আজ মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২১শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আজ মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২১শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

এনইআইআর নাটক ও পাচারের সাম্রাজ্য: কার স্বার্থে জিম্মি বাংলাদেশ?

যে দেশে একটি গেটওয়ে ব্যবহার করে বিদেশি অপরাধী চক্র প্রতি মাসে আড়াইশত কোটি টাকা পাচার করে নিয়ে যায়, যে দেশে অসাধু ব্যবসায়ীদের তাণ্ডবে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা আক্রান্ত হয় এবং যেখানে ডিজিটাইজেশনের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ধুলোয় লুটোপুটি খায়—সেখানে একটাই প্রশ্ন ওঠে: এই রাষ্ট্র আসলে কার? জনগণের, নাকি একটি শক্তিশালী চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের?

একটি রাষ্ট্র যখন নিজের চোখের সামনে রাজস্ব লুট হতে দেখে, জনগণকে প্রতারিত হতে দেখে, জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে দেখে—তবুও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি করে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঘুণে ধরেছে। বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) নিয়ে যে দীর্ঘ নাটক চলছে, তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার এক নির্মম পরীক্ষা।

সম্প্রতি রাজধানীর বসুন্ধরায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার ক্রাইম বিভাগের অভিযানে তিনজন চীনা নাগরিক—লিউ হুই জাং (৪৬), ওয়ে ইউজি (৩০), শে ই রান (৪২)—এবং তাদের বাংলাদেশি সহযোগী ঝর্ণা চাকমা জিয়ানা (২৭) গ্রেপ্তারের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি মূলত বাংলাদেশে গড়ে ওঠা এক বিশাল, অন্ধকার ও অনিয়ন্ত্রিত সমান্তরাল অর্থনীতির নগ্ন দলিল।

অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১৪টি ল্যাপটপ, ১৬টি স্মার্টফোন, বিভিন্ন অপারেটরের ৬ হাজারের বেশি অ্যাক্টিভ সিমকার্ড, ২০টি গেটওয়ে মেশিন, বিদেশি মদ ও নগদ অর্থ প্রমাণ করে অপরাধীরা কতটা গোছানো অবকাঠামো তৈরি করেছিল। একটি মাত্র ভবন ভাড়া নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা ও অনলাইন জুয়ার সাম্রাজ্য চালানো হচ্ছিল। লটারির লোভনীয় মেসেজ, ভুয়া চাকরির অফার ও অতিরিক্ত আয়ের ফিশিং লিংক দিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা লুটে নেওয়া হতো।

আইনি নজরদারি এড়াতে চক্রটি একটি মোবাইলের সঙ্গে বাহ্যিক একাধিক স্লট যুক্ত করে একসঙ্গে ১২টি সিম পরিচালনা করত। ফলে ভুক্তভোগীরা প্রতারিত হয়ে অভিযোগ করলেও প্রযুক্তির জটিলতায় তাৎক্ষণিকভাবে ডিভাইসের আইএমইআই (IMEI) নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। ডিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি মাত্র একটি গেটওয়ের মাধ্যমেই প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছিল।

সূত্র বলছে, পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিকে হাত করে এই ধরনের একাধিক চক্র রাজধানীতে দীর্ঘ সময় ধরে অবাধে তাদের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্ধর্ষ চক্রটি সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে নিঃস্ব করছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে।

তবে এখানে এই সত্য স্বীকার করতে আমার দ্বিধা নেই যে, ডিএমপির নবনিযুক্ত কমিশনারের সততা, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্বের ফলে অনেক অপরাধী চক্র ধরা পড়ছে এবং পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এখানে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলামের সততা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও প্রশংসার দাবি রাখে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি মোবাইল ডিভাইসের পরিচয়, নিবন্ধন ও ব্যবহার শুরুতেই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো, অর্থাৎ এনইআইআর বাস্তবায়িত হতো, তবে কি এই অপরাধচক্র এত সহজে বিস্তার লাভ করতে পারত?

বাংলাদেশে অবৈধ মোবাইল ফোনের যে বিশাল কালোবাজার গড়ে উঠেছে, তা কেবল সরকারকেই হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে না; এটি বৈধ ব্যবসাকে ধ্বংস করছে, হুন্ডিকে উৎসাহ দিচ্ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই নেটওয়ার্ক কেবল অবৈধ পথে মোবাইল আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। একই চক্রের মাধ্যমে স্বর্ণ, মাদক, অবৈধ ইলেকট্রনিক পণ্যসহ নানা ধরনের নিষিদ্ধ বা কর ফাঁকি দেওয়া পণ্য দেশে প্রবেশ করছে। এটি শুধু একটি “গ্রে মার্কেট” নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া একটি সমান্তরাল অপরাধ অর্থনীতি। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ:

১. একজন ক্রেতা বহু কষ্টে অর্জিত টাকায় দোকান থেকে একটি “ব্র্যান্ড নিউ” ফোন কেনেন। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়তো বিদেশ থেকে আনা একটি ব্যবহৃত বা রিফার্বিশড ফোন, যার ভেতরের যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়েছে। কয়েকদিন যেতে না যেতেই ব্যাটারি, নেটওয়ার্ক বা ডিসপ্লেতে ত্রুটি দেখা দেয়। ক্রেতা বুঝতেই পারেন না যে তিনি এক আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন।
২. বৈধ আমদানিকারকরা শুল্ক ও কর দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন, আর চোরাকারবারিরা কর ফাঁকি দিয়ে বাজারে কম দামে ফোন ছেড়ে অসৎ প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
৩. চোরাচালানের মূল্য পরিশোধ হচ্ছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায়—হুন্ডির মাধ্যমে। ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং রিজার্ভের ওপর তৈরি হচ্ছে প্রচণ্ড চাপ।
আধুনিক বিশ্ব বহু আগেই বুঝেছে—মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি ব্যাংকিং, জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-কমার্স ও জাতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামোর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বিশ্বের বহু দেশ IMEI-ভিত্তিক নিবন্ধন ও ব্লকিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে IMEI নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা যেখানে বহু আগেই এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ কোন অদৃশ্য সুতার টানে পিছিয়ে রয়েছে?

বাংলাদেশ ২০২১ সালে জনগণের করের ২৯ কোটি টাকা ব্যয় করে এনইআইআর সফটওয়্যার ক্রয় করার পরও সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে পারেনি। চালুর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই এটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কেন এই পশ্চাদপসরণ? অভিযোগ রয়েছে, চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নেপথ্যের অশুভ সমঝোতার কারণেই এনইআইআর বারবার থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এনইআইআর বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা ছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। মোবাইল চোরাকারবারীদের সাথে স্বার্থগত সম্পর্কের কারণে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।

উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্রে জানা যায়, বিটিআরসির এক বৈঠকে যখন জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনা করে এনইআইআর কার্যকরের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবকারী সেনা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে আর একটি কথাও না বলার জন্য সরাসরি সতর্ক করেছিলেন আইসিটি উপদেষ্টা জয়। অর্থাৎ জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থকে সেদিন প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী তৈয়ব আহমেদের উদ্যোগে আবারও এনইআইআর বাস্তবায়নের ঘোষণা আসে।

১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ নির্ধারণ করা হলেও মোবাইল ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মুখে তা পিছিয়ে ১ জানুয়ারি ২০২৬ করা হয়। ওই দিন থেকে আংশিকভাবে এনইআইআর কার্যকর শুরু হলে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি) নামের একটি চক্র তীব্র অপতৎপরতা শুরু করে। তারা বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা চালায়, ভাঙচুর করে এবং সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ চালায়। এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলায় অন্তত ৪৫ জন গ্রেপ্তার হলেও তাদের অপতৎপরতা থামেনি।

সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো—এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই তৈয়ব আহমেদকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই তৈয়ব দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে ব্যক্তি অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, তাকেই যদি প্রাণভয়ে দেশ ছাড়তে হয়, তবে বুঝতে হবে এই সিন্ডিকেটের হাত কতটা লম্বা এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা জিম্মি!

