আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

তারেক রহমান ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

 

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে গত প্রায় দুই দশক ধরে  অন্যতম আলোচিত একটি নাম তারেক রহমান।আজ তার ৬১ তম জন্মদিন। কখনো তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আশার গল্প, আবার কখনো বা অপপ্রচারের ঘনঘটায় তাকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দৃশ্যপট বদলেছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মোকাবিলা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে সামনে এসেছেন।

 

শৈশব ও রাজনীতির হাতেখড়ি

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জন্মগতভাবেই রাজনীতির ধমনীতে তার বসবাস। তবে শৈশবে তিনি ছিলেন বেশ অন্তর্মুখী। ঢাকার শাহীন স্কুল ও রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে তার শিক্ষাজীবন কাটে। কিশোর বয়সেই বাবাকে হারানোর ট্র্যাজেডি তাকে মানসিকভাবে শক্ত হতে শিখিয়েছে।

অনেকেই জানেন না, তারেক রহমানের রাজনীতির পথচলা মসৃণ ছিল না। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি মায়ের পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। ছাত্রজীবনেও তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে। এরশাদ সরকারের সময় এবং পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন মামলায় তাকে জড়ানো হয়, যা ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক অগ্নিপরীক্ষা। সেই তরুণ বয়সের জেল-জুলুম ও আইনি লড়াই তাকে তৃণমূলের রাজনীতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

ওয়ান-ইলেভেন: নির্যাতনের বিভীষিকা

তারেক রহমানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডের নামে তার ওপর চালানো হয় অকথ্য শারীরিক নির্যাতন। সে সময়কার নির্যাতনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, সুস্থ-সবল তারেক রহমান মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে পঙ্গুপ্রায় অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। টানা ১৮ মাস কারাবাসের পর ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। সেই নির্যাতন কেবল তার শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, বরং তার মনোবল ভাঙার এক গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি।

 

১৭ বছরের নির্বাসন ও প্রযুক্তির নেতৃত্ব

লন্ডনে চিকিৎসার পাশাপাশি শুরু হয় তার দীর্ঘ প্রবাস জীবন। গত ১৭ বছর ধরে তিনি শারীরিকভাবে দেশের বাইরে থাকলেও মানসিকভাবে এক মুহূর্তের জন্যও বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে যখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একে একে কারারুদ্ধ করা হচ্ছিল, তখন সুদূর লন্ডন থেকেই দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। স্কাইপ, জুম এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো—প্রচণ্ড দমন-পীড়নের মধ্যেও বিএনপিকে ভাঙন থেকে রক্ষা করা। তিনি দলকে আধুনিকায়ন করেছেন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের প্রাধান্য দিয়েছেন। “দেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে”—এই স্লোগান দিয়ে তিনি কর্মীদের চাঙ্গা রেখেছেন।

 

প্রতিহিংসা নয়, মেরামতের রাজনীতি

দীর্ঘদিন অপপ্রচারের শিকার হয়েও তারেক রহমান সাম্প্রতিক সময়ে যে বক্তব্য ও নির্দেশনা দিচ্ছেন, তা তাকে একজন পরিপক্ব রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়।”তিনি ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ‘৩১ দফা’ রূপরেখা। যেখানে তিনি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে উঠে আসছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার প্রত্যয়।

 

আগামীর বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন এক নেতৃত্বের প্রত্যাশা করে, যিনি অতীতের ভুলগুলো শুধরে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন। তারেক রহমানের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ১৭ বছর আগে যে তরুণ নেতা দেশ ছেড়েছিলেন, আজ তিনি অভিজ্ঞ এবং পোড় খাওয়া এক রাজনীতিবিদ।

নির্যাতনের দগদগে স্মৃতি নিয়ে তিনি যদি প্রতিহিংসার পথে না হেঁটে জাতীয় ঐক্যের ডাক কার্যকর করতে পারেন, তবে তা হবে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে তিনি কীভাবে এই নতুন বাংলাদেশের হাল ধরেন, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে তারেক রহমান আজ নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তিনি কেবল বিএনপির নেতা নন, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাকে জন্মদিনের অফুরন্ত শুভেচ্ছা।-লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

 

 

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin