আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

একবার দেখুন: ক্ষমতার খোয়াবে মগ্ন পরাজিত শক্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—এই দেশ শুধু ভূখণ্ড নয়, এটি একটি চেতনার নাম। ১৯৭১ সালে যে চেতনায় একটি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই চেতনাই আজও আমাদের রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই পরাজিত শক্তি আজ আবার “একবার দেখুন” স্লোগানে ক্ষমতার মসনদে ফেরার স্বপ্নে বিভোর। ইতিহাস যাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, জনমত যাদের বারবার বিচ্ছিন্ন করেছে, তারাই আজ নিজেদের নতুন মুখোশে জাতির সামনে হাজির করতে চাইছে।

রাজনীতিতে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতার জন্য যদি দেশ, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, এমনকি ধর্মকেও বিকৃত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়—তবে সেটি আর রাজনীতি থাকে না; সেটি জাতির জন্য হুমকিতে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও ইতিহাসে পরাজিত গোষ্ঠীগুলো আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রক্ষমতার দরজায় পৌঁছাতে। তাদের ভাষা, আচরণ, দাওয়াই—সবকিছুতেই ফুটে উঠছে ক্ষমতার প্রতি এক অসুস্থ মোহ, এক ধরনের রাজনৈতিক উন্মাদনা।

স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর থেকে তাদের তৎপরতার ধরন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বদলে ষড়যন্ত্র, বিভাজন আর বিদেশি শক্তির প্রতি নির্ভরতার পথ বেছে নিচ্ছে। এ প্রবণতা নতুন নয়। ইতিহাসের প্রতিটি সংকটময় সময়েই এই গোষ্ঠীগুলো বিদেশি আশীর্বাদ খুঁজেছে। উপনিবেশিক মানসিকতাই যেন তাদের রাজনৈতিক দর্শনের মূল চালিকা শক্তি। দেশের স্বার্থ নয়, জনগণের কল্যাণ নয়—ক্ষমতা দখলই তাদের একমাত্র এজেন্ডা।

স্মরণ করা যায়, পতিত স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেছিল, “এক জালিমের হাত থেকে আরেক জালিমের হাতে যেতে চাই না।” এটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ছিল এক ধরনের দ্বৈত চরিত্রের প্রকাশ। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সুযোগ তৈরি হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে। সেই বিএনপিকেই সময়ে সময়ে বিশ্বাসঘাতকতার ছুরিকাঘাত করেছে এই গোষ্ঠী। ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচার এরশাদের প্রহসনের নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছিল, এমনকি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গেও সমঝোতায় গিয়েছিল। অথচ বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আপস করেননি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল, দৃঢ়, অটল। সেখান থেকেই তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয় “আপোষহীন” বিশেষণ।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন—তাদেরকে নতুন করে দেখার কিছু নেই। দেশের মানুষ তাদের ১৯৭১ সালেই দেখেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ নয়; এটি ঐতিহাসিক সত্যের স্মরণ। যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, যারা বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা ও নারকীয় নির্যাতনে অংশ নিয়েছে—তাদের নতুন করে “দেখার” কিছু নেই। ইতিহাসের রেকর্ডে তাদের ভূমিকা স্থায়ীভাবে লেখা আছে, যা কোনো নতুন পোশাক, নতুন স্লোগান বা নতুন প্রচারণায় মুছে যাবে না।

অথচ আজ তারা “জান্নাতের টিকিট” বিক্রির রাজনীতি শুরু করেছে। ধর্মকে পণ্য বানিয়ে, মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতার সিঁড়ি বানাতে চায়। এটি রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। কারণ এখানে শুধু রাষ্ট্রের নয়, মানুষের বিশ্বাসের সাথেও প্রতারণা করা হয়। ইসলাম কখনও ক্ষমতার জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ধোঁকা বা মানুষের গালি দেওয়ার শিক্ষা দেয় না। অথচ দেখা যাচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে যারা জামায়াতের সমালোচনা করে, তাদের বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—এই কি ইসলামের শিক্ষা? গালাগালি, কুৎসা, চরিত্রহনন কি ধর্মীয় রাজনীতির বৈধ অস্ত্র?

তারেক রহমান যে বক্তব্য রেখেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে এবং কীভাবে তাদের সহযোগীরা মা-বোনদের ইজ্জত লুট করেছে। এই কথা শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি জাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। ইতিহাসকে যারা অস্বীকার করে, তারা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনে।

ধর্মের প্রশ্নে তারেক রহমানের বক্তব্যও গভীর তাৎপর্য বহন করে। “যা আমার নয়, তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া শিরিকের পর্যায়ে পড়ে”—এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। জান্নাত, দোজখ, পরকাল—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধু সৃষ্টিকর্তার এক্তিয়ার। কোনো রাজনৈতিক নেতা, কোনো দলের সেই অধিকার নেই। অথচ যারা এসব ‘টিকিট’ বিক্রি করছে, তারা শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করছে না, তারা ধর্মকেও রাজনৈতিক বাজারে তুলে ধরছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সময় ভালো নয়—এ কথাটিও গভীরভাবে ভাবতে হবে। বহুমুখী ষড়যন্ত্র, ভেতরে ও বাইরে নানা অপচেষ্টা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা—সবকিছু মিলিয়ে জাতি এক কঠিন সময় পার করছে। এই সময়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল থাকা। কারণ ইতিহাস বলে, যখনই গণতন্ত্র দুর্বল হয়, তখনই পরাজিত শক্তি নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। স্বৈরতন্ত্র, অগণতান্ত্রিক শক্তি ও ধর্মের অপব্যবহারকারীরা তখনই সুযোগ খোঁজে।

এই বাস্তবতায় বিএনপির একটি বার্তা স্পষ্ট—গণতন্ত্রই একমাত্র পথ। জনগণই চূড়ান্ত শক্তি। ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য বাহিরের শক্তির নয়, দেশের মানুষের আস্থা ও ঐক্যের প্রয়োজন। যারা আজ “একবার দেখুন” বলে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে, তাদেরকে দেশের মানুষ সত্যিই বহুবার দেখেছে—১৯৭১ সালে, ১৯৮৬ সালে, বিভিন্ন সংকটের সময়ে। প্রতিবারই তারা ইতিহাসের আদালতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

শেষ কথা:
আমি মনে করি, সেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর আজ নতুন করে “একবার দেখুন” বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং এখন সময় এসেছে—ইতিহাস থেকে শেখার এবং গণতন্ত্রের পথকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরার। পরাজিত শক্তি যতই ক্ষমতার খোয়াবে মগ্ন হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এই দেশের জনগণ। কারণ বাংলাদেশ শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি রক্ত দিয়ে কেনা একটি চেতনার নাম।

লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin