আজ সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৬ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

নতুন বাংলাদেশের আইকন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ এক নতুন প্রত্যাশার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং অর্থনৈতিক চাপের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাধারণ মানুষ আজ একটিই জিনিস চায়—স্বস্তি। আর সেই স্বস্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়গুলোর একটি হলো চাঁদাবাজি।

এই প্রেক্ষাপটে ফেনীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কুমিল্লার এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং কাওরান বাজার এলাকার এমপি সাইফুল ইসলাম—চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ও প্রকাশ্য অবস্থান ঘোষণা করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আমি নির্বাচনের আগে একাধিক লেখায় বলেছি—বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা এখন চাঁদাবাজি। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, সমাজ ও নৈতিকতার প্রশ্ন। হাট-বাজার, পরিবহন সেক্টর, নির্মাণ খাত, এমনকি ছোট ব্যবসায়ীর দোকান—কোথাও চাঁদার হাত থেকে মুক্তি নেই। প্রতিদিনের পণ্যের দামের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত হচ্ছে ‘চাঁদা ট্যাক্স’। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে।
চাঁদাবাজি একটি সমান্তরাল অবৈধ অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে। এতে তিনটি ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমত, এটি ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট করে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন। দ্বিতীয়ত, এটি বাজারমূল্য বাড়িয়ে দেয়—কারণ ব্যবসায়ীরা চাঁদার অর্থ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করেন। তৃতীয়ত, এটি আইনের শাসনকে দুর্বল করে, কারণ অপরাধীরা রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ছত্রছায়া পেলে সাধারণ মানুষ আস্থা হারায়।

এই বাস্তবতায় ফেনী, কুমিল্লা ও ঢাকার কাওরান বাজার এলাকার নবনির্বাচিত এমপিদের প্রকাশ্য ঘোষণা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এটি নৈতিক সাহসের বহিঃপ্রকাশ। তাঁরা বলেছেন, নিজ নিজ এলাকায় চাঁদাবাজি বরদাস্ত করা হবে না। এই ঘোষণা কেবল প্রশাসনকে সক্রিয় করার আহ্বান নয়; এটি দলীয় নেতাকর্মীদের জন্যও এক সতর্কবার্তা।

আমাদের ভোগবাদী ও তোষামোদি রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অসুস্থ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—ক্ষমতার আশপাশে থাকা কিছু লোক নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায় করে। ফলে সরকার বদলালেও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায় না। কিন্তু এবার যদি সত্যিই পরিবর্তনের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়, তবে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।

সরকারপ্রধান তারেক রহমান ইতোমধ্যেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছেন। তাঁর ঘোষণার প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হওয়া উচিত সারাদেশে চাঁদাবাজি বন্ধে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা। শুধু মৌখিক ঘোষণা নয়—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা প্রশাসন এবং দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

প্রতিটি সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে—চাঁদাবাজি করলে কারো দলীয় পরিচয় থাকবে না।
যেসব এমপি এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেবে না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ নীরবতা অনেক সময় অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়।

চাঁদাবাজি বন্ধ হলে কী পরিবর্তন আসতে পারে? প্রথমত, বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা স্বস্তি পাবেন, যা কর্মসংস্থান বাড়াবে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরবে। আমি বিশ্বাস করি, চাঁদাবাজি বন্ধ হলে মানুষের নিত্যদিনের অর্ধেক সমস্যা এমনিতেই কমে যাবে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দেশের ভাবমূর্তি নির্ভর করে তার শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদাররা সবসময় আইনের শাসন ও সুশাসনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। যদি বাংলাদেশ চাঁদাবাজির মতো প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ বন্ধ করতে পারে, তবে এটি শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়—নৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা হবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

আজ যারা সাহস করে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাঁরা কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধি নন—তাঁরা হতে পারেন নতুন বাংলাদেশের আইকন। কারণ আইকন মানে শুধু জনপ্রিয়তা নয়; আইকন মানে মূল্যবোধের প্রতীক।

নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিনটির সমন্বয় জরুরি। এমপিদের ঘোষণাকে বাস্তবায়নে রূপ দিতে হলে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষকেও সোচ্চার হতে হবে।

চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি অর্থনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত। যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে ইতিহাস সাক্ষী থাকবে—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরুতেই কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে ভিন্ন এক পথে এগিয়ে দিয়েছিল।

শেষ কথা:
নতুন বাংলাদেশের আইকন তাঁরা-ই, যারা ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন। আর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট, কঠোর ও কার্যকর অবস্থানই হতে পারে সেই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin