আজ মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
আজ মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ডক্টর ইউনূসের তাৎপর্যপূর্ণ বিদায়ী ভাষণ ও আগামীর বাংলাদেশ

দেড় বছরের এক অস্থির, উত্তাল এবং ঐতিহাসিক সময়ের অবসানের মুহূর্তে ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে তাঁর বিদায়ী ভাষণ দিলেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; বরং একটি রূপান্তরমান রাষ্ট্রের আত্মসমালোচনা, আত্মপ্রত্যয় এবং ভবিষ্যৎ অভিযাত্রার রূপরেখা বলেই আমি মনে করি।

তাঁর বক্তব্যে ছিল স্বস্তি, সতর্কতা ও কৃতজ্ঞতার সুর—কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। সংস্কার, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি—এই তিন স্তম্ভেই দাঁড়াতে পারে আগামীর বাংলাদেশ।

ড. ইউনূসের বিদায়ী ভাষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল “জুলাই সনদ”—যা গণভোটে অনুমোদিত হয়ে এক নতুন সামাজিক চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই সনদকে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এটি কেবল আইনি সংশোধনের তালিকা নয়; বরং ক্ষমতার কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণের একটি নকশা।

দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র ক্ষমতা, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি—এসবের পুনরাবৃত্তি রোধে সাংবিধানিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

বিদায়ী সরকারপ্রধান প্রায় ১৩০টি আইন ও সংশোধনী এবং শত শত নির্বাহী আদেশের কথা উল্লেখ করেছেন, যা একটি বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এখানে বার্তা হচ্ছে—জুলাই সনদ বাস্তবায়ন শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয় বরং এটি রাজনৈতিক বৈধতার শর্ত। এটি উপেক্ষিত হলে গণভোট-প্রদত্ত জনরায় অস্বীকার করা হবে। বাস্তবায়িত হলে ফ্যাসিবাদী পুনরুত্থানের পথ রুদ্ধ হবে।

ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি বারবার বলেছেন—বিচার যেন রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে থাকে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে। রায় সরাসরি সম্প্রচার, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ—এসব কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, স্বচ্ছতার প্রতীক।

বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়, স্বচ্ছ নিয়োগ কাঠামো, দেওয়ানি-ফৌজদারি আইনে সংস্কার—এসবের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা হয়েছে।

এখানে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য শিক্ষা হলো—বিচারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হলে রাষ্ট্র আবারও অনাস্থার খাদে পড়বে। কিন্তু বিচার যদি স্বাধীন থাকে, তবে সেটিই হবে ক্ষমতার ওপর নাগরিক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ন্যায়বিচার আজ আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও কৌশলগত উপাদান। একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চা তার বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান; উন্নয়ন অংশীদাররা চান জবাবদিহি। ফলে ন্যায়বিচার কেবল নৈতিক ইস্যু নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থের অংশ।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান ছিল আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করেছেন—বাংলাদেশ আর কোনো দেশের “পরামর্শনির্ভর” রাষ্ট্র নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরুজ্জীবিত করা, বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয়তা, অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রসার—এসব উদ্যোগ বহুমাত্রিক কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্ব এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক; আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে সচেষ্ট। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যাগত সুবিধা ও সমুদ্রসম্পদ। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে উন্নয়নকেন্দ্রিক, কৌশলগত এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন।

অর্থনীতির প্রসঙ্গেও তিনি রিজার্ভ পুনর্গঠন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, শ্রম আইন সংশোধন, প্রবাসী সুরক্ষা ও বন্দর আধুনিকীকরণের কথা বলেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন—সুশাসন ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না।

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি—এসবের ওপর আস্থা তৈরি হয়; আর আস্থাই বিনিয়োগের ভিত্তি। উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে প্রতিষ্ঠান।

