আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

একজন মহানায়কের প্রত্যাবর্তন ও চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ ২৫ ডিসেম্বর দুপুর নাগাদ দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয় বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী বাঁক বদলের সন্ধিক্ষণ বলে আমি মনে করি। কারণ তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারেন। নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন, অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র আর নির্বাসনের দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন তাই সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা চার দশকেরও বেশি সময়ের। ছাত্রজীবনেই তিনি কারাবরণ করেছেন। যা তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রথম প্রকাশ। গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস না করার যে মানসিকতা তিনি লালন করছেন তা রোপিত হয়েছিল সেই সময়েই। পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসার পর তিনি দেখেছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতা। দেখেছেন দলীয় রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সর্বোপরি কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের দমননীতি। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনীতির ওপর যে নিপীড়ন নেমে আসে, তারেক রহমান তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
কুখ্যাত এক এগারো সরকারের সময়ে তারেক রহমানের ওপর চালানো শারীরিক নির্যাতন সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। কার্যত তাকে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সেই সময়ের নির্যাতন শুধু একজন ব্যক্তিকে নয় বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনকেই স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে তিনি বেঁচে আছেন। শারীরিক ও মানসিক ক্ষত সত্ত্বেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং হাজার মাইল দূরে বসেই তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। ভাঙনের হাত থেকে দলকে রক্ষা করেছেন এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থায় তারেক রহমানের নেতৃত্ব ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আধুনিক প্রযুক্তি, সাংগঠনিক কৌশল এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সমন্বয়ে তিনি বিএনপিকে সচল রেখেছেন এমন এক সময়ে, যখন দলটির ওপর একের পর এক আঘাত এসেছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত ছিল তার বিরুদ্ধে। কিছু কথিত গণমাধ্যম এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তারেক রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং জিয়া পরিবারকে চরিত্রহননের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে নানা সময়। তবু জনগণের মন থেকে বিএনপিকে মুছে ফেলা যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, এই দলটি এখনো দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
গত দুই দশকে তারেক রহমান যে রাজনৈতিক কৌশল ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তা একজন বর্ষীয়ান রাষ্ট্রনায়কের বৈশিষ্ট্য বহন করে। দূরে থেকেও তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কর্মীদের মনোবল জুগিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই দেখা যায় যে নির্বাসিত অবস্থায় থেকেও কোনো নেতা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে এমন প্রভাব রাখতে পেরেছেন। এই ধারাবাহিক প্রতিরোধেরই ফল হিসেবেই জুলাই অভ্যুত্থানের সফলতা আসে। যা কার্যত দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটায়।
স্বৈরাচার পতনের পর তারেক রহমানের প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি বিবৃতি গভীর তাৎপর্য বহন করছে। উত্তেজনা বা প্রতিশোধের ভাষা নয় বরং তিনি বেছে নিয়েছেন শান্তি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বার্তা। নৃশংস নিপীড়ন ও দীর্ঘ অবিচারের শিকার হয়েও তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সামনে এনেছেন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা। তার প্রস্তাবিত ৩১ দফা কর্মসূচি তারই প্রমাণ। এই কর্মসূচিতে তিনি “রেইনবো জাতি” গঠনের কথা বলেছেন। যেখানে ধর্ম, বর্ণ, মত ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সকল নাগরিকের জন্য একটি সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় কাউকে বাদ দিয়ে যে এগোনো সম্ভব নয়।এই উপলব্ধি থেকেই তারেক রহমান এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা সামনে এনেছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রায় দেড় যুগ পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস নয় বরং মহান দায়িত্বের সুবিশাল ভারও বহন করছে। আমি মনে করি, তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকাটি খুবই দীর্ঘ। নির্বাচনের আগে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য কোন্দল নিরসন, নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দেয়া তার প্রাথমিক পরীক্ষা। একই সঙ্গে মব ভায়োলেন্স, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র এবং পতিত আওয়ামী লীগ সমর্থিত গোষ্ঠীর অপতৎপরতা মোকাবিলাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ সংকোচন ও কর্মসংস্থানের চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ একটি কার্যকর শাসন কাঠামো গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট চাপ, যেখানে পুরোনো ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নতুন বাস্তবতাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র। অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও তথ্যযুদ্ধ জনমতকে প্রভাবিত করছে দ্রুততার সঙ্গে। এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রমাণভিত্তিক যোগাযোগ ও আস্থার পুনর্গঠন অপরিহার্য।
পরিবর্তিত সময়ের দাবিতে দলের ভেতরের নেতৃত্ব পুনর্গঠনও বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক তরুণ,মেধাবী ও সৃজনশীলদের বেশি করে দলে দলে ভিড়াতে হবে। ২৫-৩০ বছর আগের পুরোনো ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতির সূচনা করতে হবে।
সরকার পরিচালনার দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করতে হবে। কৌশল ও সময়ের সঙ্গে অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হলেও, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে অধিকতর জটিল হবে। কারণ এটির সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কার, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও সামাজিক আস্থার সমন্বয় সরাসরি জড়িত। এসব কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হাওয়ার উপরই নির্ভর করবে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের সাফল্য-ব্যর্থতা।

অন্যদিকে সম্ভাবনার দিকটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে, দূর থেকে নির্দেশনা দেওয়া আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে। দীর্ঘদিন ধরে কেবল পর্দায় নেতাকে দেখা কর্মীরা এবার তাকে পাশে পাবে। এমন মানসিক শক্তি নির্বাচনী মাঠের চিত্রই বদলে দিতে পারে। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়বে।

সবকিছু মিলিয়ে তারেক রহমান আজ এক সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি। একদিকে দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা; অন্যদিকে ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক বিভাজন ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ। এই দুইয়ের সমীকরণ মিলিয়েই নির্ধারিত হবে তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সাফল্য।

শেষ কথা:
সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড় থাকলেও তিনি
ধারাবাহিক নৃশংস নিপীড়নের পরও শান্তি, ঐক্য ও গণতন্ত্রের যে বার্তা বহন করে চলেছেন। তা তাকে কেবল একজন দলীয় নেতা নয় বরং এই সময়ের ঐক্য শান্তি সৌহার্দ্য ও গণতন্ত্রের মহানায়কে পরিণত করেছে। তাই আমি মনে করি, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ভবিষ্যত বাংলাদেশ গড়ার পথে এক মহানায়কের আশাব্যঞ্জক অথচ সুকঠিন অভিযাত্রা।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin