বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘এক এগারো’শব্দটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক গভীর অন্ধকার সময়ের প্রতীক, যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং ভয় সৃষ্টির অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল। আইন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সীমারেখা যখন ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘিত হয়, তখন রাষ্ট্র আর আশ্রয়স্থল থাকে না—পরিণত হয় আতঙ্কের আরেক নাম। সেই সময়ের বহুল আলোচিত এক চরিত্র—মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী—পুনরায় গ্রেফতারের মাধ্যমে আবার সামনে চলে এসেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এ কি শুধুই একটি আইনি প্রক্রিয়া, নাকি ইতিহাসের কাছে দেরিতে হলেও জবাবদিহিতার শুরু?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় ২০০৭ সালের সেই উত্তাল প্রেক্ষাপটে। ‘এক-এগারো’র ঘটনায় রাষ্ট্র একটি অস্বাভাবিক ক্ষমতার কাঠামোয় প্রবেশ করে, যেখানে দেশি-বিদেশি খেলোয়ারদের ইশারায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আড়ালে চলে যায় এবং দৃশ্যপটে আসে এক অদৃশ্য কিন্তু প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্র।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেত্রী খালেদা জিয়া—যিনি বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন—তাকেই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এটি শুধু একজন নেত্রীর প্রতি অন্যায় ছিল না; এটি ছিল গণতান্ত্রিক চেতনাকে বন্দি করার এক অপচেষ্টা।
একই সময়ে তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি, জাতীয়তাবাদী শক্তির ভবিষ্যৎ কর্ণধার তারেক রহমান-এর ওপর যে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তা আজও ইতিহাসের বুকে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। অভিযোগ আছে—তাকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের এক অমোঘ নিয়ম হলো—সত্যকে কখনো হত্যা করা যায় না, ন্যায়কে চিরদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পারিবারিক সম্পর্ক ও আস্থার জায়গা থেকে খালেদা জিয়া-র ছোট ভাই মেজর সাঈদ ইস্কান্দার-এর অনুরোধে তৎকালীন সেনা কাঠামোর প্রচলিত নিয়ম ভেঙে জুনিয়র কর্মকর্তা মইন ইউ আহমেদ-কে কয়েক ধাপ পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। এটি ছিল আস্থার এক দৃষ্টান্ত—যেখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—সব আস্থা শেষ পর্যন্ত আস্থার মর্যাদা রক্ষা করে না। অভিযোগ রয়েছে, সেই বিশ্বাসের প্রতিদান এসেছে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে। মইন ইউ আহমেদ এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী—এই নামগুলো এক-এগারো’র প্রেক্ষাপটে আজও বিতর্ক, ক্ষোভ এবং প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তারা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি; বরং একটি আদর্শ, একটি রাজনৈতিক দর্শন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ—তাকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিকে ব্যবহার করে বিরোধী মতকে দমন, নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, এবং রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করার যে অভিযোগ ওঠে—তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
এই ঘটনাগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ—যেখানে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে কার্যত মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সময়ই শেষ বিচারক। যে শক্তিকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই শক্তিই আবার নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। যে মানুষটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই তারেক রহমান-ই আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন—এ যেন ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিহাস, আবার একই সঙ্গে ন্যায়ের এক প্রতীকী প্রত্যাবর্তন।
এই বাস্তবতা আমাদের সামনে এক গভীর সত্য তুলে ধরে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য চিরস্থায়ী। অন্যায় সাময়িকভাবে সফল হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পড়ে নিজের ভারেই।
“ফাঁসিও যথেষ্ট নয়”—এই বাক্যটি তাই কেবল শাস্তির দাবি নয়; এটি একটি নৈতিক প্রতিক্রিয়া, একটি ঐতিহাসিক বোধ। যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে, যারা বিশ্বাসের প্রতিদান দেয় বিশ্বাসঘাতকতায়, যারা গণতন্ত্রকে বন্দি করতে চায়—তাদের বিচার কেবল আইনের কাঠগড়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
প্রয়োজন সত্যের পূর্ণ উন্মোচন। প্রয়োজন ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। প্রয়োজন জাতির সামনে প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা—যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানে, কোন ভুলগুলো আর কখনো করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি—যেখানে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, সেখানে শুধু শাস্তি নয়; সত্য ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াই দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে সুস্থ করেছে। বাংলাদেশেও সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়া জরুরি—যেখানে ব্যক্তি নয়, ন্যায়বিচারই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড।
আজকের বাস্তবতা আমাদের সামনে এক নতুন প্রশ্নও রাখে—আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছি? নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রেখে দিচ্ছি?
পরিশেষে বলা যায়, এক-এগারো’র সেই অন্ধকার অধ্যায় শুধু অতীত নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে তার ভুল স্বীকার করে, অন্যায়ের বিচার করে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে।
খালেদা জিয়ার কারাবরণ, তারেক রহমান-এর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, এবং পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক পুনরুত্থান—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি ইতিহাস, একটি শিক্ষা, একটি বার্তা।
সত্যকে দমন করা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে—কোনো শাস্তিই যথেষ্ট নয়। এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
ইমেইল: ahabibhme@gmail.com