গণভবনকে জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের ঘোষণা প্রতীকী হলেও তা গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। ইতিহাস সংরক্ষণ মানে অতীতকে স্মরণ করা এবং ভবিষ্যৎকে সতর্ক করা—যেন ক্ষমতার অপব্যবহার আর না ফিরে আসে।

প্রিয় পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন—মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের দেড় মাস পূর্ণ হওয়ারও আগে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে আমি একটি সমালোচনামূলক নিবন্ধ লিখেছিলাম। সেই লেখার শিরোনাম ছিল, “ডক্টর ইউনূস বাতাসে কান পাতুন, চারদিকে বৈষম্যের ঝড়ো হাওয়া।” তখন দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে তাঁর সরকারের প্রশংসার ঢেউ বইছিল। কে কত বেশি প্রশংসা করবেন—সেই প্রতিযোগিতাই যেন চলছিল সর্বত্র। এখন যেমন তারেক রহমানকে নিয়ে গণমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি চলছে । ঠিক সেই সময়েই আমি ভিন্ন সুর তুলেছিলাম, কারণ আমার কাছে সাংবাদিকতার অর্থ কখনোই প্রশংসা নয়; বরং সময়োপযোগী প্রশ্ন তোলা।

আজ যখন ড. ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন, তখন আমি নির্দ্বিধায় বলতে চাই—তাঁর বিদায়ী ভাষণটির জন্য তিনি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। দেড় বছর মেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি বহু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি—এটাই বাস্তবতা। বাইরে থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে যতটা সরল মনে হয়, বাস্তবে আমাদের আমলাতন্ত্র ততটাই জটিল ও বহুস্তরীয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন সেই কাঠামোকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, সেখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধি আনা সহজ কাজ নয়। এই সত্য স্বীকার করতেই হবে।

তবুও তাঁর বিদায়ী ভাষণে যে আত্মসমালোচনার সুর, যে নীতিগত স্পষ্টতা এবং যে ভবিষ্যৎ-দিকনির্দেশনা উচ্চারিত হয়েছে—তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত “জুলাই সনদ” বাস্তবায়নের প্রশ্নে তিনি সরকার ও জনগণের যৌথ দায়িত্বের কথা বলেছেন।

আমি বিশ্বাস করি, যদি রাষ্ট্র ও নাগরিকসমাজ আন্তরিকভাবে এই সনদের বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে—যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

ইউনূস সরকারের প্রায় পুরো সময়জুড়েই আমি তাঁর কাজের সমালোচনা করেছি, আবার যেখানে প্রাপ্য সেখানে প্রশংসাও করেছি। এটাই আমার সাংবাদিকতার নীতি—ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, গঠনমূলক সমালোচনা করা, সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলা। এর আগে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তারেক রহমান-কে নিয়ে একাধিক নিবন্ধ লিখেছি। গুমের আতঙ্ক নিয়েও কলম ধরেছি।

আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে, তখনও আমার অবস্থান অপরিবর্তিত। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা যেমন করব, তেমনি জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো পদক্ষেপের সমালোচনাও করব। কারণ,ক্ষমতাকে তেল দেয়া কোনো সাংবাদিকের কাজ নয়; বরং তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানোই একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার পেশাগত দায়িত্ব।

প্রিয় পাঠক আপনাদের আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—যতদিন এই পেশায় আছি, দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমার পেশাগত সততা অক্ষুণ্ণ রাখব। প্রশ্ন করব, বিশ্লেষণ করব, সমালোচনা করব—কিন্তু কখনোই আপস করব না। ইনশাআল্লাহ।

শেষ কথা:
ডক্টর ইউনুস এর বিদায়ী ভাষণকে যদি একটি রোডম্যাপ হিসেবে ধরা হয়, তবে এটা স্পষ্ট যে—জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতি—এই তিন পথেই এগোতে পারে আগামীর বাংলাদেশ। সরকার ও জনগণ যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তবে দুর্নীতিমুক্ত,গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বিশ্বমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা মোটেও অসম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin