আজ রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
আজ রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করছে কারা?

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু মানচিত্রের সীমারেখা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর—যাদের ওপর জাতি নিঃশর্ত আস্থা রাখে। বাংলাদেশে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষে রয়েছে সেনাবাহিনী। যুদ্ধকালীন বীরত্ব থেকে শুরু করে দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় গৌরব—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই জনগণের কাছে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করছে কারা? কেনই বা ঠিক এখন, নির্বাচনকে সামনে রেখে, পরিকল্পিতভাবে এই বিতর্ক উসকে দেওয়া হচ্ছে?

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পতিত স্বৈরাচারী শাসনের দীর্ঘ সময়জুড়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীও এর বাইরে ছিল না। কিছু সংখ্যক উচ্চাভিলাষী ও কর্তৃত্বপরায়ণ কর্মকর্তার পেশাদারিত্ববহির্ভূত কর্মকাণ্ড—অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ, জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত, এমনকি আইনবহির্ভূত কাজ—সেনাবাহিনীর সামষ্টিক ভাবমূর্তিতে ক্ষত তৈরি করেছিল। কারণ সেই অপরাধগুলো ছিল ব্যক্তিবিশেষের, পুরো বাহিনীর নয়। ইতোমধ্যেই এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের অনেকেই আইনের আওতায় এসেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও বিচার প্রক্রিয়া চলমান। এটি প্রমাণ করে—সেনাবাহিনী নিজেই আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়ায় আছে।

কিন্তু এই আত্মশুদ্ধির সুযোগ না দিয়ে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। প্রবাসে বসে কিছু ইউটিউবার ও কথিত সাংবাদিক গত এক–দেড় বছরে সেনাবাহিনীকে নিয়ে এমন এক নিরবচ্ছিন্ন মিথ্যাচারের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, যার উদ্দেশ্য সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দেওয়া।
কখনো বলা হয়েছে, “সেনাবাহিনী দেশ ধ্বংস করছে”, কখনো “সেনাপ্রধান বিদেশি গোয়েন্দাদের এজেন্ট”, আবার কখনো “সেনাবাহিনী একটি নির্দিষ্ট দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে।”

এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, নেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ও আবেগী রাজনীতির কারণে এই গুজব কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই গুজব কেবল অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বাস্তব আচরণেও প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে।

ঠিক এমন এক সংবেদনশীল সময়ে, নির্বাচন থেকে মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়—তিনি গানম্যানসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন, নিয়ম অনুযায়ী বাধা দিলে দায়িত্বরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্‌বিতণ্ডায় জড়ান।

এই ঘটনায় কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—
ঘটনাটি এক মাস আগের হলে ঠিক নির্বাচন-পূর্ব মুহূর্তে কেন ভিডিওটি প্রকাশ পেল?
ভিডিওতে যেহেতু সেনাবাহিনীর বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরার ফুটেজ ব্যবহৃত, তাহলে এটি বাহিনীর ভেতর থেকে কীভাবে ফাঁস হলো?
একটি মীমাংসিত বিষয়কে নতুন করে সামনে এনে কাদের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে?

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন—ঘটনাটি তখনই সমাধান হয়েছিল এবং সেনাবাহিনীর কাছে এটি মীমাংসিত ইস্যু। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—নতুন করে এই বিতর্ক উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী? এর পেছনে কারা?

আমার জানামতে, ক্যান্টনমেন্টে নিয়ম ভাঙার সাহস সাধারণত কেউ দেখায় না। এমনকি সার্ভিং অফিসার বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সেখানে সতর্ক থাকেন। কারণ মিলিটারি পুলিশ একটি “স্যাক্রেড” বাহিনী—তাদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার নজির বিরল।
তাহলে ডা. খালিদুজ্জামানের এই আচরণের উৎস কোথায়?
ভিডিওতে এবং পরবর্তী বক্তব্যে যে যুক্তিগুলো উঠে এসেছে, তা ভয়ংকরভাবে পরিচিত—
“সেনাবাহিনী দেশ ধ্বংস করছে”
“সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে ভুল পথে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে”
এই ভাষা নতুন নয়। এটি গত এক–দেড় বছরে একটি নির্দিষ্ট প্রোপাগান্ডা মেশিন যেভাবে তৈরি করেছে, ঠিক তারই প্রতিধ্বনি।
অর্থাৎ, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত উত্তেজনা নয়—এটি একটি দীর্ঘদিনের ন্যারেটিভ ব্যাটেলের মাঠপর্যায়ের প্রতিফলন বলেই মনে হচ্ছে।

এই ন্যারেটিভের কৌশলগত লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট—
সেনাবাহিনীর সেই ঐতিহাসিক “লাস্ট আরবিট্রার” ভূমিকার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। যে বৈধতার কারণে রাজনৈতিক সংকটে সব পক্ষ শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দিকে তাকায়। যে বৈধতার কারণেই পতিত স্বৈরাচারের পর সবাই সেনাপ্রধানের কাছে গিয়েছিল ক্ষমতার সুষ্ঠু বণ্টনের প্রত্যাশায়।
এই বৈধতা ভেঙে দিতে পারলে কী হবে?
তাহলে ভবিষ্যতের যেকোনো জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনী ও জনগণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে। রাষ্ট্র থাকবে দিশাহীন। আর ঠিক এই পরিস্থিতিই কিছু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত। এসব কথা আমি এর আগেও বহুবার বলেছি।

অন্যদিকে, ডা. খালিদুজ্জামান ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবুও এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যে আক্রমণাত্মক ও একপেশে বিবৃতি এসেছে, সেটিও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এতে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন হয়তো রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে।
এই ধারণা সেনাবাহিনীর জন্য ক্ষতিকর। কারণ সেনাবাহিনীর শক্তি তার নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বে।

এই অস্থির প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, গাজীপুর—তিনি সারা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য।

প্রায় এক লক্ষ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনী একটি আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণের মধ্যে আবার আস্থা ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

শেষ কথা:
সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার এই অপচেষ্টা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্যান্টনমেন্টের ভিডিও ফাঁসের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। কারা, কী উদ্দেশ্যে, কোন চ্যানেলে এটি প্রকাশ করেছে—সবকিছু জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ষড়যন্ত্র আরও বেড়ে যাবে।
একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে তার চিরাচরিত পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রমাণ করতে হবে—এই বাহিনী কোনো দলের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়; এই বাহিনী কেবল বাংলাদেশের।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin