আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, ক্ষমতার ভাষা ও আচরণ না বদলালে সেই পরিবর্তন অর্থহীন হয়ে পড়ে। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশজুড়ে যে আশা তৈরি হয়েছিল—রাজনীতি বুঝি নতুন পথে হাঁটবে—১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে আসতেই সেই আশা দ্রুত ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
আজ যে প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, তা হলো—তারেক রহমানকে কি নতুন আরেকজন শেখ হাসিনা বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে?
নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে বিএনপির কিছু আচরণ গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। নারীর হিজাব ধরে টান, নির্দিষ্ট একটি প্রতীকে ভোট না দিলে ভোটকেন্দ্রে না আসার হুমকি, নারীর পেটিকোট বা ছায়া খুলে নেওয়ার মতো নিকৃষ্ট হুমকি—এসব দৃশ্য আমরা আগেও দেখেছি। ঠিক শেখ হাসিনার আমলে।
তখন এসব করত ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। আজ একই আচরণ দেখা যাচ্ছে বিএনপির পরিচয়ে। রাজনীতি কি তাহলে বদলায়নি? বদলেছে শুধু দলীয় সাইনবোর্ড?
এর আগে শোনা গেছে—জিয়াউর রহমানের নাম নিতে হলে অজু করতে হবে, তারেক রহমানের কাছে হাজিরা দিতে হবে। এসব বক্তব্য কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। এসব ব্যক্তিপূজার লক্ষণ। ফ্যাসিবাদেরই পূর্বাভাস।
একটি জনসভায় তারেক রহমানের সামনেই নেতাকর্মীদের মারমুখী ও বিশৃঙ্খল আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। দলের শীর্ষ নেতার সামনে এমন আচরণ কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? দলের নিয়ন্ত্রণ কি তিনি ধরে রাখতে পারছেন? নেতাকর্মীদের বহিষ্কার আর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের সেই মেগা সিরিয়াল নিয়ে জনমনে নানারকম জল্পনা কি মিস্টার রহমান শুনতে পান?
সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মান দেখিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছে ভারতের পার্লামেন্ট। অথচ বেগম জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নে শেখ হাসিনা সরকার একাধিকবার ভারতের অবস্থানের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এ তথ্য নতুন নয়। আমার জানামতে, এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা চিকিৎসার অনুমতি দিতে চাইলেও ভারতের সম্মতি না থাকায় পিছু হটেন।
আজ সেই ভারত হঠাৎ বিএনপির প্রতি এতটা সহানুভূতিশীল হয়ে উঠলো কেন—সে প্রশ্নের জবাব এখনো স্পষ্ট নয়।
ভারতের বাংলাবাজার পত্রিকায় তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের সমঝোতার খবর প্রকাশিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযোগ মিথ্যা হলে বিএনপি চুপ কেন? একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল কি জনগণের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে?
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, খালেদা জিয়া যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন তারেক রহমান বলেছিলেন—বাংলাদেশে ফেরা তার একার সিদ্ধান্ত নয়। এটি তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহ পর, ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। প্রশ্ন হচ্ছে,এই দুই সপ্তাহে এমন কী ঘটল? কারা নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিল?
কোন শর্তে ছেড়ে দিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিলে মানুষের মনে সন্দেহ থেকেই যাবে।
৫ আগস্টের পর থেকে তারেক রহমানের বক্তব্যে অসাধারণ সংযম ছিল। সৌজন্য ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন—তিনি পুরোপুরি বদলে গেছেন। রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠেছেন। একজন জাতীয় নেতার মতো আচরণ করছেন। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পরও অনেকদিন পর্যন্ত তিনি সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হতেই সেই চিত্র পাল্টে গেল।
কুমিল্লার জনসভায় তিনি ঘোষণা দিলেন—সেখানে ইপিজেড করবেন। অথচ কুমিল্লায় ২০০০ সাল থেকেই ইপিজেড রয়েছে। এটি দেশের অন্যতম বড় শিল্পাঞ্চল। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সেখানে।
একজন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী কি এই মৌলিক তথ্য জানবেন না?
আমি মনে করি, এটি তার অজ্ঞতা নয়। এটি প্রস্তুতির ঘাটতি। নেতৃত্বের ব্যর্থতা।
ঢাকায় ভূমিকম্পের জন্য জামায়াতে ইসলামকে দায়ী করা শুধু হাস্যকর নয়, বিপজ্জনকও বটে। রাষ্ট্রনায়কের ভাষা এমন হতে পারে না।
জনসভায় ‘তাফালিং’, ‘গুপ্ত’—এই শব্দচয়ন তারেক রহমানের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মোটেও মানানসই নয়।
আর তিনি যখন জামায়াতকে ১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী করেন, তখন প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্ন তোলা যায় যে, ২০০১ সালে বিএনপি হত্যাকারী জামায়াতকে নিয়ে সরকার গঠন করেছিল কেন?
জামায়াতকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে এনেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তাহলে কি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া ভুল করেছিলেন?
নাকি এখন তারেক রহমান ভুল বলছেন? আমি মনে করি,এই দ্বিচারিতা বিএনপির রাজনীতিকে দুর্বল করছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই সারাদেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, বালুমহাল, জলমহাল, পরিবহন স্ট্যান্ড দখলের অভিযোগ উঠছে বিএনপির নামেই।
এই চিত্র নতুন নয়। কিন্তু ভয়ংকর হলো—এগুলো বন্ধ হচ্ছে না।
মানুষ ভাবছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কি এসব বন্ধ হবে নাকি আরও বেড়ে যাবে?
এই প্রশ্নের জবাব না দিলে বিএনপি তথা তারেক রহমানের প্রতি সর্বস্তরের ভোটারের আস্থা ফিরবে বলে মনে হয় না।
এখানে আরো স্মরণ করা যেতে পারে যে, বিএনপি শুরু থেকেই ২০২৫ সালের
ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চেয়েছিল। কিন্তু সরকার রাজি হয়নি। জুলাই সনদ প্রণয়নে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনে অনেকগুলো আপত্তি তুলেছিল বিএনপি। পাত্তা পায়নি একটিও।
বন্দর চুক্তি এই সরকারের কাজ নয় বলে তারেক রহমান সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। ফেইসবুক পোস্টে দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। এতেও কর্ণপাত করেনি সরকার।
গণভোট প্রশ্নে বিএনপি’র ভূমিকা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। মাঠ পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতাকর্মী না ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। আবার দু’একজন নেতা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন।
উল্লেখ্য গত নভেম্বরে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি একটি সভায় যোগ দিয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘গণভোটের চেয়ে কৃষকের আলুর ন্যায্য মূল্য পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। যদিও তিনি পরশু দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য তার নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়েছেন।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। ৫ আগষ্টের পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধকরণ প্রশ্নে শুরুতে বিএনপি’র অবস্থান ছিল নেতিবাচক অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি তারা জনগণের উপর ছেড়ে দিয়েছিল। বিএনপি ছাড়া প্রায় সকল দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধকরণের পক্ষে ছিল।
কিন্তু এক পর্যায়ে ছাত্রনেতাদের প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়। তখন বিএনপি ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরে গিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।
প্রশ্ন হচ্ছে,বারবার হেরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারের অবস্থানেই ফিরে আসা কি শক্ত নেতৃত্বের পরিচয়? না কি এটি নৈতিক পরাজয়?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ভূমিকা পালন করছে গণমাধ্যম।
যেভাবে একসময় শেখ হাসিনার প্রশংসায় মুখর ছিল মিডিয়া, আজ একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তারেক রহমানকে ঘিরে।
সমালোচনা নেই। প্রশ্ন নেই। কেবল প্রশংসা। গণমাধ্যম জুড়ে প্রতিযোগিতা চলছে, তারেক রহমানের প্রশংসায় কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে। যা দেখে আমি লজ্জিত-শঙ্কিত। অথচ এসব গণমাধ্যমই একসময় জিয়া পরিবারের চরিত্র হনন করেছে।
আমি মনে করি,এটি সাংবাদিকতা নয়। এটি চাটুকারিতা।
এই চাটুকার মিডিয়াই শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল। আজ তারেক রহমানকেও একই পথে ঠেলে দিচ্ছে।
আমি বলতে চাই,তারেক রহমান যদি সত্যিই আলাদা হতে চান, আরেকজন হাসিনা হয়ে উঠতে নাচান। তবে তাকে এখনই থামতে হবে।
চাটুকারদের দূরে রাখতে হবে।
দুর্নীতি-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জামাত আমীরের মতো যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনীতি নয় বরং মানুষের অকুণ্ঠ আস্থা ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয় বরং মানুষের সঙ্গে বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এই সত্যটাই জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
শেষ কথা:
চাটুকার মিডিয়া। সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। অবাধ ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর দলীয় ক্যাডাররা মিস্টার রহমানকে শেখ হাসিনা বানাতে চাইছেন। সার্বিক প্রেক্ষাপটে সেই লক্ষণ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের। তিনি কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করবেন নাকি ইতিহাস বদলাবেন—সময়ই কেবল সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে আমি মনে করি, ১২ ফেব্রুয়ারিতেও মিলতে পারে অনেক প্রশ্নের উত্তর।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com