রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হলো—রাষ্ট্র জনগণের জন্য, জনগণ রাষ্ট্রের জন্য নয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই জনগণের পথের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই দর্শন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই কঠিন বাস্তবতারই অসংকোচ প্রকাশ ঘটেছে।
তিনি সরাসরি বলেছেন—বর্তমান আমলাতন্ত্র দেশকে পিছিয়ে নিচ্ছে, সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের পথে এটি একটি প্রধান প্রতিবন্ধক। আরও স্পষ্ট করে তিনি আমলাতন্ত্রকে আখ্যা দিয়েছেন ‘জগদ্দল পাথর’ হিসেবে, যা জনগণের বুকে চেপে বসে আছে। একজন সাবেক সচিবের মুখ থেকে এমন সাহসী উচ্চারণ কেবল প্রশংসনীয়ই নয় বরং এটা হতে পারে বহুদিন ধরে দেশের রন্দ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা জঞ্জাল পরিষ্কারের সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা।
সম্প্রতি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের কাছে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি যে মন্তব্য করেছেন—“এই বিমানটি সচিবালয়ে পড়া উচিত ছিল”—তা অনেকের কাছে কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু এটি কোনো সহিংস মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা জনক্ষোভের প্রতীকী ভাষা। তার এই উচ্চারণ বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে। দেশ ও জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার কারণেই তিনি এমনটি বলতে পেরেছেন। আর এই কথা বলার জন্য যে নৈতিক শক্তি একজন মানুষের মধ্যে থাকা দরকার, সেটি তার মধ্যে পুরো মাত্রাই আছে বলে আমি মনে করি।
সরকারি দপ্তরগুলো ক্রমশ জনসেবার বদলে কার্যত রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থা, জবাবদিহিহীনতা এবং ফাইলনির্ভর নিষ্ক্রিয়তার প্রতীক উঠেছে।
ফাওজুল কবীর খান যে চিত্রটি তুলে ধরেছেন, তা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি দপ্তরের পরিচিত বাস্তবতা। অফিসে আসা–যাওয়া হয়, সভা হয়, লাঞ্চ হয়, চিঠি এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘোরে—কিন্তু মানুষের সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান হয় না।
তিনি সড়ক পরিবহন খাতের সংস্কারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন, নিজে ব্ল্যাকবোর্ডে বসে নীতিমালা বুঝিয়ে দেওয়ার পরও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কারণ আমলাতন্ত্র পরিবর্তন চায় না। পরিবর্তন মানেই স্বার্থের সংঘাত, সুযোগ–সুবিধার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির পথ সংকুচিত হওয়া। ফলে ভালো নীতি ফাইলে আটকে থাকে, বাস্তবায়নের মুখ দেখেনা না।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র মূলত উপনিবেশিক কাঠামোর উত্তরাধিকার। এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল শাসনের জন্য, সেবার জন্য নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলালেও প্রশাসনিক মানসিকতা খুব একটা বদলায়নি। ফলে নাগরিক আজও অনেক ক্ষেত্রে প্রজার মতো আচরণ পায়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে—যেসব দেশ দ্রুত উন্নতি করেছে, সেখানে আমলাতন্ত্রকে ফলাফলভিত্তিক ও জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক করা হয়েছে। আমাদের ঠিক তার এখানে উল্টো—প্রক্রিয়া মুখ্য, ফলাফল গৌণ।
ঠিক এখানটায়ই আমি ফাওজুল কবীর খানের বক্তব্যকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ তিনি কোনো বাইরের সমালোচক নন; তিনি এই ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই উঠে এসেছেন। একজন সাবেক সচিব হিসেবে তিনি জানেন, কোন কাজ কোথায় আটকে যায়, আমলাতান্ত্রিক লালফিতা কীভাবে জনস্বার্থকে শ্বাসরোধ করে।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা সততা ও নির্লোভতার মানদণ্ড স্থাপন করে গেছেন। সেই তালিকায় মরহুম শাহ আব্দুল হান্নানের নাম নিঃসন্দেহে শীর্ষস্থানে থাকবে।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ,ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চারবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং দীর্ঘদিন সরকারের সচিব। অথচ এই দীর্ঘ কর্মজীবনের পরও ঢাকায় তাঁর কোনো প্লট বা ফ্ল্যাট ছিল না। রাজধানীর গোরানে পৈতৃক ভিটায় দোতলা বাড়িতেই তিনি বসবাস করেছেন। মৃত্যুর পর শাহজাহানপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি নিজেই ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন—তাঁর কবর যেন পাকা না করা হয়, কোনো স্থায়ী নামফলক ব্যবহার না করা হয়।
শাহ আব্দুল হান্নান ছিলেন আল্লাহ ও ইসলামের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত একজন মানুষ, কিন্তু একই সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এক নির্লোভ আমলা। আদর্শিক ও নৈতিক সম্পর্কের জায়গা থেকে তিনি বহু মানুষের আশ্রয়স্থল ছিলেন—পরামর্শ দিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন পিতৃস্নেহে। আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল মহান এই মানুষটির সান্নিধ্য লাভের। আমার এই জীবনে উনার মতো মানবতাবাদী পরোপকারী দেশপ্রেমীক মানুষ দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি।
ফাওজুল কবীর খান তাঁর ইন্তেকালের পর প্রথম আলো পত্রিকায় একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখেছিলেন, যেখানে শাহ আব্দুল হান্নানের সততা ও কর্মজীবনের এক ঝলক তুলে ধরেন। তাঁরা একসময় সহকর্মী ছিলেন। বিশ্বাস করা যায়, সেই সততা, নৈতিক দৃঢ়তা ও নির্লোভতার আদর্শই ফাওজুল কবীর খান লালন করেছেন।
এই কারণেই তিনি আজ এত দৃঢ়ভাবে আমলাতন্ত্রের সমালোচনা করতে পারছেন। নৈতিক শক্তি ছাড়া এই উচ্চারণ সম্ভব নয়। কারণ তিনি নিজেও জানেন—কাজ কীভাবে করা যায়, কোথায় বাধা আসে, এবং সেই বাধা কারা তৈরি করে।
আমলাতন্ত্র ভাঙা যাবে না। তবে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। এজন্য জবাবদিহি, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—জনস্বার্থকে কাগুজে শব্দ নয়, বাস্তব আচরণে রূপ দেওয়া।
শেষ কথা:
বহু বছর পর আমরা সরকারের অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের একজন নীতিনির্ধারকের মুখ থেকে এমন দায়বদ্ধ, আত্মসমালোচনামূলক ও জনস্বার্থনির্ভর বক্তব্য শুনলাম। এটি কেবল সমালোচনা নয়; এটি আশার বার্তা।
এই কারণে জাতির পক্ষ থেকে একটি প্রার্থনা করি-আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেন আমাদের সমাজে আরও অনেক ফাওজুল কবীর খান সৃষ্টি করেন। এমন মানুষ, যারা আমলাতন্ত্রের জঞ্জাল পরিষ্কার করে দেশকে সত্যিকার অর্থেই আলোকিত করবে। যারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে—সব উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে—একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।
লেখক: সাংবাদিক,কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com