আজ সোমবার, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২২শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২২শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

জনকূটনীতির ব্যর্থতা ও সরকারের অদৃশ্য সংকট!

রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক সংকট দৃশ্যমান হয়, আবার কিছু সংকট থাকে যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব হয় অনেক বেশি গভীর। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্য এমনই একটি অদৃশ্য সংকট হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিসরে কার্যকর জনকূটনীতি বা পাবলিক ডিপ্লোমেসির দুর্বলতা। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নতুন কৌশলগত অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারের কর্মকাণ্ড এবং অবস্থান বিশ্ববাসীর কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে দিল্লি ও লন্ডনের মতো বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রেস মিনিস্টার পদ শূন্য থাকার বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতার পরিচয় নয়, বরং সরকারের কৌশলগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রেস মিনিস্টার শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক পদ নয়; বরং তিনি একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষার অন্যতম প্রধান সৈনিক। বিদেশি সংবাদমাধ্যম, নীতিনির্ধারক, গবেষক, মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রবাসী সমাজের কাছে দেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।

দিল্লি বাংলাদেশের জন্য কেবল প্রতিবেশী দেশের রাজধানী নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্র। বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমে যে বয়ান তৈরি হয়, তার প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিসরেও পড়ে।

একইভাবে লন্ডন হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী মহলের অন্যতম কেন্দ্র। এই দুই জায়গায় দীর্ঘদিন প্রেস মিনিস্টার না থাকা কার্যত বাংলাদেশের কণ্ঠকে দুর্বল করে দিয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকার দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে যতটা সক্রিয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই সক্রিয়তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন পক্ষের তৈরি করা বয়ানই অনেক সময় আন্তর্জাতিক মহলে প্রাধান্য পাচ্ছে। রাষ্ট্র যদি নিজে তার বক্তব্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই শূন্যস্থান অন্য কেউ পূরণ করবে—এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ওয়াশিংটনের মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পোস্টগুলোর একটিতে প্রেস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এবং সমর্থকের অভিযোগ, অতীতে বিভিন্ন সময়ে কিছু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও যোগাযোগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আওয়ামী লীগপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তাদের অন্যতম হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা। সেই প্রেক্ষাপটে তারা প্রশ্ন তুলছেন—সরকার পরিবর্তনের পরও কেন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদগুলোতে পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে না?

প্রশ্নটি ব্যক্তি নয়, নীতির। কোনো কর্মকর্তা কোন সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন, সেটি মুখ্য হওয়া উচিত নয়। কিন্তু তার অতীত ভূমিকা, পেশাগত নিরপেক্ষতা, বর্তমান কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষমতা অবশ্যই মূল্যায়নের বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন, যাদের প্রতি সরকারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং যারা পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম।

দুঃখজনকভাবে মনে হচ্ছে, এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য পড়ে আছে, অন্যদিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই দ্বৈত সংকট বাংলাদেশের জন্য মোটেও ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

বিশ্ব রাজনীতি এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যযুদ্ধ—সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে গেছে। এমন এক সময়ে প্রেস মিনিস্টারের কাজ শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো নয়। তাকে হতে হয় কৌশলগত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সংকট ব্যবস্থাপক, মিডিয়া বিশ্লেষক এবং জনমত নির্মাণের দক্ষ কারিগর।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে বর্তমানে যারা প্রেস ও মিডিয়া-সংক্রান্ত দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের কর্মদক্ষতা কি নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে? তারা কি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নতুন বাস্তবতা বুঝে কাজ করছেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তথ্যযুদ্ধের এই যুগে তারা কি যথেষ্ট প্রস্তুত? বাংলাদেশের পক্ষে শক্তিশালী বয়ান নির্মাণে তাদের সাফল্যের পরিমাপ কী?

একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধুমাত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এটি সমন্বিত কৌশলগত যোগাযোগের বিষয়। আজ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের দূতাবাসগুলোকে তথ্যযুদ্ধের সামনের সারির ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। তারা জানে, আন্তর্জাতিক জনমত এখন কূটনীতির অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। বাংলাদেশকেও সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে।

বিএনপির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দলটি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে একতরফা বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার যদি সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে চায়, তাহলে জনকূটনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া বিকল্প নেই।

দিল্লি ও লন্ডনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনে অবিলম্বে যোগ্য ও পেশাদার প্রেস মিনিস্টার নিয়োগ দিতে হবে। একইসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রেস ও মিডিয়া কর্মকর্তাদের কার্যকারিতা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অতীত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা আমলাতান্ত্রিক বিবেচনার পরিবর্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং কর্মদক্ষতাকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের লড়াই এখন শুধু অর্থনীতি বা কূটনীতির নয়; এটি বয়ানেরও লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে যদি রাষ্ট্রের কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তার বড় মূল্য দিতে হয়। চরমভাবে ব্যাহত হয় জাতীয় স্বার্থ।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশ আজ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই অধ্যায়ে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠন। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে জনকূটনীতির শূন্যতা দূর করা এবং দক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও পেশাদার যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। সুতরাং সরকারের অদৃশ্য সংকট কাটাতে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin