আজ সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

আয় হাদির লাশ নিয়ে যা: পুলিশ কি রাজনৈতিক মিলিশিয়া?

কিছু বাক্য রাষ্ট্রের মুখোশ ছিঁড়ে দেয়।“আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা”—এই বাক্যটি তেমনই এক নির্মম স্বীকারোক্তি। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন পুলিশের অসংলগ্ন উক্তি নয় বরং এটি একটি রাজনৈতিকভাবে বন্দী রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্লজ্জ আত্মপ্রকাশ। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান যে সংযম, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আজ তার কবরের ওপর দাঁড়িয়েই পুলিশ আবার শক্তি প্রদর্শন করছে—আর বস্তা পচা রাজনীতি তাতে নীরব সম্মতি দিচ্ছে।

শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার এবং জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহ ছিল না। ছিল বিচারপ্রার্থীদের শান্তিপূর্ণ উপস্থিতি। অথচ রমনা–ইন্টারকন্টিনেন্টাল–শাহবাগ এলাকা আবারও পরিণত হলো রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের পরীক্ষাগারে। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট—সব মিলিয়ে যেন রাষ্ট্র আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল: বিচার চাইলে মার খেতেই হবে।

পরবর্তী সময়ে সরকারি ভাষ্যে আহতের সংখ্যা নিয়ে হিসাব কষা হয়েছে, গুলির ধরন নিয়ে কারিগরি বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে মূল প্রশ্নটি—রাষ্ট্র কেন বিচার দাবিকে শত্রুতা হিসেবে দেখে? কেন আন্তর্জাতিক তদন্তের কথা উঠলেই প্রশাসনের ভেতর অস্থিরতা শুরু হয়? জুলাই অভ্যুত্থান তো পরিষ্কার করেই দেখিয়ে দিয়েছিল—রাষ্ট্রের নিজের তদন্তে জনগণের আস্থা নেই। সেই আস্থাহীনতাই আজ আবার রক্তাক্ত হচ্ছে।

এই সহিংসতার মধ্যেই একটি বাক্য রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াত্বকে নগ্ন করে দেয়—“আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা।” ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সদস্যের মুখ থেকে উচ্চারিত এই বাক্য শুধু একজন নিহতের স্মৃতিকে অপমান করেনি; এটি পুরো বিচারব্যবস্থার মুখে প্রকাশ্যে থুতু ছুড়ে দিয়েছে। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো—এই পুলিশ সদস্য বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং ২০২৩ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন—এমন তথ্য আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিচয় ইউনিফর্মের ভেতরেও সক্রিয়, প্রভাবশালী এবং বেপরোয়া।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি প্যাটার্ন। রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে পুলিশকে নিরপেক্ষ রাখার বুলি আওড়ায়, কিন্তু আড়ালে পুলিশকে নিজেদের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু পুলিশের কাঁধে চড়ে রাজনীতি করার সংস্কৃতি বদলায় না। ফলাফল—এক দমননীতি শেষ না হতেই আরেক দফা দমননীতির মহড়া শুরু হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে যমুনার সামনে থেকে। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাদ আলী নিজে উপস্থিত থেকে লাঠিচার্জে নেতৃত্ব দেন। এটি কোনো তুচ্ছ অভিযোগ নয়; এটি পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন। পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—রাজপথে লাঠি হাতে ক্ষমতার প্রদর্শনী করা নয়।

এরপর যে অভিযোগটি উঠেছে, তা আরও ভয়ংকর। বলা হচ্ছে, ঘটনার পর তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দপ্তরে ফোন করে গর্ব করে বলেছেন—“সবকটাকে পিটিয়ে সরিয়ে দিয়েছি।” এই বক্তব্য যদি সত্য হয়, তবে সেটি কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়; এটি নাগরিক অধিকারের প্রকাশ্য অবমাননা। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা যদি নাগরিককে পেটানোকে ‘কৃতিত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তবে আইনের শাসন সেখানে নিছক অলঙ্কার।
এই আচরণ প্রমাণ করে—দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখন আর নীরব নয়; তা প্রকাশ্যে উদযাপিত। নিচের সারির পুলিশ যখন দেখে, শীর্ষ নেতৃত্বই দমননীতির প্রশংসা করছে, তখন “আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা” বলার সাহস জন্ম নেয়। এটি ভাষার সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার সরাসরি সিগন্যাল।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচন করেছিল—রাষ্ট্র যখন নাগরিককে শত্রু ভাবতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র নিজেই অস্থির হয়ে ওঠে। চোখ–হাত–পা হারানো জুলাই যোদ্ধাদের কান্না আজও বাতাসে ভাসে। কিন্তু সেই ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজ আবার পুরোনো দমননীতি ফিরছে। মনে হচ্ছে, জুলাই ছিল কেবল একটি সাময়িক ধাক্কা—কাঠামোগত কোনো সংস্কার নয়।
ডাকসুর নেতাদের অভিযোগ—পুলিশের ভেতরে এখনো “জুলাইয়ের ক্ষোভ” জমে আছে। যদি তা সত্য হয়, তবে সেটি কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ ক্ষোভ বহন করা নয়; কাজ হলো সংবিধান রক্ষা করা। ক্ষোভ নিয়ে পুলিশ নামলে সেটি আর বাহিনী থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক মিলিশিয়া।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ঘটনার এতদিন পরও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য কিংবা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। কোনো সাময়িক বরখাস্ত নেই, কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিশন নেই—আছে শুধু অর্থবহ নীরবতা। এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বার্তা দেয়: রাজনীতির ছায়া থাকলে সব অপরাধ ক্ষমাযোগ্য।

ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে এই নীরবতা আরও ভয়াবহ। কারণ নির্বাচন এলেই প্রশাসনকে ব্যবহার করার পুরোনো প্রবণতা মাথাচাড়া দেয়। প্রতিপক্ষ দমন, রাজপথ নিয়ন্ত্রণ, শক্তির ভাষায় বার্তা দেওয়া—এসবই সেই চেনা রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু এই খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুলিশ নিজেই। কারণ ক্ষমতা বদলালে এই বাহিনীকেই আবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।
“আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা”—এই বাক্যটি তাই শুধু একটি উক্তি নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত। এটি বলে দেয়—এখনই যদি থামানো না যায়, তবে রাষ্ট্র আবার সেই অন্ধকার গলিতে ফিরবে, যেখানে বিচার বিলাসিতা আর মানবিকতা দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়।

আমি মনে করি,এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে এখনই।
প্রথমত, এই ঘটনার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত চাই—মাঠপর্যায় থেকে কমিশনার পর্যায় পর্যন্ত।
দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনকে শূন্য সহনশীলতার অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
তৃতীয়ত, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিটি ঘটনার বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতের সব সংস্কারই ভাঁওতাবাজি মনে হবে।

শেষ কথা:
নাগরিক সমাজকে বুঝতে হবে—সব ভুলে যাওয়াই এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রশ্ন তোলা বন্ধ হলেই দমননীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যখন বলে “কিছুই হয়নি”, তখনই আসলে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করে।
“আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা”—এই বাক্যটি আমাদের অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আবার চোখ ফিরিয়ে নেব, নাকি সত্যিই রাজনীতির ছায়া থেকে পুলিশকে মুক্ত করার লড়াই শুরু করব?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,
ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin