আজ সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

চট্টগ্রাম বন্দর কি রাষ্ট্র চালাবে, নাকি সিন্ডিকেট?

চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ট্রেড ইউনিয়নের খেলার মাঠ নয়, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দরকষাকষির টেবিলও নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ধমনী। এই ধমনী চেপে ধরে যারা রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করতে চায়, তারা শ্রমিকের মুখোশ পরলেও বাস্তবে তারা অর্থনৈতিক নাশকতাকারী—এ কথা এখন আর ঘুরিয়ে বলার সুযোগ নেই।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা চুক্তিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাকতালীয় নয়। এটি পরিকল্পিত।

আদালতের রায়, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং ব্যবসায়ী সমাজের আকুতি—সবকিছুকে উপেক্ষা করে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে:
“আমাদের সুবিধা অক্ষুণ্ন না থাকলে দেশ চলবে না।”
এই বার্তা কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভাষা নয়। এটি স্রেফ মাফিয়াতন্ত্রের ভাষা।
আদালতের রায়ের পরও ‘আন্দোলন’—কার বিরুদ্ধে?

এনসিটি ইজারা চুক্তিকে সর্বোচ্চ আদালত বৈধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ আইন, সংবিধান ও রাষ্ট্র—তিনটিই এক কাতারে দাঁড়িয়ে। তবুও যারা আন্দোলনের নামে বন্দর অচল করছে, তারা আসলে কিসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে?
সরকারের বিরুদ্ধে? না।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে? সেটাও নয়। তারা দাঁড়িয়েছে আইনের শাসনের বিরুদ্ধে। এই জায়গাটায় আর কোনো ধোঁয়াশা রাখার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ মানে শুধু জাহাজ থেমে যাওয়া নয়—এর অর্থ হচ্ছে গার্মেন্টস কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়া, ডলার আয়ে ধাক্কা, বাজারে পণ্যের ঘাটতি এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেটে আগুন।

ব্যবসায়ীরা হিসাব দিয়ে বলছেন—প্রতিদিন কনটেইনারপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ। প্রশ্ন হলো, এই টাকা কে দিচ্ছে? শ্রমিক? না। দিচ্ছে ব্যবসায়ী, আর শেষ পর্যন্ত দিচ্ছে ভোক্তা—সাধারণ মানুষ।
তাহলে আন্দোলনের খেসারত দিচ্ছে কে, আর লাভবান হচ্ছে কারা?

সম্প্রতি নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন যে বাস্তবতা প্রকাশ করেছেন, সেটি এতদিন সবাই জানত, কিন্তু বলার সাহস করত না।
তার ভাষায়, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা অবৈধভাবে চাঁদাবাজি হয়। ট্রাক ঢুকলেও চাঁদা, বেরোলেও চাঁদা, লাইনে দাঁড়ালেও চাঁদা। বন্দর যেন একটি “সোনার ডিম পাড়া মুরগি”—যার ওপর বহুদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট নির্ভরশীল।

এই বন্দরের চারপাশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী অর্থনৈতিক মাফিয়া। এখন যখন সেই মাফিয়ার শিকড় কাটার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখনই ‘শ্রমিক স্বার্থ’ আবিষ্কার হয়েছে।
এতদিন এই স্বার্থ কোথায় ছিল?

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে তারা কাজ করছে।
এই দেশগুলো কি তাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে?
না। বরং তারা পেয়েছে দ্রুত জাহাজ চলাচল, কম খরচ, স্বচ্ছতা এবং বাড়তি রাজস্ব।

কিন্তু বাংলাদেশে এলেই নাকি সব সর্বনাশ!এই যুক্তি অজ্ঞতা নয়—এটি ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি।আসল ভয় কোথায়?আসল ভয় ডিপি ওয়ার্ল্ডে নয়। আসল ভয় হলো—
চাঁদাবাজি বন্ধ হবে।
অঘোষিত সিন্ডিকেট ভাঙবে।
অস্বচ্ছ লেনদেনের দরজা বন্ধ হবে। এই ভয় থেকেই এই প্রতিরোধ।

এনসিটি ইজারা চুক্তির বিরোধিতার নামে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে বাধা এবং বন্দর অচল রাখা—এসব আসলে সুশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান। যারা সত্যিই শ্রমিকের কল্যাণ চায়, তারা কখনোই পুরো দেশের অর্থনীতি জিম্মি করে দাবি আদায় করতে পারে না।

সংস্কার মানেই কারও না কারও সুবিধা হারানো। চাঁদাবাজি বন্ধ মানেই কিছু পকেট হালকা হওয়া। তাই এই প্রতিরোধকে শুধু “শ্রমিক আন্দোলন” বলে সরলীকরণ করলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়।

এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের সামনে বিকল্প নেই। আইন মানতে হবে, আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং বন্দর সচল রাখতে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আলোচনার দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু ব্ল্যাকমেইলের কাছে কিছুতেই নতি স্বীকার করা যাবে না।

শেষ কথা:
এনসিটি ইস্যু এখন আর কেবল একটি টার্মিনালের প্রশ্ন নয় বরং এটি একটি দৃষ্টান্তের প্রশ্ন।
এই দৃষ্টান্ত যদি হয়—“চাপ দিলে রাষ্ট্র নরম হয়”,তাহলে আগামী দিনে এই চাপ আরও বাড়বে।
আর যদি দৃষ্টান্ত হয়—“আইন মানতেই হবে”,
তাহলে শুধু বন্দর নয়, পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাই শক্ত হবে।
সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সময়। জাতীয় ও জনস্বার্থ মাথায় রেখে বন্দরের অচলাবস্থা নিরসনে এক মুহূর্ত দেরি না করে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin