আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

নতুন সরকারের হালচাল: ইতিবাচক অগ্রগতি, নাকি বিতর্কের ছায়া?

সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার কিছু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, আবার কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—সরকার একদিকে পরিবর্তনের বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ সেই ঘোষিত পরিবর্তনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে হচ্ছে।
ফলে এই সময়কালটিকে বলা যায় সম্ভাবনা ও প্রশ্নের মধ্যবর্তী এক বাস্তবতা।

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারপ্রধান তারেক রহমান প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কিছু প্রতীকী পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করছেন, নিরাপত্তা প্রটোকল অনেকাংশে কমিয়েছেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার আনুষ্ঠানিকতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
বিদেশ সফরে যাত্রা বা দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সীমিত করার সিদ্ধান্তও প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে সহজ ও মানবিক করার একটি বার্তা বহন করে।
এই ধরনের পদক্ষেপ হয়তো প্রশাসনিক কাঠামোকে একদিনে বদলে দেয় না, কিন্তু ক্ষমতার চর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে ই-হেলথ কার্ড, কৃষি কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্যে ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা নাগরিকদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কৃষি কার্ড কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার একটি আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এছাড়া আজ উদ্বোধিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারপ্রধান কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন যা ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, তাদের বাসায় গিয়ে দেখা করা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের নেতাদের সঙ্গে ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক সৌজন্যের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি ইফতার আয়োজন সীমিত করার সিদ্ধান্তকেও অনেকেই বাস্তববাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী আকস্মিকভাবে বিভিন্ন দপ্তর পরিদর্শন করছেন। এই ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ প্রশাসনের কর্মক্ষমতা বাড়ানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক অবসর এবং ওএসডি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনে এই বিষয়টি তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনেকের অভিযোগ—শুধু পূর্ববর্তী সরকারের সময় চাকরি করেছেন এই কারণে কিছু কর্মকর্তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

অথচ বাস্তবতা হলো, পুলিশের ভেতরে এমন বহু কর্মকর্তা আছেন যারা দীর্ঘদিন সততা, পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেও বলা যায়—এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা দুই দশক ধরে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন কিন্তু পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সময়ে নানা কারণে বঞ্চিত হয়েছেন, কোণঠাসা থেকেছেন এবং কখনো কখনো অযৌক্তিকভাবে অপবাদও সহ্য করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় পুলিশ সদর দপ্তরের মানবসম্পদ বিভাগের ডিআইজি কাজী জিয়াউদ্দিন–এর নাম। দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করা এই কর্মকর্তা অসাধারণ মেধা,সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত।

একইভাবে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের রাজনৈতিক শাখার সাবেক ডিআইজি নাফিউল ইসলাম–কে ওএসডি করা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের আরেকজন মেধাবী কর্মকর্তা সোহেল রানা দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ স্টাফ কলেজে বদলি অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়াও ডিআইজি মুনিবুর রহমান–এর মতো কর্মকর্তাদের অনেকেই পেশাদারিত্ব, সততা এবং নৈতিকতার জন্য পরিচিত।

এই ধরনের কর্মকর্তারা সাধারণত ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে কাজ করেন না; তারা কাজ করেন নীতি, বিবেক এবং পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে। প্রকৃত অর্থে একটি রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে ওঠে এই ধরনের কর্মকর্তাদের ওপর ভিত্তি করেই।

সমালোচকদের মতে, পুলিশের ভেতরে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী রয়েছে যারা পূর্ববর্তী সময়ে দুর্নীতি ও প্রভাবের মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল। সেই গোষ্ঠীর কিছু সদস্য এখন আবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করছে।
অভিযোগ রয়েছে—যারা অতীতে দুই হাতে দুর্নীতি করেছে তারাই এখন নিজেদেরকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে এবং সেই সঙ্গে সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা শুধু পুলিশের ভেতরে নয়, জনগণের মধ্যেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একজন ব্যবসায়ীকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
যোগাযোগ, সেতু, রেল ও নৌ-পরিবহন দপ্তরের দায়িত্বে থাকা শেখ রবিউল আলম–এর কিছু মন্তব্যও সরকারের ভাবমূর্তিকে বিব্রত করেছে।

অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান–এর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার এবং তার স্মৃতি ফলকে শ্রদ্ধা নিবেদনে বাধা দেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্ন তুলেছে।

এছাড়া কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির জামিন পাওয়ার ঘটনাও জনমনে সমালোচনা সৃষ্টি করেছে।

চলতি রমজান মৌসুমে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের সীমিত সাফল্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেষ কথা:
সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। সরকার ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ নিয়েছে—সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, প্রশাসনিক সরলতা এবং রাজনৈতিক সৌজন্যের বার্তা দিয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে প্রশাসনিক অপসারণ, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার অভিযোগ সেই ইতিবাচক বার্তাকে আংশিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।
তারেক রহমান যে পরিবর্তনের কথা বলছেন, সেই পরিবর্তন বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশাসনে ন্যায়বিচার, পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
কারণ সত্যিকারের পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক ভাষণে নয়—রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়। আর সেই পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে ওঠে সৎ, মেধাবী এবং নীতিবান কর্মকর্তাদের ওপর, যারা ক্ষমতার কাছে নয়—রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকে কাজ করেন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin