আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আবারও এক বিতর্ক আমাদের সামনে এসেছে। বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের থাকা–খাওয়ার ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নাসির কমিশন। এমন সিদ্ধান্ত শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয় বরং নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই নতুন করে সংশয় সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই সিদ্ধান্তকে “অপরিণামদর্শী, বৈষম্যমূলক ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী” বলে আখ্যায়িত করেছে।
টিআইবির এই প্রতিক্রিয়া খুবই প্রাসঙ্গিক এবং বাস্তবসম্মত বলে আমি মনে করছি।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয় বরং রাজনৈতিক ও নৈতিকতার প্রশ্নটিও জড়িত। বিশেষত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর কমিশনের প্রতি জনমনে গভীর অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং এই প্রেক্ষাপটে ইসির যেকোনো পদক্ষেপে সতর্কতা ও দূরদর্শিতা অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।
কিন্তু ইসির এই সিদ্ধান্ত সেই সতর্কতার বিরুদ্ধে হাঁটারই নামান্তর।
সুতরাং এখানে প্রশ্ন তোলা খুবই প্রাসঙ্গিক যে, যাঁরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন, তাঁরাই যদি নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তায় থাকেন। তাহলে কি তাদের নিরপেক্ষতা পুরোপুরি বজায় থাকবে? এটি কেবল বাংলাদেশের বাস্তবতা নয় বরং আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পর্যবেক্ষণের একটি মৌলিক নীতি হলো—পর্যবেক্ষকদের আর্থিক ও লজিস্টিক স্বাধীনতা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা কার্টার সেন্টারের মতো সংস্থাগুলোর গাইডলাইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, পর্যবেক্ষক দলকে এমন কোনো সুবিধা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
টিআইবির এই পর্যবেক্ষণটিও খুব স্বাভাবিক যে,
যদি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা–খাওয়ার খরচ বহন করা যায়, তবে দেশি পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে কেন একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে না? বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে সংগঠনগুলো সীমিত সম্পদ নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে আসছে। তাঁদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। অথচ বিদেশিদের জন্য করা হয় উদার আতিথেয়তার ব্যবস্থা। এটি কোনভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। এটা একধরনের উপনিবেশিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে আমি মনে করি।
আরও গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হলো স্বার্থের দ্বন্দ্ব। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কাজ শুধু ভোটগ্রহণের দিন কেন্দ্র পরিদর্শন নয়। বরং তাঁরা ইসির ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবকিছুরই মূল্যায়ন করেন। এখন প্রশ্ন হলো, যাঁরা নির্বাচন কমিশনের আতিথেয়তায় থাকবেন, তাঁরা কমিশনের ব্যর্থতা বা ত্রুটি কতটা নির্মোহভাবে তুলে ধরতে পারবেন? এই দ্বন্দ্ব কেবল তাত্ত্বিক নয় বরং বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সুযোগ–সুবিধাপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট অনেক সময় আশ্চর্যজনকভাবে নরম ও কূটনৈতিক ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে।
অন্যদিকে টিআইবি পর্যবেক্ষকদের প্রতিও প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন যে তাঁরা কোন যুক্তিতে ইসি বা সরকারের অর্থায়নে এই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন? নৈতিকতার মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বিবেচনায় এনে এই আতিথেয়তা গ্রহণ করা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? সুতরাং এটি কেবল বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহলের জন্যও আত্মসমালোচনার বিষয়।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৮ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। সে সময় বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক আতিথেয়তার প্রয়োজন পড়েনি। নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক ঐকমত্য, শক্তিশালী তত্ত্বাবধান এবং জনআস্থা বা ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে। অথচ ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিদেশিদের নানা সুযোগ–সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও সেই নির্বাচনগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাহলে আতিথেয়তা কি সত্যিই গ্রহণযোগ্যতার চাবিকাঠি, নাকি এটি কেবল এক ধরনের প্রদর্শনমূলক আয়োজন?
টিআইবির বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনমনে যে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তা বিতর্কিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর জনগণ এবার প্রকৃত অর্থেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করছে। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেকোনো সিদ্ধান্ত ইসির প্রতি নতুন করে অনাস্থা জন্ম দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, আব্দুল আউয়াল ও কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন যেভাবে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে, বর্তমান কমিশনও কি সেই পথেই হাঁটছে?
বর্তমান কমিশন যদি আত্মসমালোচনা না করে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে তা জাতির জন্য সত্যিই দুঃখজনক ব্যাপার হবে।
আমি মনে করি,বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানানো যেতে পারে, কিন্তু তাঁদের আর্থিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে। রাষ্ট্র চাইলে কেবল ভিসা সহায়তা, নিরাপত্তা বা তথ্যগত সহযোগিতা দিতে পারে। কিন্তু আতিথেয়তার নামে সকল ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কাম্য নয়। একই সঙ্গে দেশীয় পর্যবেক্ষকদের জন্যও সমান সুযোগ ও সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।
শেষ কথা:
একটি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং জনগণের আস্থা ও ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, আতিথেয়তা নয়। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকার খরচ বহন করে যদি নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়, তবে সেটি হবে আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখনো সময় আছে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার। নাসির কমিশনকে এমন অবস্থান নিতে হবে যাতে যাতে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক ইতিহাসে তাদের নাম সম্মানের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকে। অন্যথায় আউয়াল–হুদার পথ ধরে নাসির কমিশনের নামও একদিন আসামির কাঠগড়ায় যুক্ত হবে। যা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিষট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com