আজ শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

একজন ফরিদা খানম এবং জনপ্রশাসনের দুষ্টুচক্র

 

সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে জনপ্রশাসন। একই সঙ্গে এটি সম্ভাবনা ও সংকটের এক জটিল সমাহার—যেখানে দক্ষতা, মেধা ও জনসেবার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা প্রভাববলয়, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো সমান্তরালে কাজ করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই দ্বৈত চরিত্র অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা জেলার প্রশাসক হিসেবে ফরিদা খানমের নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্ক, অপপ্রচার এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়েছে—তা এই বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিফলন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বহু বছর আগের একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার মতো তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে সামাজিক মাধ্যম, কিছু গণমাধ্যম এবং প্রবাসভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, গুঞ্জন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রবণতা নিছক কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়; বরং প্রশাসনিক সংস্কৃতির ভেতরে জমে থাকা অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস এবং প্রভাব বলয়ের লড়াইয়েরই বহিঃপ্রকাশ।

অনেকেই ফরিদা খানমকে একজন জনবান্ধব, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন—এমন একটি রাজনৈতিক অতীত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক নয়। বরং এই ছাত্ররাজনীতি থেকেই দেশের বহু নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই পরিচয়ের কারণেই তিনি গত প্রায় দেড় যুগ ধরে পেশাগত জীবনে নানামুখী বঞ্চনা ও চাপের মুখে ছিলেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান এবং শুরুতেই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন—এমনটাই সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিমত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্বার্থান্বেষী একটি মহলের রোষানলে পড়েন। তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগও শোনা যায়। এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—অভিযোগগুলো কতটা বাস্তব, আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন সরকার তাকে ঢাকা জেলার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি তার নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং পূর্বে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দায়িত্বে আনতে পারে? বাস্তবতা হলো, যে কোনো সরকারই তার প্রশাসনিক কাঠামোতে আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিতে চায়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতার মানদণ্ড অতিক্রম না করে—সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

এই জায়গাতেই বিতর্কের সূচনা। ফরিদা খানমের নিয়োগের পরপরই তার বিরুদ্ধে যে সঙ্ঘবদ্ধ অপপ্রচার শুরু হয়, তা অনেকের কাছে নিছক কাকতালীয় বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রচারণার পেছনে কারা? এটি কি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রয়াস, নাকি প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা কোনো গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রতিফলন?

“প্রশাসনের দুষ্টুচক্র” বলতে সাধারণত এমন একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করে সুবিধা ভোগ করেছে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অনিচ্ছুক। এই চক্রের বৈশিষ্ট্য হলো—তারা নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে নতুন বা ভিন্নধারার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা উপায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে—কখনো অভ্যন্তরীণ চাপের মাধ্যমে, কখনো বা অপপ্রচার ও তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে।

ফরিদা খানমকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এই প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই অনেকের ধারণা। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর একটি অংশ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অন্য অংশ ব্যক্তিগত বা অপ্রাসঙ্গিক অতীতকে সামনে আনে—যার অনেকটাই পেশাগত মূল্যায়নের সীমা অতিক্রম করে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ ও অপপ্রচারের মধ্যে পার্থক্য করা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো কর্মকর্তার কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা তদন্ত দাবি করা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা । কিন্তু সেই সমালোচনা যদি তথ্যভিত্তিক না হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তাহলে তা ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয় এবং প্রশাসনের প্রতি জনআস্থাকে ক্ষুণ্ন করে।

বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। এই বাস্তবতায় কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। ফরিদা খানমের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য—অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণিত হোক, আর অপপ্রচার হলে তার উৎস ও উদ্দেশ্য উন্মোচিত হোক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা অদৃশ্য প্রভাববলয় বা তথাকথিত “দুষ্টুচক্র” চিহ্নিত করা। কারণ এই চক্র শুধু একজন কর্মকর্তার পথ রুদ্ধ করে না; এটি পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত করে, জনসেবা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। ফলে এই চক্র ভাঙা কোনো ব্যক্তির নয়—এটি রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

বর্তমান বাস্তবতায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য—যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রক্রিয়া মুখ্য হবে; গুজব নয়, তথ্য প্রাধান্য পাবে; এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক পেশাদারিত্বকে শক্তিশালী করা হবে।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনাকে জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। নরসিংদীতে ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমকেও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর চাপের মুখে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে সেই বদলি আদেশ বাতিল করে এবং অভিযোগের অনুসন্ধানে মনোযোগ দেয়। অর্থাৎ এখানে সরকার অপপ্রচার বা গোষ্ঠীগত চাপে নতি স্বীকার না করে বরং সত্য উদঘাটন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নিয়েছে।

এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে ফরিদা খানমও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার ক্ষেত্রেও অভিযোগ, অপপ্রচার এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখনকার সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্ন—তাকে জেলা প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলি করা হয়। ফলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে: একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়ার কারণ কী?

এই দুই ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—প্রশাসনের ভেতরে সক্রিয় গোষ্ঠীগত প্রভাব ও তথাকথিত “দুষ্টুচক্র” এখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে। তবে একই সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা থাকলে সেই প্রভাব অতিক্রম করা সম্ভব। এজন্য আমি বর্তমান সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাতে চাই।

পরিশেষে বলতে চাই,ফরিদা খানমকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক হয়তো সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু এর মাধ্যমে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে—সেগুলো থেকেই যাবে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে পারলেই আমরা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর জনপ্রশাসনের দিকে এগোতে পারব। অন্যথায় “দুষ্টুচক্র” নামক অদৃশ্য শক্তি বারবার সামনে আসবে, এবং মাহমুদা বেগম ও ফরিদা খানমের মতো দেশপ্রেমিক,দক্ষ ও পেশাদার আরও অনেক কর্মকর্তা অপপ্রচার ও অন্যায়ের শিকার হবেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin