বর্তমান জামানায় দুর্নীতি কোনো একটি দেশের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয় বরং এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
৫৪ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে নির্মম যে সত্যটি আমাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হল,আমরা রাষ্ট্র গঠনে যতটুকু এগিয়েছি, তার সমান্তরালে দুর্নীতিও ততটাই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবসে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে: দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ কি আদৌ সম্ভব, নাকি এটি কেবল রাষ্ট্রীয় বক্তৃতার অলংকারমাত্র?
আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, সরকার বদলেছে, শপথ এসেছে-গিয়েছে, কিন্তু দুর্নীতির চরিত্র বদলায়নি। বরং তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করেছে। আমার চোখে দেখা অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি,বিরোধী রাজনৈতিক দলের যে নেতা বা কর্মী অর্থকষ্টে দিন কাটিয়েছে, রিকশা ভাড়া দেয়ার কিংবা সংসারের জন্য বাজার করার টাকা পকেটে ছিল না। ক্ষমতায় গিয়ে সে-ই রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে—এই রূপান্তর কোনো ব্যক্তিগত অলৌকিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামোগত ফল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লর্ড অ্যাকটন এক সময় বলেছিলেন, “Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely.” বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই উক্তি যেন এক নির্মম সত্যায়ন।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখে উচ্চারণ করেছে ‘জিরো টলারেন্স’, ‘স্বচ্ছতা’, ‘সুশাসন’।কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, শাসকরাই দুর্নীতির বৃহত্তম উপকারভোগীতে পরিণত হয়েছেন।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। যত কথা তিনি বলেছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের সব সরকার মিলেও বোধ হয় এতো কথা বলেননি।
অথচ তার সরকারের সময় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। যা দিয়ে পাঁচ বছর বাংলাদেশ চালানো সম্ভব হতো কিংবা ১৫০ টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত।
একমাত্র জিয়াউর রহমানের সরকার ছাড়া প্রতিটি সরকারের আমলেই দুর্নীতি ব্যাপকতা পেয়েছে। তাই আমি মনে করি, কাগজে সংস্কার নয়, দরকার আমাদের মগজের সংস্কার।
সুতরাং ইতিহাস আমাদের এটাই সাক্ষ্য দেয় যে, রাষ্ট্রপ্রধানের নৈতিকতা যদি দুর্বল হয়, তবে প্রশাসনিক সংস্কার কেবল কাগুজে শ্লোগানে পরিণত হয়। এরিস্টটল বলেছিলেন, “The virtue of a state is the virtue of those who govern it.” অর্থাৎ শাসকের নৈতিক মান যদি দুর্বল হয়, তবে রাষ্ট্রের শরীরও অনিবার্যভাবে রোগাক্রান্ত হয়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, দুর্নীতি আজ আর কেবল প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সীমিত নয়; তা ব্যক্তি জীবনাচরণ, সামাজিক কাঠামো, এমনকি নৈতিক মানসিকতার অংশ হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, ঘুষ, তদবির ও রাজনৈতিক আশ্রয়কে এখন অনেকেই “স্বাভাবিক বাস্তবতা” হিসেবে গ্রহণ করছে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার যাকে বলেছিলেন “the routinization of deviance”—অর্থাৎ অন্যায় যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে তার নৈতিক মেরুদণ্ড হারায়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে “দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স” ছিল একটি বহুল ব্যবহৃত শ্লোগান। কিন্তু বাস্তবতার রেখাপাত ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। উন্নয়নের গল্পের আড়ালে অর্থ পাচার, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে লুটপাট, ভোগবিলাসের সংস্কৃতি হাসিনার ক্ষমতাকেন্দ্রিক সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট সতর্ক করেছিলেন, “When power becomes untouchable, corruption becomes inevitable.” এই সতর্কবাণী যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশের দুর্নীতি এত গভীরে প্রোথিত হলো? কারণ আমরা কেবল কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলেছি; কিন্তু নৈতিক সংস্কারের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত থেকেছে। আইন করা হয়েছে, কমিশন গঠন করা হয়েছে, কিন্তু নাগরিক চরিত্র গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। কনফুসিয়াস বলেছিলেন, “If the people be led by laws, and uniformity sought by punishments, they will try to avoid the punishment, but have no sense of shame.” অর্থাৎ আইন দিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু নৈতিক লজ্জাবোধ সৃষ্টি না হলে সমাজ শুদ্ধ হয় না।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। ভোটের মাঠে যাদের প্রার্থী করা হচ্ছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে। সুতরাং এটি একটি তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে। একদিকে উন্নত ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ভার যাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ম্যাডিসন বলেছিলেন, “If men were angels, no government would be necessary.” মানুষের স্বার্থপরতা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে যুক্ত হয়, তখন দুর্নীতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আর তাই সেই ঝুঁকি যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে গণতন্ত্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এখানেই থেমে থাকবো। নাকি সত্যি দুর্নীতি থেকে মুক্তির পথে হাটবো। আমি মনে করি, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তব রূপ লাভ করবে,যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক নৈতিকতা একত্রে বিকশিত হয়। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “Be the change that you wish to see in the world.” দুর্নীতি দমনের লড়াই কেবল সরকারের নয়; এটি ব্যক্তিগত নৈতিক সাহসেরও বিষয়। রাজনীতিবিদকে যেমন জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, তেমনি নাগরিককেও ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক প্রকল্প নয়, এটি একটি নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রশ্ন। আইন, সংস্কার, ও অডিটের কাগজে আয়োজনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা-কেন্দ্রিক পাঠ্যক্রম, গণমাধ্যমের শক্তিশালী অনুসন্ধানী ভূমিকা এবং নাগরিক সমাজের সোচ্চার উপস্থিতি। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেন, “Bad institutions are products of bad civic culture.” অর্থাৎ দুর্বল প্রতিষ্ঠান নয়, দুর্বল নাগরিক সংস্কৃতিই দুর্নীতির আসল শিকড়।
অতএব, “দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ” একটি অলীক কল্পনা নয় আমাদের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এটি আপনা-আপনি অর্জিত হবে না। এটি অর্জন করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক সাহস, প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি নাগরিক সমাজের নৈতিক জাগরণ। যদি রাষ্ট্রপ্রধানের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে যত কমিশনই গঠন করা হোক না কেন, তাতে ফল আসবে না। আর যদি নাগরিক নিজেই অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তবে কোনো আইনই সমাজকে শুদ্ধ করতে পারবে না। তবে আমি মনে করি, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হলে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা অনেকটাই সহজ হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কেবলমাত্র জেল জরিমানা করে বাংলাদেশকে কিছুতেই দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না
শেষ কথা:
দুর্নীতিবিরোধী দিবসে দাঁড়িয়ে তাই সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি দেখা দেয় তা হল,আমরা কি কেবল শ্লোগানে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি ব্যক্তি-মানসিকতা থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সবকিছুতে নৈতিক সংস্কারের পথে সত্যিই হাঁটব? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ভবিষ্যতের হাতে নয়, বরঞ্চ আমাদের সম্মিলিত বিবেকের হাতে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com