়ের অভাব এবং বাজার তদারকির দুর্বলতাও এই অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যাতে দাম বাড়ানো যায়। এই ধরনের অনৈতিক চর্চা বাজারকে আরও অস্থির করে তোলে।
মাছ ও মাংসের বাজারও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। গরুর মাংস, খাসির মাংস, মাছ—সবকিছুর দামই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে, বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টিতে। বর্তমানে দেশব্যাপী হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এর অন্যতম কারণ হচ্ছে শিশুদের অপুষ্টি।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এই পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। তারা সমাজের এমন একটি স্তর, যারা নিজের মর্যাদা বজায় রেখে চলতে চায়। তারা সাহায্য চাইতে পারে না, আবার সব চাহিদা পূরণ করাও সম্ভব হয় না। ফলে তাদের জীবন হয়ে ওঠে এক নীরব সংগ্রাম। প্রতিদিনের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া—সবকিছু মিলিয়ে তারা এক অদৃশ্য চাপের মধ্যে বসবাস করেন।
এই চাপ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মানসিকও। পরিবারের ভেতরে অশান্তি বাড়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।
দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান দুরবস্থার জন্য পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার আমলের বেশুমার লুটপাটই প্রধানত দায়ী। এই সত্য অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু যখন সেই মানুষগুলোই বাঁচার লড়াইয়ে হেরে যেতে বসে, তখন উন্নয়নের সেই গল্প প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি?
প্রথমত, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পণ্যের সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে, যাতে কোথায় কীভাবে দাম বাড়ছে তা চিহ্নিত করা যায়। প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যা বাজারকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ করবে। তবে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে কোনো উদ্যোগই সুফল বয়ে আনবে না।
দ্বিতীয়ত, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও রেফ্রিজারেটেড পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুললে পণ্যের অপচয় কমবে এবং সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
তৃতীয়ত, কৃষকদের সরাসরি বাজারে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষক বাজার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সমবায় ভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থা চালু করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হবেন।
চতুর্থত, আমদানি নীতিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে দ্রুত পণ্য আমদানি করা গেলে দেশের বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ডলার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনাও জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। কারণ রাশেদ মিয়ার মতো হাজারো মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—অর্থনীতির সূচক যতই উন্নত হোক, যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ না হয়, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ এবং অর্থহীন।
সুতরাং যে কোনো মূল্যে বাজারের এই পাগলা ঘোড়াকে লাগাম পরাতেই হবে। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনীতির গ্রাফে নয়—বরং মানুষের মুখের হাসিতে ফুটে ওঠে। আর সেই হাসি যদি ম্লান হয়ে যায়, তবে সব অগ্রগতিই অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে,নিত্য পণ্যের পাগলা ঘোড়ায় দিশেহারা মানুষের বাঁচার উপায় কি?
লেখক:সাংবাদিক-কলামিস্ট ও সম্পাদক,আমার দিন,ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com