প্রসঙ্গত এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ক’দিন আগেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ‘সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ আটকে দিচ্ছে, ঘুষখোরেরা আগের মতোই ঘুষ খাচ্ছে।’

অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিশাল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা তৈরির পরিবর্তে গণমাধ্যমের একটি অংশ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এনইআইআর-কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন এটি জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত, অথচ বাস্তবে এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের সুরক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল।

অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অবস্থানও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের কথা বলে এনইআইআর চালুর ব্যাপারে তার আন্তরিকতার অভাব নেই বলেই আমার মনে হয়েছে। তবে এনইআইআর চালুর পর কতটি অবৈধ ফোন প্রবেশ করেছে বা ব্লক করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসি সম্প্রতি যে দায়সারা ও ধোঁয়াশাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।

বিটিআরসি সম্প্রতি আমাকে জানিয়েছে যে, সব সেট এনইআইআরের আওতায় আনা হয়েছে এবং পরে নির্ধারিত সময়ে ‘রেজিস্টার্ড’ বা ‘আনরেজিস্টার্ড’ ভাগে ভাগ করা হবে। কিন্তু এনইআইআরের মূল উদ্দেশ্যই যেখানে ছিল অবৈধ ফোনকে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা, সেখানে এই নীরবতা ও কৌশল কার স্বার্থে?

অভিযোগ উঠেছে, বিটিআরসি, এনবিআর এবং কাস্টমসের কিছু অসাধু আমলা ও কর্মকর্তা চান না এনইআইআর পুরোপুরি চালু হোক। কারণ এটি চালু হলে অবৈধ মাসোহারা ও চোরাচালানের উইন্ডো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

এখানে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এনইআইআর কার্যকর না রেখে অবৈধ পথে মোবাইল আমদানিকে উৎসাহিত করা হয়। মোবাইল আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বৈধপথে মোবাইল আমদানিকে উৎসাহিত করতে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল।
কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ২৬-২৭ অর্থবছরে আবারো আমদানি শুল্ক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের ২৫ শতাংশে উন্নীত করেছে।

একজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে আমি নিজে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছি—এনইআইআর কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য একাধিকবার কল করেছি, বার্তা পাঠিয়েছি, পিএস-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সময় চেয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই ব্যস্ততার অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—জাতীয় নিরাপত্তার এই মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চেয়ে নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কী হতে পারে? নাকি পুরনো ব্যবস্থার মতো ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অসাধু চক্র শীর্ষ মহলকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে?

অবৈধ চোরাকারবারি চক্রকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে নিম্নলিখিত কঠোর পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:

১. কোনো প্রকার নতি স্বীকার না করে অবিলম্বেই অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্তকরণ ও ধাপে ধাপে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
২. আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও বিমানবন্দরগুলোতে স্ক্যানিং প্রযুক্তি এবং এনবিআর-এর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে, যাতে অনিবন্ধিত ফোন দেশে প্রবেশই করতে না পারে।
৩. এনইআইআর বাস্তবায়নে যেসব কর্মকর্তা ধীরগতি নীতি অবলম্বন করছেন বা তথ্য গোপন করছেন, তাদের চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মুখোমুখি করতে হবে।
৪. ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে যাতে নাগরিকরা ভেরিফায়েড ও নিবন্ধিত সেট কেনেন এবং অবৈধ সেটের প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকেন।
৫. বিটিআরসি ভবনে আক্রমণকারী এবং সরকারি কাজে বাধা প্রদানকারী সিন্ডিকেট সদস্যদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিশেষে, আমি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—এনইআইআর ইস্যুটি কেবল মোবাইল ফোন বা টেলিযোগাযোগ খাতের কোনো সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছা প্রমাণের আয়না।
আজ আপনার সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। জনগণ বিশ্বাস করে, আপনি জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন। আপনার চারপাশে যে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ও অশুভ সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করুন। এরা আপনার সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে এবং রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অপরাধীদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বাইরের প্রতিপক্ষের চেয়ে ভেতরের লুকিয়ে থাকা আমলা ও সিন্ডিকেট চক্র অনেক বেশি বিপজ্জনক। আপনি জনগণের শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলুন। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থবিরোধী এই আন্তর্জাতিক মোবাইল চোরাকারবারি চক্রান্তকে গুঁড়িয়ে দিন। এই বাংলাদেশকে চোরাকারবারীদের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করুন এবং নিরাপদ রাখুন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin