১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস।বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি অর্জন করে তার কাঙ্ক্ষিত বিজয় ও স্বাধীনতা। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লক্ষাধিক নারীর সম্ভ্রমহানি আর অগণিত মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বিজয় দিবস তাই কেবল উৎসবের দিন নয় বরং আমি মনে করি এটি আমাদের আত্মপরিচয়, দায়িত্ববোধ ও আত্মসমালোচনার মাহেন্দ্রক্ষণ ।
বিজয়ের ৫৪ বছরে আমাদের অর্জন যেমন আছে, তেমনি কিছু সংকটও আছে। আগামী চ্যালেঞ্জও কম নয়-এসব নিয়েই আজ আমার বিশ্লেষণ।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ববাংলার মানুষের ওপর আরোপিত হয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা-গণঅভ্যুত্থান সবকিছুই ছিল স্বাধীনতা লাভের পথে এক একটি মাইলফল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক আহ্বান কার্যত স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা দেয়। অন্যদিকে ২৫ মার্চের নারকীয় গণহত্যা সেই সংগ্রামকে অনিবার্য করে তোলে।
আর ২৬ মার্চ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য ও সংকটময় মুহূর্ত। সেই দুঃসময়ে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিশেহারা জাতিকে দিয়েছিলেন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। তাঁর এ ঘোষণা ছিল প্রতিরোধের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সূচনা। যা দ্রুতই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ বিশেষত সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বিরোচিত নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পথে জাতিকে সংগঠিত করেছিল।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয় বরং এটি ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বিজয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়, “Government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মূলত এই দর্শনেরই বাস্তব রূপ।
স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলেও বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য ঘাটতি কমিয়া না,প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহু উন্নয়নশীল দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। তৈরি পোশাক শিল্পে বৈশ্বিক অবস্থান, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ, অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন। বাংলাদেশের এসব অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হয়েও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান দেশটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এক্ষেত্রে দার্শনিক অ্যারিস্টটলের উক্তি স্মরণযোগ্য-“We are what we repeatedly do. Excellence, then, is not an act, but a habit.” অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই ‘অভ্যাসগত উৎকর্ষ’ দেখাতে পেরেছে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি আমাকে একথা বলতে হবে যে, রাজনৈতিক স্বার্থপরতা ও হানাহানি মুক্ত হয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারলে জাতি হিসেবে আমরা আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম।
বিজয়ের ৫৪ বছরে অর্জনের পাশাপাশি অনেক সংকটও গভীর হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো গুরুতরভাবে দুর্বল হয়েছে।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে উন্নয়নের বয়ান যতটা জোরালো ছিল, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট, বিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠের সংকোচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণের ফলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে স্পষ্ট হয়েছে অবক্ষয়ের চিত্র।
ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল সতর্ক করে বলেছিলেন, “Bad institutions are the consequence of bad men.” যখন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই আশঙ্কাই আজ প্রবল উঠেছে।
বিজয়ের ৫৪ বছর পরেও আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় বস্তু হলো, কে স্বাধীনতার ঘোষক আর কে জাতির পিতা। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য একটি জাতির জন্য আর কিছুই হতে পারে না বলে আমি মনে করি। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই বিতর্কের অবসান হওয়াটা একান্ত জরুরী।
তা না হলে স্বার্থান্বেষী মহল সবসময়ই এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নেবে। ব্যাহত হবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ।
রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের ভারসাম্য গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। কিন্তু এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, জবাবদিহি দুর্বল হয়। এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের ওপর। দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, সম্পদ পাচারের মতো ঘটনা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষায়, “Freedom cannot be achieved unless the women have been emancipated from all forms of oppression.” এই উক্তি কেবল নারী স্বাধীনতার নয়, সামগ্রিক নাগরিক মুক্তির কথাও বলে। কিন্তু যখন নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তখন কোনো অর্জনই স্থায়ী হয় না।
আগামী দিনে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি কঠিন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, পরাশক্তির স্বার্থের সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তন-সব মিলিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা আরও জটিল হয়ে উঠছে। একটি দুর্বল গণতান্ত্রিক কাঠামো এই চাপ মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এখন আর কেবল একটি নির্বাচনের মধ্যে সীমিত নয়। বরং এটি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সমান্তরাল বলে আমি মনে করি।
থমাস জেফারসনের সতর্কবাণী এখানে প্রাসঙ্গিক—“The price of freedom is eternal vigilance.” স্বাধীনতা একবার অর্জন করলেই তা চিরস্থায়ী হয় না; প্রতিনিয়ত তা রক্ষা করতে হয়। শক্তিশালী গণতন্ত্র, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও সচেতন নাগরিক সমাজ ছাড়া সেই সতর্কতা সম্ভব নয়। সুতরাং ১২ ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আমাদের জাতির জন্য অপরিহার্য। যেকোনো মূল্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
বিজয় দিবস আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে কেবলমাত্র অতীত গৌরব নয় বরঞ্চ তা বর্তমানের দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা। আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় লড়াই হবে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন।স্বচ্ছ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিশ্চিত কারা।
একটি জাতির প্রকৃত বিজয় তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার নাগরিকেরা ভয়-ডরমুক্তভাবে মত প্রকাশ করতে পারে, রাষ্ট্র ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং উন্নয়নের সুফল ন্যায্যভাবে বণ্টন হয়। ফরাসি দার্শনিক জঁ জাক রুশোর ভাষায়, “Man is born free, and everywhere he is in chains.” বিজয় দিবসের চেতনা আমাদের সেই শৃঙ্খল ভাঙার সাহস জোগায়।
শেষ কথা:
সুতরাং আমি মনে করি,বিজয় দিবস কেবল পতাকা ও আলোকসজ্জার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ। ১৯৭১ সালের বিজয় আমাদের শিখিয়েছে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব। আজকের বাস্তবতায় সেই শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। অর্জনের স্বীকৃতি দিতে হবে।সংকট স্বীকার করতে হবে। আর আগামীর লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা একটি চলমান সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে সফল হতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্রের মূল্যবোধ এবং মানবিক মর্যাদাকে আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিজয় দিবসে এটাই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার। সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক:সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com